লালমনিরহাট বার্তা
রংপুর অঞ্চলে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে আমন চাষে খরচ বাড়ছে
রংপুর অফিসঃ | ১৫ জানু, ২০২২ ১২:৪৫ PM
রংপুর অঞ্চলে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে   আমন চাষে খরচ বাড়ছে
আমন ধানের চাষ রংপুর অঞ্চলে জলবায়ু বৃষ্টিনির্ভর কৃষি ফসল।মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতেই মিটত ধান চাষে পানির চাহিদা পুরন করে।এঅঞ্চলে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে বর্তমান ভরা মৌসুমেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে কৃষকের সেচ নির্ভও হয়ে আমন ধানের চাষ করতে হচ্চে।বৃষ্টির মাষ আষাঢ়েও জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। সেচের মূল উপাদান জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎসহ কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, বন্যা, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রংপুর অঞ্চলে আমন মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন খরচও বাড়ছে।
চলতি মৌসুমে আমন চাষের জমির পরিমাণ বাড়াতে কৃষি বিভাগকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। গত ৪ বছরে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় আমন চাষের জমি বেড়েছে ৬ হাজার ৬৫২ হেক্টর। আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় রংপুর কৃষি বিভাগ খরা প্রবণ ও বন্যা সহনশীল জাতের ধান চাষ বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে আমন ধানের জমির পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৪৭৬ হেক্টর।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোঃ মোস্তাফিজার রহমানজানান, কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলের অনেক স্থানে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব জানান দিচ্ছে। হঠাৎ করে তাপমাত্রা হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে পরিবেশ এবং প্রাণিকুলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ প্রভাব মানব দেহের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে নানা ধরনের অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। আবার যদি এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির কথা বলি তাহলে দেখা যাবে অতিবৃষ্টি এবং অনাবৃষ্টিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে ৮ জানুয়ারি পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ায় দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এছাড়া ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রংপুরে ২৪ ঘণ্টায় ৩৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়, যা শতবছরেও দেখা যায়নি।
গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলা এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের চর হরিচন্ডী গ্রামের কৃষক মোঃ আবু শামীম মন্ডল। ২০২০ সালে কয়েক দফা বন্যায় তার নিজের চার বিঘা জমির আমন ধান ছাড়াও পারিবারিকভাবে আবাদকৃত আউশ ধান ও পাট নষ্ট হয়। প্রতি বিঘায় ধান আবাদে খরচ হয়েছিল ২ হাজার টাকা। এছাড়া ২০২১ সালে অনাবৃষ্টিতে আবাদ করা ফসলে সম্পূরক সেচ দিতে হয়েছিল।
কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কৃষক মোঃ মইনুদ্দিন মিয়া বলেন, এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আমন আবাদ করেছেন। বন্যায় বীজতলা এবং রোপণকৃত ধানের জমি ক্ষতি গ্রস্থ হয়েছে। কিন্তু গত বছর (২০২০-২১) কয়েক দফা বন্যায় দুবার জমির আবাদ করা আমন ধান নষ্ট হয়।তিনি বলেন, আগে নিয়ম মাফিক বন্যা হতো। কিন্তু কয়েক বছর থেকে মৌসুমের শুরুতে এবং শেষ পর্যন্ত একাধিক বার বন্যা হচ্ছে। আবার কখনো অনাবৃষ্টির কারণে জমিতে বর্ষা মৌসুমেও বাড়তি সেচ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী জেলার একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথাবলে জানা গেছে, এমনিতে কৃষি শ্রমিক থেকে শুরু করে কৃষি উপকরণের দাম প্রতি বছর বাড়ছে।অপরদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে আবাদে বাড়তি ব্যয় যোগ হচ্ছে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশের ভারসম্য রক্ষায় ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস করতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। কৃষকদের সেচ নির্ভর বোরো ধানের আবাদ কমিয়ে আমন সহ অন্যান্য হাইব্রীট জাতের ধানের চাষ বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।কয়েক বছর ধরে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে আমন মৌসুমে ধান আবাদে ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক কৃষক। ২০১৮-১৯ মৌসুমে আমন আবাদ হয়েছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৪৭৬ হেক্টর জমিতে। ২০১৯-২০ মৌসুমে আমনের আবাদ হয়েছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৮৫২ হেক্টর। ২০২০-২১ মৌসুমে আমনের আবাদ হয়েছিল ৬ লাখ ১২ হাজার ৪৩৫ হেক্টর। ২০২১-২২ মৌসুমে আমনের আবাদ হয়েছে ৬ লাখ ১৪ হাজার ২৯৫ হেক্টর। এর মধ্যে বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ৪ হাজার ৫৭২ হেক্টর জমি।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ মাহবুবর রহমান বলেন, ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কম হয় এমন ফসল আবাদে কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।স্বাভাবিকভাবে বোরো ধানের চেয়ে আমন আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার কাজ করছে কৃষি বিভাগ। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে রংপুর অঞ্চলের কৃষিকাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, যেসব স্থানে অতিবৃষ্টির ফলে আমন আবাদ নষ্ট হয় সেসব স্থানে বন্যাসহনীয় জাতের ধান রোপণের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব স্থানে বৃষ্টি কম হয় সেখানে খরাসহনীয় ধান আবাদে কৃষকদের বলা হচ্ছে। তিরি আরো বলেন, বোরো মৌসুমে যেসব জমিতে সেচের জন্য ফিতা পাইপসহ বিভিন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হয় সেগুলো নষ্ট না করার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে যাতে আমন মৌসুমে সম্পূরক সেচ দিতে খরচ কম হয়।
এই বিভাগের আরও খবর