লালমনিরহাট বার্তা
তিস্তা নদীর প্রবাহ ও জলা-জমির ব্যবস্থাপনা- শমশের আলী
বার্তা ডেস্কঃ | ৩১ জানু, ২০২২ ২:২৮ PM
তিস্তা নদীর প্রবাহ ও জলা-জমির ব্যবস্থাপনা- শমশের আলী
ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবা ব্যারেজ পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘতম সেতু জয়ী’র নীচ দিয়ে, কোচবিহার জেলার মেখলীগঞ্জ মহকুমা হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়ন এবং লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা উপজেলার অঙ্গোরপেতা-দহগ্রামের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে; বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায় উলিপুর উপজেলার বাজড়া ইউনিয়ন ও গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের মধ্যবর্তি এলাকা দিয়ে/মাঝখানদিয়ে ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা নদীতে মিলিত হয়েছে যে নদী, সেটি হল তিস্তা নদী।
বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় যে প্রায় ৪ শত বছর আগে তিস্তা নদীর প্রবাহ ভিন্ন পথে ছিল। এক প্রলঙ্করী বন্যা ও ভূমিকম্পের ফলে তিস্তা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদসহ আরো অনেক নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। তিস্তা নদীর পুরাতন প্রবাহ এখন বুড়িতিস্তা হিসাবে পরিচিত। ভারতের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ি রাঙাপানি মহাশ্মশান সংল্গ্ন এলাকায় ১৯৫০ সালে বুড়িতিস্তায় বাঁধ দিয়ে রাস্তা নির্মাণের কারণে মূলস্রোত আর নাই। শুধুমাত্র বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি দ্বারা প্রবাহমান থাকে। বুড়িতিস্তা নীলফামারী জেলার ডোমার ও জলঢাকা এবং পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলায় প্রবাহিত হয়ে করোতোয় নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। বুড়িতিস্তার লোকজ তথ্য থেকে জানা যায় যে, সেই নদীর প্রবাহ খুবই খরস্রোত ছিল এবং বিভিন্ন দেশ থেকে এই নদীপথে বাণিজ্য জাহাজ আসা-যাওয়া করতো। শীতকালে বুড়িতিস্তার বুকে ধানচাষ করা হয়। এই নদী এখন একটি দীর্ঘতম খাল মাত্র।
তিস্তা নদীর মূল স্রোত চীনের পূর্ব তিব্বত এলাকা ঘেষে ভারতের অঙ্গরাজ্য সিকিমে অবস্থিত পহুনরি পর্বতের পাদদেশের জেমু গ্লেসিয়ার হিমবাহ থেকে উৎসরিত হয়েছে। যা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০৬৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। তারপর থাংগু, যুমথাঙ্গ এবং দঙ্খা পর্বমালা পেরিয়ে সিংটম শহরে পাশঘেষে রানীখোলা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। তারপর রংপোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তিস্তার দ্বিতীয় বৃহত্তম উপনদী রংপো নদী মিলিত হয়েছে এবং সেখান থেকে তিস্তা বাজার পর্যন্ত সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সীমান্ত তৈরি করেছে। তিস্তা সেতুর ঠিক আগে, যেখানে কালিম্পং এবং দার্জিলিং থেকে রাস্তাগুলি মিলিত হয়েছে, সেখানে নদীটি আরো একটি বৃহত্তম উপনদী রঙ্গিত দ্বারা মিলিত হয়েছে। তাছাড়া, পশ্চিমবঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন নামে তিস্তা নদীর কয়েকটি ছোট-বড় উৎস রয়েছে।
ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর সিকিম, পূর্ব সিকিম, পাকিয়ং, কালিম্পং, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলাসমূহের প্রধান ও অন্যতম নদী হচ্ছে তিস্তা। সেই জন্য এই নদীকে ঐসব এলাকার জীবন রেখা বলা হয়। এই নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪১৪ কি.মি. তার মধ্যে সিকিমে ১৭০ কি.মি, পশ্চিমবঙ্গে ১২৩ কি.মি, এবং বাংলাদেশে প্রায় ১২১ কি.মি।
