লালমনিরহাট বার্তা
কৃষ্ণের বংশপরিচয় ও জন্মবৃত্তান্ত
বার্তা অনলাইন ডেস্কঃ | ৩০ আগস্ট, ২০২১ ৩:০১ PM
কৃষ্ণের বংশপরিচয় ও জন্মবৃত্তান্ত
দ্বাপরযুগে শ্রীকৃষ্ণ অধর্মের বিপরীতে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য মথুরার রাজকন্যা দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মথুরা উত্তর ভারতের একটি প্রসিদ্ধ স্থান, আজও তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। কৃষ্ণ যেদিন জন্ম নিলেন, সেদিন ঘোর ঝড়জল—ভাদ্রমাসের রেবতীনক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি। এই পবিত্র জন্মক্ষণকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা কমপক্ষে সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে জন্মাষ্টমী হিসেবে উদ্যাপন করে আসছে। তখন আধুনিক ক্ষণগণনা কিংবা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তিত হয়নি, কিন্তু ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান ভারতীয়দের এতটাই বৃত্পত্তি ছিল যে, তারা নক্ষত্রের অবস্থান বিচার করে অভ্রান্ত ক্ষণগণনা করতে পারতেন। যেমন ধরুন, কৃষ্ণের জন্মক্ষণটির কথা। বলা হচ্ছে, ভাদ্রমাসের রেবতীনক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি, ভাদ্রমাসে রেবতীনক্ষত্র কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে বছর ঘুরে একবারই আসে। পলমাত্র এদিক-ওদিক হবার যো নেই। সেই হিসাবমতো নানা ঐতিহাসিক মাপকাঠি পর্যালোচনা করে বলা যায়, কৃষ্ণের জন্ম খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ সালে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় তিনি সত্তরোর্ধ্ব এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব।

তার পিতার নাম বসুদেব। সেজন্য তিনি বাসুদেব। কৃষ্ণ যদুবংশে জন্মগ্রহণ করেন। মহাভারতে পুরুরবা ঐতিহাসিক চন্দ্রবংশীয় রাজা। উর্বশীর সংসর্গে তার আয়ু নামে এক পুত্র জন্মে। আয়ুর পুত্র নহুষ। নহুষের পুত্র যযাতি। যযাতির পাঁচ পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ যদু, কনিষ্ঠ পুরু। যযাতির জ্যেষ্ঠ চার পুত্র তার আজ্ঞা পালন না করায় তিনি পুরুকে রাজ্যাভিষিক্ত করেন। এই পুরুর বংশে দুষ্মন্ত, ভরত, কুরু, অজমীঢ় প্রভৃতি ভূপতি জন্মগ্রহণ করেন। দুর্যোধন-যুধিষ্ঠির কৌরবেরা এই পুরুর বংশ এবং কৃষ্ণ প্রভৃতি যাদবেরা যদুর বংশ। যযাতিপুত্র যদু থেকে মথুরাবাসী যাদবদের উত্পত্তি, পুরাণেতিহাসে এমনই বলা হয়।

মহাভারত-পরবর্তী হরিবংশের হরিবংশপর্বে যে যদুবংশের কথা বলা হয়েছে, তা যযাতিপুত্র যদুরই বংশকথন। কিন্তু হরিবংশের বিষ্ণুপর্ব অনুসারে ইক্ষ্বাকুবংশীয় হর্যশ্ব ছিলেন অযোধ্যার রাজা। তিনি মধুবনের রাজা মধুর কন্যা মধুমতিকে বিয়ে করে কোনো কারণে মধুবনে বসতি করেন। এই মধুবনই মথুরা। এরই পুত্র যদু। যদুর পুত্র মাধব, মাধবের পুত্র সত্ত্বত, সত্ত্বতের পুত্র ভীম। মধুর পুত্র লবণকে রামের ভাই শত্রুঘ্ন পরাজিত করে তার রাজ্য দখল করে মথুরানগর নির্মাণ করেন। হরিবংশ বলছে, রাঘবেরা মথুরা ত্যাগ করলে ভীম তা পুনরায় অধিকার করেন এবং এই যদুর বংশই মথুরাবাসী যাদবগণ।

