লালমনিরহাট বার্তা
রংপুরের সাবেক এমপি করিম উদ্দিন ভরসা না ফেরার দেশে চলে গেলেন
রংপুর অফিসঃ | ২৩ জুলাই, ২০২২ ১:৩৬ PM
রংপুরের সাবেক এমপি করিম উদ্দিন ভরসা না ফেরার দেশে চলে গেলেন
রংপুরের দুইটি আসনের তিন বারের সংসদ সদস্য বিশিষ্ট শিল্পপতি করিম উদ্দিন ভরসা না ফেরার দেশে চলে গেলেন। শনিবার ২৩ জুলাই দুপুর ১২টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি----------রাজিউন)।তিনি করোনা আক্রান্ত ছিলেন। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বড় ছেলে সিরাজুল ইসলাম ভরসা এবং আরেক ছেলে কামরুল ইসলাম ভরসা। করিম উদ্দিন ভরসা পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি সপ্তম ও অষ্টম নির্বাচনে রংপুর-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮বছর ।
তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। করিম উদ্দিন ভরাসার ১০ ছেলে ৬ মেয়ে। সম্পত্তি নিয়ে ছেলে-মেয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চরম বিরোধ ছিল। পিতা করিম উদ্দিন ভরসাকে নিয়ে সন্তানদের মধ্যে দুটি পক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। আগামী কাল রোববার বিকেলে তার জানাজার নামাজ হারাগাছ সারাই জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। পরে তার দাফন কার্য সম্পন্ন করা হবে বলে তার ছেলে জানান।
পারিবারিক সূত্রে জানাগেছে, মৃত্যুর আগে করিম উদ্দিন ভরসাকে আটকে রাখা হয়েছে কি না তা জানতে সম্প্রতি তাকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। ছেলে সাইফুল উদ্দিন ওরফে শিমুল ভরসাকে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। শিমুল ভরসার জিম্মায় রয়েছে করিম উদ্দিন ভরসা এমনটা দাবি করে তার ৯ সন্তানের হেবিয়াস করপাস (হাজিরের নির্দেশনা) আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল সহ ওই আদেশ দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের ওই আদেশ বিরুদ্ধে গত ৬ মার্চ সুপ্রিম কোর্টে শিমুল ভরসা আবেদন করলে সুপ্রিমকোর্ট ৬ সপ্তাহের জন্য ওই আদেশ স্থগিত করেন। স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে শফিকুল ইসলামসহ ৯ সন্তান পুনরায় আবেদন করলে করিম উদ্দিন ভরসাকে এক শনিবার পর পর অর্থাৎ ১৫ দিন পর রংপুরের জজ আদালতে হাজির করে ছেলে-মেয়েদের সাথে দেখা করার সুয়োগ করে দিতে নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। কিন্তু কোন শনিবারই রংপুরের আদালতে হাজির করেন নি করিম উদ্দিন ভরসার অপর পক্ষের ছেলে মেয়েরা।
করিম উদ্দিনের বড় ছেলে সিরাজুল ইসলাম ভরসা বলেন, বাবার জানাজার নামাজ ও দাফনকার্য রংপুরে সম্পন্ন করা হবে।আরেক ছেলে, কামরুল ভরসা বলেন, আমরা বাবাকে দেখার জন্য ৩ বছর ঘুরেছি। কিন্তু ওরা আদালতের নির্দেশেও বাবাকে দেখতে দেয়নি। মৃত্যুর সময় বাবার মুখ দেখতে পারলাম না এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কি হতে পারে।

রংপুর বিভাগে প্রকৃতিতে চলছে সূর্য্যের তাপদাহে ভূমিতে উত্তাপ ও ভ্যাপসা গরম। আষাড় মাষে স্বাভাবিক চাহিদার মাত্র দশমিক ৫২ শতাংশ বৃষ্টি হয়েছে।এখন সর্বত্রই চলছে পানির জন্য হাহাকার। রংপুর কৃষি বিভাগ বলছে আট জেলায় এবার প্রায় নয় লাখ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও অনাবৃষ্টির কারণে আবাদ হয়েছে মাত্র এক লাখ হেক্টরে। আমন রোপন করতে হচেছ সম্পূরক সেচ দিয়ে। বাকি জমিগুলোও যদি সম্পূরক সেচ দিয়ে আবাদ করতে হয় তাহলে কৃষকের বাড়তি খরচ হবে ১০০ কোটি টাকার ওপরে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কৃষি বিভাগ লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করে সম্পূরক সেচ দিয়ে আমন রোপণের পরামর্শ দিচ্ছেন।