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীর তুলনায় আকারে কিছুটা কম হলেও এর গুরুত্ব অনেক। এই নদীর তিস্তার প্রবাহ দ্বারা বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের ৫টি জেলায় ১৪ টি উপজেলা অর্থাৎ নীলফামারী জেলার ডিমলা, জলঢাকা ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা; রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলা; গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা; লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী, লালমনিরহাট সদর উপজেলা; কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার কৃষি, মৎস্য, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ-প্রতিবেশ, জনঅর্থনীতি, সংস্কৃতি, সভ্যতা ইত্যাদি প্রত্যক্ষভাবে নির্ভর করে। দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তিস্তা প্রবাহের সাথে সংশ্লিষ্ট ১৪ টি উপজেলায় মোট প্রায় অর্ধকোটি জনসংখ্যার বসবাস।
রংপুর, দিনাজপুর, নিলফামারী ও বগুড়া জেলার অনাবাদী জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের জন্য ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন সরকার তিস্তা ব্যারেজ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে ৬১৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে ৪৪ রেডিয়াল গেট বিশিষ্ট ব্যারেজের নির্মাণ কাজ শুরু হয়, যা ১৯৯০ সালে শেষ হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী; তৎকালীন হিসাবে তিস্তা ব্যারেজ ও সেচ প্রকল্প নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২১,৬০০ কোটি টাকা। তারসাথে প্রতিবছর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা ব্যায় যোগ করলে রাষ্ট্রিয় ব্যায়ের তুলনায় এই ব্যারেজ ও সেচ প্রকল্প তেমন কোনো উপকারে আসছে না। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে তিস্তা নদীর প্রবাহ না থাকায় শুস্ক মৌসুমে প্রায় ১৭ লাখ ২৯ হাজার একর জমির চাষাবাদ হুমকির ম‚খে পড়ে। যার ফলে কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় পাঁচশ কোটি টাকা। বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে তিস্তা নদীর ৪০টি দেশিয় জাতের মাছের প্রজাতি বিপন্নপ্রায়। অন্যদিকে, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে তিস্তা নদীর ভাঙ্গনের ফলে কয়েক হাজার পরিবার একবারে নি:স্ব হয়ে যায়। ২০২১ সালের বন্যায় তিস্তা পাড়ে সববাসকারী প্রায় ১০ হাজার কৃষক পরিবার একেবারে নি:স্ব হয়ে গেছে। বিগত ৩০ বছরের ক্ষতি হিসেব করলে তার পরিমান ও সংখ্যা অনেকগুণ বেশি হবে।
বর্তমানে তিস্তা নদীর গড় প্রশস্ততা প্রায় ৫ কি.মি. হলেও গজলডোবা ব্যারাজে এই নদী প্রায় ৯৩০ মিটার প্রশস্ত এবং ডালিয়া ব্যারাজে এই নদীর প্রশস্ততা প্রায় ৬১৫ মিটার রাখা হয়েছে। উভয় ব্যারাজ দিয়ে নদীর পানি কৃত্রিম খালের মাধ্যমে সেচ কাজে সরবরাহ করা হয়। তাছাড়া, তিস্তা নদীর উজানে সিকিমে প্রায় ৮৪ গিগা-ওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। ফলে, বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ বেড়ে যায় এবং শীত মৌসুমে পানি আটকে থকে। শীত মৌসুমে অতি সামান্য পানি বাংলাদেশে তিস্তা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু বর্ষাকালে বহুগুণ পরিমানে পানি প্রবাহিত হওয়ায় নদীর দু’পাশ ভেঙ্গে-চুরে জনজীবন তছনছ হয়ে যায়।
তদুপরি, আবারও যদি যথাযথ ও মানসম্মত সমীক্ষা না করে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় কোনো বৃহৎ প্রকল্প বা পরিকল্পনা বাস্তাবায়ন করা হয়, তার ফলাফল কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক হবে, তা অনুমান করা মুশকিল। তবে, তার সুদাসলে মূল্য পরিশোধ করতে হবে জনগণকেই।