এ পর্যন্ত আমরা তিন জন যদুর কথা পেলাম—১. যযাতিপুত্র; ২. ইক্ষ্বাকুবংশীয় এবং ৩. অনার্য রাজা। কৃষ্ণ কোন যদুর বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তার মীমাংসা করা কঠিন। তবে, তাদের যখন মথুরা ছাড়া পাইনি এবং ঐ মথুরা ইক্ষ্বাকুবংশীয়দের নির্মিত, তখন যাদবেরা ইক্ষ্বাকুবংশীয় নন, এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। যে যদুবংশেই কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করুন না কেন, সেই বংশে মধু, সত্ত্বত, বৃষ্ণি, অন্ধক, কুকুর ও ভোজ প্রভৃতি রাজা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই বৃষ্ণি, অন্ধক, কুকুর ও ভোজবংশীয়রা একত্রে মথুরায় বাস করতেন। কৃষ্ণ বৃষ্ণিবংশীয়। কংস ও দেবকী ভোজবংশীয়। কংস ও দেবকীর এক পিতামহ।

কৃষ্ণের জন্ম

কংসের পিতা উগ্রসেন ছিলেন যাদবদের রাজা। তার রাজ্যের নাম মথুরা। কৃষ্ণের পিতা বসুদেব, মা দেবকী। কংস ছিলেন ভীষণ উচ্চাভিলাষী। ইতিমধ্যে তিনি পিতা উগ্রসেনকে সিংহাসনচ্যুত করে নিজেই রাজা হয়েছেন এবং ক্রমে অতিশয় দুরাচারী হয়ে উঠেছেন। তিনি যাদবদের ওপর এমন পীড়ন শুরু করেন যে, অনেকে ভয়ে মথুরা থেকে পালিয়ে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। বসুদেব তার আরেক পতœী রোহিণীকে যমুনা নদীর অপর তীরে অবস্থিত গোকুলনগরের ঘোষপল্লীতে নন্দ নামে এক গোপ ব্যবসায়ীর গৃহে রেখে এসেছিলেন। তিনি বসুদেবের আত্মীয়। সেখানে রোহিণী এক পুত্রসন্তান প্রসব করেন, সেই পুত্রের নাম বলরাম।
উত্পীড়কমাত্রই কাপুরুষ। কাজেই কংস ভেবেছিলেন, যাদব বংশের যে কোনো পুরুষ সন্তানই তার জন্য বিপদের কারণ। বিবাহের পর প্রীতিবশত বসুদেব ও দেবকীর রথচালনা করলেও কংস আশঙ্কা করেছিলেন, এদের গর্ভের সন্তানও তার জন্য একদিন বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সেজন্য তিনি তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করেন এবং কারাগারে জন্মগ্রহণকারী তাদের একের পর এক সন্তানকে কারাগার থেকে নিয়ে হত্যা করেন। এভাবে তাদের প্রথম ছয় সন্তানকে কংস হত্যা করলেন। সপ্তম গর্ভের সন্তান গর্ভেই বিনষ্ট হয়েছিল। দেবকীর অষ্টম গর্ভে শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হলেন। সেটি ছিল রোহিণী নক্ষত্রযুক্ত ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির রাত। সেদিন ঘোর ঝড়জলে দশদিক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। বসুদেব কংসের দ্বারা প্রাণসংশয় হতে পারে আশঙ্কা করে সদ্যোজাত পুত্রকে রাতের অন্ধকারেই সেই ঝড়জলের মধ্যে যমুনার অপরপারে নন্দের গৃহে রেখে এলেন। সদ্য সন্তান হারানো যশোদাও তাকে পেয়ে পুত্রবোধে লালন-পালন করতে লাগলেন। সেখানে কৃষ্ণ ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলেন।
বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে কৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমীকে ছুটি ঘোষণা করে সরকার কৃষ্ণের জন্মের ঐতিহাসিকতা স্বীকার করে নিয়েছেন, এটা কৃষ্ণপ্রেমীদের এক বড় অর্জন। এজন্য স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। (সুত্র: ইত্তেফাক)

লেখক : ট্রাস্টি, হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
এই বিভাগের আরও খবর