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, জুলাই(আষাড়) মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা ৪৫৩ মিলিমিটার। এর মধ্যে ২০ জুলাইয়ের আগেই প্রায় ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা।বিভাগে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১৯ দশমিক চার মিলিমিটার। এর মধ্যে ১৭ মিলিমিটার হয়েছে ২ জুলাই এবং ২ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে ২০ জুলাই। তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কাছাকাছি হওয়া, বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়ার কারণে এ অবস্থা। ১৯ জুলাইয়ের পর থেকে এ বিভাগে কাংক্ষিত বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু এলাকায় গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিপাত হয়েছে যা সামান্য।
চলতি বছর জুন মাসে ৩২৭ দশমিক ১ মিলিমিটার, জুলাই মাসে শনিবার (২৩ জুলাই) পর্যন্ত ২৬৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে । আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে জুন মাস ৪৩৭ এবং জুলাই মাসে ৪৫৭ মিলিমিটার স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা।জুলাই মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩২ থেকে ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠানামা করে। কিন্তু গত ২০ দিনে রংপুর বিভাগের জেলা গুলোতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২২ থেকে ২২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকার কথা।এই সময়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ২৭ থেকে ২৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলিসিয়াস। এ অবস্থা সাধারণত তিন থেকে চার দিন থাকার কথা থাকলেও টানা জুলাই মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত চলছে তাপমাত্রার অবস্থা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমন রোপন, আউশ ও পাটচাষিদের উপরে।রংপুর আবহাওয়া অফিসে রেকর্ড অনুযায়ী বছর ২০২১ সালে জুলাই মাসে ১৯৬ মিলিমিটার, ২০২০ সালে ৮০৪ মিলিমিটার, ২০১৪ সালে ৩০৪ মিলিমিটার, ২০১৩ সালে ৪৪৬ মিলিমিটার, ২০১২ সালে ৫১০ মিলিমিটার, ২০১১ সালে ৩৪৬ মিলিমিটার, ২০০৯ সালে ২৮১ মিলিমিটার এবং ২০০৮ সালে ৯১০ মিলিমিটার বৃষ্টি পাত রেকর্ড করা হয়েছিল।রংপুর আবহাওয়া অফিসের দেয়া তথ্যমতে এবার জুলাই মাসে এ পর্যন্ত যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে তা আমনের চারা জমিতে রোপণ ও স্থায়িত্বের জন্য চাহিদার তুলনায় দশমিক ৫২ শতাংশ।
রংপুরের পরিবেশবিদ, চাষি ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আমন ধান রোপন করা কৃষকদের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত এবং বৃষ্টি ভিত্তিক আমন মৌসুম হিসেবে পরিচিত। কারণ আমনে বৃষ্টির পানি দিয়েই গোলায় ধান তোলেন কৃষক। সে পরিস্থিতি এবার নেই রংপুর বিভাগে। আবহাওয়ার প্রকৃতি বিগত ১০ বছরের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত।খোদ কৃষি বিভাগ আমন চাষের লক্ষ্য মাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন।