আমরা জানি যে, তিস্তাসহ সকল নদ-নদী প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া প্রবাহিত হয়ে থাকে। এই ধরনের সকল নদ-নদীই মিষ্টিপানির ভান্ডার এবং মানব-সভ্যতার ধারক ও বাহক। বিশ্বের মাত্র ৩ ভাগ পানি মিষ্টি আর ৯৭ ভাগ পানি লবনাক্ত। সম্ভবত তারই গুরুত্ব অনুধাবন থেকে এই ঊপমহাদেশে দেব-দেবীর নামের সাথে যুক্ত করে সকল নদ-নদীর নামকরণ এবং নদীর পানিকে পবিত্র ঘোষনা করা হয়। কিংবদন্তি অনুসারে তিস্তা হচ্ছে, দেবী পার্বতীর একটি পবিত্র অঙ্গ। কিন্তু আজ দু:খজনক হলেও সত্য যে, রাষ্ট্রিয় ও সামাজিকভাবে নদ-নদীকে দেব-দেবীর মত শ্রদ্ধা বা পবিত্র জ্ঞান না করার ফলে, নদ-নদীতে সকল প্রকারের বৈর্জ্য দিয়ে এমনভাবে ক‚লুষিত করা হয় যে, সেই পানি পান করা তো দুরের কথা, জনস্বাস্থ্য, মৎস্য সম্পদ ও কৃষি পণ্যের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে যায়। সর্বোপরি, নদীর এই দুষিত বৈর্জ্য সমেত পানি সমুদ্রে পতিত হয়।
আবহমানকাল ধরে নদ-নদীর গতি-প্রকৃতি ও পবিত্রতা উপলব্ধি করে ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা ও নগরী গড়ে উঠেছে। তাছাড়া, নদ-নদীর পানির স্বভাবিক প্রবাহের সাথে জীবনরেখার সব ক্ষেত্রেই সম্পর্ক আছে, যেমন; আবহাওয়া, পরিবেশ, প্রতিবেশ, বন, কৃষি, মৎস্য, গবাদি পশু-পাখি, জনস্বাস্থ্য, জলজপ্রাণী, ভূগর্ভস্থপানি, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, সভ্যতা, শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, ব্যবসা, বাণিজ্য, ভ‚মি ব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি।
ভূ-প্রকৃতিগত কারণেই আমাদের দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর গতি-প্রকৃতি স্থির নয়। তাই সভ্যতার শুরু থেকে নবাবী আমল পর্যন্ত বড়বড় নদ-নদীর পাড়ে বড় ধরনের কোনো স্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেনি। ১৭৫৭ সাল পরবর্তি বিশ্বব্যাপি তথাকথিত শিল্প-বিপ্লব ও ঊপনিবেশের বিস্তারের মধ্যদিয়ে সম্পদের লুন্ঠন প্রক্রিয়া শুরুর কারণে নদ-নদীর স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতি ও প্রকৃতির সুরক্ষা পদ্ধতি নষ্ট হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শতাব্দির ষাটের দশকে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির মাধ্যমে নদ-নদীর শাসন করে তা আরেক ধাপ এগিয়ে যায়। তাৎক্ষণিক লাভের আশায় নদী প্রবাহের জন্য ক্ষতিকর অনেক কার্যক্রম চলমান থাকার ফলে, বাংলাদেশ ভ‚খন্ডে প্রায় শ’খানেক নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। দেশীয় মাছের অন্তত ২০টি প্রজাতির আর কোনো হদিস মেলে না এবং ১০০টি মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত পায়। দেশীয় জাতের অনেক পশু পাখিও আজ বিপন্ন হতে চলেছে। সর্বোপরি, নদীর পানি ও পানি প্রবাহের গুরুত্ব বিবেচনায় উচ্চ আদালত কর্তৃক নদীকে জীবন্ত সত্তার মর্যাদা দিলেও রাষ্ট্রিয়ভাবে বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে তা স্বীকৃতি পায় নি।
নদীপাড়ে বসবাসকারীদের মতে তিস্তা নদীতে অনেকগুলো ব্যারেজ ও ড্যাম নির্মাণের পর থেকে তিস্তা নদীর স্বাভাবিকতা আর নাই; শীতে মরু আর বর্ষায় ভাঙ্গন বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালে ডিমলা উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নে তিস্তা পাড়ের ভাঙ্গন অতীতের সব দ‚র্যোগকে হার মানিয়েছে। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ অনেকে অনলাইনে আপলোড করেছে। তা দেখে ভাঙ্গনের তীব্রতা, ক্ষতির বর্ণনা ও নদীপাড়ে বসবাসকারীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অনুমান করা যায়। একই বছরে তিস্তাপাড়ে অন্যান্য ইউনিয়নের ভাঙ্গনের নির্মম অভিজ্ঞতার বর্ণনা অনেক পত্রিকা ও চ্যানেলে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশে ডালিয়া, ভারতে গজলডোবা ও সিকিমসহ বিভিন্ন এলাকায় ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মাণ হলেও তিস্তা নদীর গতি প্রকৃতি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রভাব নিয়ে যথাযথ গবেষণা এখনো হয় নি। অন্যদিকে, অতীতের শিক্ষা ও ধারনার ভিত্তিতে প্লাবন রোধ করতে কিছুটা পদক্ষেপ চলমান থাকলেও তা কার্যকর নয় বলে মন্তব্য নদীপাড়ে বসবাসকারীদের। সরকারিভাবে যাই পদক্ষেপ থাকুক না কেন, মৎস্যজীবী ও কৃষক পরিবারের ক্ষতির হুমকী ও আশঙ্কা কমছে না। তিস্তা নদীতে সারা বছর পানি প্রবাহ ঠিক না থাকায় কমপক্ষে ৫টি শাখা নদী আজ মৃতপ্রায়।
প্রত্যক্ষভাবে নদীপাড়ে বসবাসকারী মৎস্যজীবী ও কৃষকগণ ক্ষতিগ্রস্ত হিসাবে প্রতীয়মান হলেও পরোক্ষভাবে আমরা সকলেই এই ক্ষতির শিকার। তিস্তা নদীতে মৎস্য উৎপাদন, তিস্তাপাড়ে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে তা সামগ্রীক জাতীয় উৎপাদনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেক্ষেত্রে এই আংশিক ক্ষতি পূরণের জন্য বিদেশী মুদ্রা ব্যয় করে প্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানি করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য আমদানি করা যায় না। তখন খাদ্যাভাসে পরবর্তন আসে। আর সুষম খাদ্য হচ্ছে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রাথমিক উপাদান।
এছাড়াও ভ‚মি কেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার শিক্ষা, নীতি ও আদর্শের কারণে পানিসম্পদ অনেকটাই অবহেলিত। একদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সকল নদ-নদীর গতিপথ রোধ করে বা নদীর জায়গা দখল করে নগরায়ন ও শিল্পায়ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সেই নদী বৈর্জ্য নিক্ষেপ ও অপসারণের আদর্শ স্থানে পরিণত হয়েছে। আবার আমদের সুপেয় পানি দরকার কিন্তু পানির উৎস্যসম‚হের অধিকাংশই কুলুষিত করা হয়েছে। ফলে বাড়ছে সুপেয় পানির বাজার ম‚ল্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার হুমকী। গৃহস্থলী ও কল-কারখানার বৈর্জ্য ভ‚-উপরিভাগ ও ভ‚-গর্ভস্থ্য পানিকে কুলুষিত করার ফলে মৎস্য ও কৃষিজ উৎপাদনের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে, মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। এর প্রভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে দুরারোগ্য ব্যাধি ও বৃদ্ধি পাচ্ছে চিকিৎস্যা ব্যয়।
এতসব ক্ষতি বিবেচনায় রেখে শতবছরেও পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কোন ইতিবাচক পরিবর্তন আসে নি। উপরন্তু, নদ-নদীর ভাঙ্গন থেকে রক্ষায় ভেড়িবাধ তৈরির নামে প্রতিবছর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা জাতীয় রাজস্ব খাত থেকে খরচ হয়, যার অধিকাংশই অপচয় মাত্র। তাছাড়া, নদীভাঙ্ন রোধ করার প্রক্রিয়া কারো কারো জন্য লাভজনক ও ব্যবসা বটে।
আবার তিস্তা নদীর সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রবাহমান দেশ ও পক্ষের সাথে কোনো প্রকারের সমঝোতা না হওয়ার ফলে, চলমান ক্ষতি রোধ করা যাচ্ছে না। উপরন্তু পক্ষসম‚হের মধ্যে অনাস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ বিষয়ে একটি আইন প্রস্তাব করা হয়। যা বিশ্বের ৩৬টি দেশের স্বাক্ষরের মাধ্যমে ২০১৪ সালে তা আইনের স্বীকৃতি লাভ করেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে সব দেশে নদ-নদীর সংখ্যা বেশি অর্থৎ চীন, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ভুটান, বার্মা, বাংলাদেশ এই আইনে স্বাক্ষর করেনি। ফলে, আইনে উল্লেখিত নীতি ও প্রক্রিয়াসম‚হ দ্বিপাক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় স্থান পাচ্ছে না। পরবর্তি প্রজন্মের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে যতদ্রুত সম্ভব বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশসমূহ আন্তর্জাতিক পানি আইনে স্বাক্ষর করা এবং এর নীতির আলোকে নদীর সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য বহুপক্ষীয় সমঝোতা ও চুক্তি হওয়া দরকার। তাহলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় অনেক সমস্যার ইতিবাচক সুরাহা হতে পারে।