রংপুর বিভাগের আট জেলার কৃষি জোন হলো রংপুর ও দিনাজপুর। দুই টি কৃষি জোনের আওতায় এবার আমন রোপনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় নয় লাখ হেক্টর জমি।এ পরিমাণ জমিতে আমন রোপণের জন্য এপ্রি-মে মাসের মধ্যেই বীজতলা তৈরির পর মধ্যজুন থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে আমনের চারা রোপণের সঠিক সময়। এরপর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আমন রোপণ করা গেলেও ধানের ফলন কম হওয়ার পাশাপাশি পোকা-মাকড়ের উপদ্রব বেশি হয়। এ দুটি জোনের কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী এ পর্যন্ত মাত্র ২৫ হাজার হেক্টরের কিছু বেশি জমিতে আমনের আবাদ করেছেন চাষিরা। কৃষকদের আমন চারা রোপন করতে হয়েছে সম্পূরক সেচ দিয়ে। এতে বাড়তি খরচ করতে হয়েছে চাষিদের।
রংপুর কৃষি জোনের উপ-পরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেছেন, আমাদের শঙ্কা ছিল এবার জুলাই মাসে খরা হবে ভয়াবহ। সে কারণে আমরা চাষিদের সেচ নালা গুলো ঠিক রাখতে বলেছিলাম। সে অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে আমাদের কর্মীরা কাজ করেছেন। এতে বাড়তি খরচ হলেও কৃষকরা সেই চেষ্টা করছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আমন চাষিরা বীজতলা তৈরি করলেও পানির অভাবে কৃষক জমিতে আমনের চারা রোপণ করতে পারছে না। আবার তৈরি করা বীজতলার বয়স হয়ে যাচ্ছে। অনেক বীজতলা পানির অভাবে হলুদ হয়ে গেছে। সামান্য যেসব জায়গায় সম্পূরক সেচ দিয়ে আমনের চারা লাগিয়েছেন কৃষক, তাও পানির অভাবে মরে যাচ্ছে, রোদে পুড়ছে আমন রোপনের ক্ষেত। অনেক কৃষক জমিতে হাল-চাষ দিয়ে রেখেছেন, পানির অভাবে চারা লাগাতে পারছেন না।অনেক জমিতে এখনো জমিতে হাল চাষই দিতে পারেননি। সামর্থ্যবান কিছু কৃষক স্যালো ও বিদ্যু চালিত মোটর দিয়ে আমন লাগানো শুরু করলেও তারা খরচে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। অপর দিকে প্রান্তিক, বরগা, বন্দকী ও ক্ষুদ্র চাষিরা এখনো চেয়ে আছেন আকাশের পানে সৃষ্টি কর্তার পানে তাকিয়ে আছেন।
রংপুরের কাউনিয়ার বালাপাড়া ইউনিয়নের বেতানি বিলে বিলে শ্রাবণ মাসে পানি শুকিয়ে এবার রেকর্ড ভেঙে খরতাপে খাঁ খাঁ করছে। এখানকার কৃষক আঃ সালাম (৭৫) জানালেন, আমরা আরো কয়েকদিন বৃষ্টির অপেক্ষায় আছি না হলে সেচ দিয়ে আমন চজারা রোপন করবো। তার পর পানি কিনে আমন রোপন করবো।শ্যালো বা মটারে পানি প্রতি ঘণ্টায় নিতে হয় ১৫০থেকে২০০ টাকা।রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীরের কৃষক কৃষ্ণ সরকার জানান, আমার নিজের স্যালো মেশিন আছে। চারদোন জমি লাগাবো। বৃষ্টি না থাকায় এখন খোরাকির ধান বিক্রি করে ১০ লিটার ডিজেল নিয়ে এসে সেচ দেয়া শুরু করেছি। এক লিটার ডিজেলের দাম ৭০ টাকা।
রংপুর অঞ্চলের কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী ৯ হাজার গভীর ও ৪ লাখ অগভীর নলকূপ আছে। বৃষ্টি না হলে সম্পূরক সেচ দিয়েই আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য সেচনালাগুলো নষ্ট না করার পরামর্শ দেয়েছিল কৃষকদের। এখন বৃষ্টি না হলে সম্পূরক সেচেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের আশা কৃষি বিভাগের। সেক্ষেত্রে প্রতি হেক্টরে জমিতে আমনের চারা রোপণ করা বাবদ গড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে। পুরো আবাদটিই যদি সম্পূরক সেচ দিয়ে করতে হয় তাহলে কৃষকের অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা বেশি খরচ হবে কৃষকদের।
এই বিভাগের আরও খবর