অন্যদিকে, নদী প্রবাহের সাথে ভূমি ব্যবস্থাপনার নিবিড় সম্পর্ক আছে। কিন্তু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার সাথে ভূমি ব্যবস্থাপনার কোনো যোগসূত্র না থাকায় জনভোগান্তি বেড়েই চলেছে। ১৯৫১ সালে প্রণীত ভূমি আইনের ৮৬-৮৭ ধারা অনুযায়ী ভূ-উপরিভাগে প্রবহমান পানির গতিপ্রকৃতি ভূ-সম্পত্তিকে গিলে খায়। ১৮২৫ সালে ঊপনিবেশিক সরকারের আমলে তৈরি সিকস্তি-পয়োস্তি বিষয়ক ভূমি আইনের ধারাবহিকতায় বর্তমান ভূমি আইনের ৮৬ ধারায় ক্ষতিপূরণ ছাড়াই সমূদ্রে বা নদীগর্ভে বিলীন বা সিকস্তি জমি খাস করার বিধান রাখা হয়েছে। আবার সিকস্তি জমি পরবর্তি ৩০ বছরের মধ্যে স্বস্থানে প্রাকৃতিকভাবে জেগে উঠলে পূর্বের মালিকগণ কালেক্টরের মাধ্যমে জমি ফেরত পাবেন। কিন্তু সিকস্তি জমি পয়োস্তি হওয়ার পর তা পূর্বের মালিকগণকে ডেকে ফেরত দেয়া হয়েছে এমন ঘটনা জানা নাই। উপরন্তু পয়োস্তি জমি জবর দখল ও জাল দলিল হয়েছে এমন ঘটনা অহরহ।
উল্লেখ্য যে, ১৮২৫ সালে ভূমির মালিক হিসাবে ছিল জমিদারগণ, আর কৃষক ছিল খাজনা প্রদানের শর্তে চাষাবাদকারি প্রজা বা রায়তি দখলদার। খাজনা আদায়ের ভিত্তিতে “লাঙ্ল যার জমি তার, আর জাল যার জলা তার” নীতির প্রচলন ছিল। তখনকার প্রেক্ষাপট অনুসারে সেই বিধান সাধারণ জনগণের জন্য তেমন ক্ষতিকর হয় নি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ও গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এই আইন দেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং এটিকে আদর্শিক সমাজে মানবাধিকারের মানদন্ডে একটি কালাকানুন বলা যেতে পারে।
নদীভাঙ্গার কারণে এমনিতে অনেক পরিবার তাৎক্ষণিকভাবে মাথাগোঁজায় ঠাঁই যোগাড়ে হিমসিম খায়। তারা ব্যবহার্য্য কিছু সম্পদ সাথে নিয়ে অন্যত্র চলে যায়। এই অবস্থায় জমির কাগজপত্র পরবর্তি ৩০ বছর কোথায় কিভাবে সংরক্ষণ করবে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ৩০ বছরে মানুষের জীবনের অনেক কিছু বদলে যায়, জমির মালিকানার কাগজ তাবিজ বানিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখলে কি তাদের জীবনের ৩০ বছরের ভোগন্তি থেকে মুক্তি পাবে? তাছাড়া, সে জমি ৩০ বছরের মধ্যে ফিরে পাবে তার নিশ্চয়তা কি?
২০১৩ সালের এক সমীক্ষায় জানা যায় যে, জীবিকা ও সমাজবদ্ধ জীবনের তাগিদে অনেক স্বচ্ছল কৃষক পরিবারও ভূমিহীন ও দিনমজুর অবস্থায় তিস্তাপাড়ে খাসজমিতে দীর্ঘদিন যাবৎ বসবাস করছে। যেদিন খাসজমি নদী হয়ে যাবে! সেদিন তার ঠাঁয় কোথায় হবে তারা নিজেরাও জানেন না। ২০২১ সাথে তাদের কয়েকজনের তথ্য নিয়ে জানা যায় যে, বিগত ৮ বছরে তিস্তা নদীর ভাঙ্গনের ফলে প্রতিটি পরিবারের ভিটা এক বা একাধিকবার সরাতে হয়েছে। মাত্র কয়েকজনের নিজস্ব জমিতে বসতি আছে। বাকিরা সবাই ভূমিহীন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের গবেষণা প্রতিষ্ঠান “সিইজিআইএস”র প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবছর নদীভাঙ্গনে কমপক্ষে ১০ হাজার একর জমি সিকস্তি হয়। প্রতিবছর প্রায় ৩৮ হাজার পরিবার প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের শিকার হয়। এর ফলে কৃষিজমি, বাড়ি-ঘর, বিভিন্ন প্রকারের সম্পদ নষ্ট হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাণহানী পর্যন্ত ঘটে। গরীব, ধনী নির্বিশেষে সবাই এ নদীভাঙনের শিকার হয়। বিপন্ন জনগোষ্ঠীর কৃষি আয় কমে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত লোকেরা সম্পদ হারিয়ে জমানো সঞ্চয়ের ওপর হাত বাড়ায় এবং প্রায়শই নতুন ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে। এভাবে লক্ষাধিক গৃহহীন পরিবার উন্মুক্ত আকাশের নিচে, পথের পাশে, বাঁধ, ফুটপাথ বা সরকারের খাস জমিতে এসে আশ্রয় নেয়।
আমরা জানি যে, নদীভাঙ্গন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কখনো কখনো নদীপথে কৃত্রিম বাধাসৃষ্টি হওয়ায় কোথাও কোথাও অস্বাভাবিক ভাঙ্গনের উদ্রেগ হয়। অনেকক্ষেত্রে নদীপাড়ের জনগোষ্ঠি এই অস্বাভাবিক ভাঙ্গনের শিকার হয়। যেমনটি হয়েছে, গজলডোবা ও ডালিয়া পয়েন্টে বাঁধ দেয়ার কারণে। ঘটনা যাই হোক নদীভাঙ্গনের ফলে মানুষ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরদিকে নদীভাঙ্গনের ফলে সমুদ্বয় জমির মালিকানা সরকারের হয়ে যায়। যা একধরনের প্রাকৃতিক অধিগ্রহণ। অথচ এই অধিগ্রহণের কোনো প্রতিদান না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদি চরম অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব নদীভাঙ্গা পরিবারের ভবিষ্যৎ নিম্নম‚খি হয়ে যায়। দেশের মহানগরী সম‚হের মধ্যে অবস্থিত বস্তির মধ্যে এসব পরিবার আশ্রয় ও কাজের সন্ধানে দেশের ভিন্ন এলাকা থেকে চলে আসে। এসব বস্তিতে আশ্রয় নেয়া পরিবার আরো অনিশ্চয়তার মধ্যে পতিত হয় যেমন; বস্তিতে অগ্নিকান্ড, বিভিন্ন ধরনের দ‚র্ঘটনা, অভাবের কারণে মাদকদ্রব্য ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধম‚লক কাজে জড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়। যা তাদের পরিবারের সকল সদস্যের জন্য দুর্ভাগ্যজনক আবার, পুরো দেশের জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নদ-নদী একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সম‚হের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা অনস্বীকার্য্য যে, নদীপাড়ের কৃষক, জেলে ও খেটে খাওয়া পরিবারসমূহ বরাবরই জাতীয় অর্থনীতিতে ও খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। তাদের অবদান অব্যাহত রাখতে তাদের বেঁচে থাকার সুরক্ষা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু নদীপাড়ের জনজীবনের সুরক্ষার জন্য গৃহীত সকল প্রচেষ্টা ও বাজেটের বরাদ্দ ভেস্তে যাচ্ছে। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার আলোকে অবশ্যিকভাবে চলমান কার্যক্রম ধারার পরিবর্তন এবং জাতীয় সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অধিকার নিশ্চিৎ করা দরকার।
জাতিসংঘ প্রণীত ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ আইনের অনুচ্ছেদ-৭ অনুযায়ী ক্ষতিপ‚রণের ব্যবস্থা আছেন
৭.১ পানিপ্রবাহ রাষ্ট্রগুলো নিজ ভ‚খন্ডে আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য পানিপ্রবাহ রাষ্ট্রের ক্ষতি রোধে যথাযথ সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
৭.২. তা সত্বেও, যে ক্ষেত্রে অন্য কোনো পানিপ্রবাহ রাষ্ট্রের ক্ষতি সাধন হবে, যে রাষ্ট্র দ্বারা এই ক্ষতি সাধন হবে, এই ধরনের (পানিপ্রবাহ) ব্যবহারের চুক্তির অনুপস্থিতিতে, সে রাষ্ট্র অনুচ্ছেদ ৫ ও ৬ এর বাধ্যবাধকতার আলোকে এই ধরনের ক্ষতি দূরীকরণ অথবা নিষ্পত্তি এবং ক্ষতিপ‚রণের বিষয়ে আলোচনা সাপেক্ষে অবশ্যই প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
উক্ত আইনে বাংলাদেশ, ভারত, চীনসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশসম‚হ স্বাক্ষর না করার কারণে, বহুদেশিয় নদীসমূহের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই আইনে কোনো সুফল এবং বিরোধ নিরসনে জাতিসংঘের কোনো সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
আবার, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল সম্পদের মালিক হচ্ছে, জনগণ; যেমন:
৭। (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।
(২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যাক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।
অতএব, দেশের কোনো জনগণ ভ‚মিহীন থাকা অথবা সম্পদহীন হওয়া দেশের সংবিধানের পরিপন্থি। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের ব্যবহারের জন্য কোনো জমি অধিগ্রহণ করা প্রয়োজন হলে বাংলাদেশের ভূমি আইনের অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ২০১৭ সালে সংশোধিত বিধি-বিধান অনুসারে স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তির ক্ষতিপ‚রণসহ স্থানান্তর বাবদ ব্যয় প্রদান করা হয়। অথচ নদীর জন্য প্রাকৃতিক নিয়মে জমি অধিগ্রহণ করে খাস করা হলেও তার বিপরিতে কোনো ক্ষতিপ‚রণের বিধান নাই। যা জমি অধিগ্রহনের ক্ষেত্রে দ্বিম‚খি নীতির প্রচলন। তাছাড়া, যে কোনো প্রকারের দুর্ঘটনা ও সম্পদের সম্ভাব্য ক্ষতির ক্ষেত্রে বীমার প্রচলন থাকলেও প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বীমার কোনো প্রচলন নাই। ফলে, নদী ভাঙ্গনের কারণে প্রতিবছর হতদরিদ্র পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে নদী ভাঙ্গনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পারিবার সমূহের ক্ষতিপ‚রণের আলোচনা খুবই প্রাসঙ্গিক।
ক্ষতিপ‚রণ বিষয়টি প্রচীনকাল থেকে ন্যায় বিচারের একটি মানদন্ড হিসাবে প্রচলিত আছে। তবে, ন্যায় বিচারের মানদন্ড সকল ক্ষেত্রে এক হয় না। তা নির্ভর করে সমাজ, ক্ষেত্র, প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্টবিষয়ের ধারনা ও সমাজের ম‚ল্যবোধের উপর।
কারণ মানদন্ড নির্ধারণের প্রক্রিয়া, শিক্ষা, সমাজে প্রচলিত নীতি, অভিপ্রায় বা মানষিকতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গুরুত্ব একক স্থানে একেক ধরনের। তাই, বিভিন্ন সমাজে বা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ক্ষতিপ‚রণের হিসাবে ভিন্নতা হয়। যেমন, শ্রমের ক্ষেত্রে আর সম্পত্তির ক্ষেত্রে ক্ষতিপ‚রণের মানদন্ড আলাদা। আবার এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার ক্ষতিপ‚রণের মানদন্ড আলাদা।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সামান্য ক্ষতি কবিতায় স্থাবর সম্পদের ক্ষতি‘র ধারণার প্রেক্ষিত ও মানদন্ডের ভিন্ন ভিন্ন রূপ সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
এই কবিতায় রানীর বক্তব্য: রুষিয়া কহিল রাজার মহিষী, “গৃহ কহ তারে কী বোধে! গেছে গুটিকত জীর্ণ কুটির, কতটুকু ক্ষতি হয়েছে প্রাণীর? কত ধন যায় রাজমহিষীর এক প্রহরের প্রমোদে! ”
অন্যদিকে রাজার অভিমত: কহিলেন রাজা উদ্যত রোষে, রুধিয়া দীপ্ত হৃদয়ে – “যতদিন তুমি আছ রাজরানী, দীনের কুঠিরে দীনের কী হানি, বুঝিতে নারিবে জানি তাহা জানি - বুঝাব তোমারে নিদয়ে।”
একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের যন্ত্রণা ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বেদনা অন্যদের বুঝতে পারা বা না পারার বিষয়টি কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার তার এক কবিতায় যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন;
“চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন, ব্যথিতবেদন বুঝিতে কি পারে।
কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কীসে, কভু অশী বিষে দংশেনি যারে।
যতদিন ভবে, না হবে না হবে, তোমার অবস্থা আমার সম;
ঈষৎ হাসিবে শুনে না শুনিবে, বুঝে না বুঝিবে যাতনা মম।”
অন্যের দু:খে ও সুখে সহভাগি হওয়ার মাধ্যমেই ভালো সমাজ নির্মাণ সম্ভব। আর, সুখি সমাজের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, সকলে মিলেমিশে ভালো থাকা। অতএব, নিজে ভালো থাকতে হলেই অন্যের ভালো থাকার বিষয়ে ভাবতে হবে সর্বাগ্রে। ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যথিত লোকের কষ্ট কমাতে সমাজে অন্যদের দায়িত্ব বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে কামিনী রায় এক কবিতায় যেভাবে বর্ণনা করেছেন;
“আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে, আসে নাই কেহ অবনী পরে
সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”
অর্থাৎ নদী বা সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাওয়া পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও পূর্বাসনের বিষয়ে পুরো সমাজের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে ন্যায্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রিয়ভাবে নিয়মতান্ত্রিক পন্থার প্রচলন করা আবশ্যক। তবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হয় প্রচলিত ধারণা প্রসূত প্রতিষ্ঠিত আইন দ্বারা। তাই, ক্ষতিপূরণের ধারণা ও আইন দুটোই বদলাতে হবে।
আরেকটি প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিয়ষ হচ্ছে ভূমিহীনতা। কর্তৃপক্ষের অনুমতিবিহীন বা কবুলিতবিহীন খাসজমিতে বসবাস করলে তাকে অবৈধ বলা হয়। খাসজমি অধিগ্রহণ করা হলে বসবাসকারীদেরকে আইনগতভাবে কোনো ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয় না। অর্থাৎ খাসজমিতে বসবাসকারী ভূমিহীন কোনো ক্ষতিপূরণ পাবে না। তাহলে, কারা এই ভূমিহীন?
কোথা থেকে আসে তারা? এর জবাব পেতে বিগত কয়েক শতকের ইতিহাস ও প্রবর্তিত আইনসমূহ ভালোভাবে অধ্যয়ন করতে হবে।
যেমন: ১৭৫৭ সালের ঊপনিবেশিক আগ্রাসণ পরবর্তি ১৭৯৩ সাল থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা জমিদারি প্রথা চালু হওয়ার পর সকল জমির মালিকানা জমিদারদের উপর বর্তায় এবং কৃষক ও জনগণ রায়ত বা প্রজা হিসাবে উচ্চহারে খাজনা প্রদানের শর্তে বসবাসের সুযোগ পায়। যারা এর বিরোধিতা বা বিদ্রোহ করেছিল তারা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও জমিদারদের রোষের কারণে নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল।
অনেক রক্তপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পর বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ১৮৮৫ প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রজাগণকে যে কোনো অযুহাতে উচ্ছেদ বন্ধ হয় এবং রায়ত বা প্রজা হিসাবে বসবাসের অধিকার স্বীকৃত হয়। যেসব প্রজা ১২ বছরের কম কোনো জমিতে বসবাস বা চাষাবাদ করে আসছিল বা জমিদারদারী প্রথার বিপক্ষে ভূমিকা রেখেছিল তারা রায়ত বা প্রজা হিসাবে জমির খতিয়ানে স্বীকৃতি পায় নি। সেই থেকে ভূমিহীন হিসাবে অনেকে রয়ে গেছে। পরবর্তিতে রাষ্ট্রিয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ দ্বারা জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ ও রায়ত বা প্রজাগণকে জমির মালিক হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। কিন্তু ভূমিহীনরা বাদ থেকে যায়। উপরন্তু. উক্ত আইনের ধারা ৮৬ অনুযায়ী নদী ও সম‚দ্রেগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার ফলে নদীপাড়ে বসবাসকারীরা ভূমিহীন তালিকায় যোগদান করতে থাকে।
তাই দেখা যায়, অনেক বংশ পরস্পরা ভূমিহীন আছে; কতপুরুষ থেকে ভূমিহীন আছে তার সঠিক ইতিহাস অনেকের জানা নাই। আর নদী সিকস্তির কারণে ভূমিহীন সংখ্যা প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ভূমিহীনদের পূনর্বাসনের কোনো নির্দিষ্ট আইন আজো প্রণীত হয় নি। ১৯৮৭ সাল থেকে খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা আছে, যা দ্বারা দেশের সকল ভূমিহীনদের পূনর্বাসন নিশ্চিত করে নাই। আইনের সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে অনেকে বংশ পরম্পরা ভূমিহীন থেকেই যাচ্ছে। অথচ ভূমিহীনদেরকে পূনর্বাসনের পরিবর্তে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। যা বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৭ এর পরিপন্থি। দেশের মালিক হচ্ছে জনগণ আর সেই জনগণ কি না ভূমিহীন! অর্থাৎ অবৈধ বসবাসকারী!
অথচ ভূমিহীনসহ সকল নাগরিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষোভাবে জাতীয় রাজস্বে ও জিডিপি’তে যোগানদাতা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী বছরে মাথাপিছু প্রদত্ত করের পরিমান প্রায় ৬৬ হাজার টাকা। তাছাড়া তাদের শ্রমের উপর বৃদ্ধি পাচ্ছে দেশের উন্নয়ন। অর্থাৎ ভূমিহীন বা খাসজমিতে তথাকথিত অবৈধ বসবাসকারীরাও জাতীয় রাজস্বে ও জিডিপি’তে যোগান দিয়ে দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করছে।
সর্বপরি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নদীর পরিবেশ-প্রতিবেশ অক্ষুন্ন রাখতে, মৎস্য সম্পদ ও কৃষির উৎপাদন স্বাভাবিক করতে এবং জাতিয় সম্পদের ক্ষতি কমানোসহ সবদিক বিবেচনায়; জাতিসংঘ প্রণীত আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ আইনে স্বাক্ষর করে তদানুযায়ী নদীর প্রবাহের উৎস্য থেকে শেষ পর্যন্ত সকল প্রকারের বাধা অপসারণ করার উদ্যোগ নেয়া এবং অবাহিকা ভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরী করা দরকার। তাছাড়া, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের আলোকে, সকল প্রকার জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে একই নীতির অনুসরণ করতে, দেশের জনগণকে হতদরিদ্র হওয়া থেকে বাঁচাতে, ভবিষ্যত প্রজন্মের উন্নয়নের গতি নষ্ট হওয়া রোধ করতে, দেশের হতদরিদ্র পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করতে, নদীপাড়ের কৃষক, জেলে ও খেটে খাওয়া মানুষের দীর্ঘ দিনের অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ২০১৭ সালে প্রণীত জমি অধিগ্রহণ আইনের বিধি-বিধান অনুসরণে নদীভাঙ্গা সকল পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পূর্বাসন প্রদান করার আইন তৈরি করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
লেখকঃ সদস্য সচিব, নদী অধিকার মঞ্চ।
এই বিভাগের আরও খবর