লালমনিরহাট বার্তা
শিশু শিক্ষার্থীদের সাথে ধোকাবাজী ও প্রতারণা চর ঢুশমারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃশ্যপট
বিশেষ প্রতিনিধি | ৯ নভেম্বর, ২০২১ ৭:৪৩ AM
শিশু শিক্ষার্থীদের সাথে ধোকাবাজী ও প্রতারণা চর ঢুশমারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃশ্যপট
গত ১ নভেম্বর তিস্তা নদী ভাঙ্গন কবলিত রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার চর ঢুশমারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে রোটারী ক্লাব অব লালমনিরহাট সেন্ট্রাল শিশুদের মাঝে শুকনা খাবার বিতরন ও মেডিকেল ক্যাম্প কার্যক্রমে অংশ নেয়ার জন্য গিয়েছিলাম।
সেনাবাহিনীর অবসর প্রাপ্ত সার্জেন্ট ও সমাজসেবী শামসুল আলম এই কার্যক্রমে স্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে রোটারিয়ানদের সহায়তা প্রদান করেন। তিনি তিস্তা ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত চর অঞ্চলের পুষ্টিহীন ও অসচ্ছল পরিবারের শিশুদের মাঝে শুকনা খাবার ( আপেল, কলা, ডিম, পাউরুটি, বিস্কুট) বিতরন ও মেডিকেল ক্যাম্পের জন্য চর ডুশমারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে স্থান নির্ধারন করেন।
মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা সুবিধার্থে প্রধান শিক্ষকের নিকট থেকে স্কুলের ক্লাস রুমের চাবী নিয়ে এসে স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় রুম পরিষ্কার ও ধোয়া মোছার ব্যবস্থা করা হয়।
আমরা ৭জন রোটারিয়ান ২ জন সে”্ছাসেবী, পল্লীচিকিৎসক ও ডিপ্লোমাধারী (ম্যাটস্).চিকিৎসকে নিয়ে সকাল ৭টায় লালমনিরহাট থেকে তিস্তা সড়ক ব্রীজের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে সকাল পৌনে ৮টায় পৌন্ছি সেখানে কিছুক্ষন অপেক্ষার পর নৌকা যোগে চর ডুশমারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। এ সময় আমাদের সাথে তিস্তা এলাকার নাট্যকর মাখন লাল দাস ,অবসর প্রাপ্ত সার্জেন্ট ও সমাজসেবী শামসুল আলম (যিনি মুক্তিযুদ্ধ কালীন পাকিস্তানে বন্দী ছিলেন), সমাজ সেবী মাসুম মিয়া ( মুক্তিযোদ্ধার সন্তান)। সহ কয়েকজন যুক্ত হন। নদী পার হয়ে কর্দমক্ত ছড়া অতিক্রম করে সকাল ৯- ১৫ মিনিটে স্কুলে পৌছে দেখতে পেলাম স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ক্লাসরুম পরিষ্কার ও পানি দিয়ে ধৌত করছেন।
কোদাল দিয়ে মাটি কেটে স্কুল প্রাঙ্গনে দিচ্ছেন। সে সময় স্কুলটিতে কোন শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী উপস্থিত নেই। সকাল সাড়ে ৯টায় স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরু ইসলামের নম্বার নিয়ে মোবাইল করলাম। ওনাকে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, স্কুলে কোন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নেই, আর আপনি কোথায় ? উনি বললেন, আমি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্যারের অফিসে আছি। উনি আমাকে কিছু দায়িত্ব দিবেন বলে ডেকে নিয়েছেন। শিক্ষকেরা আসবেন। নদী পাড় হয়ে শিক্ষকেরা আসেন। তাই একটু বিলম্ব হয়ে থাকে। আমি বললাম, শিশু শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারনা করছেন কেন? জনগনের ট্যাক্সের টাকায় বেতন নিবেন, স্কুলে আসবেন না তা হতে পারে না। উনি বিরক্ত হলেন বললেন এমন করে বলছেন কেন? অতপর কাউনিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের নম্বার সংগ্রহ করে তাকে মোবাইল করলাম। উনি বললেন, বন্যা সর্ব পরি .শিক্ষকেরা নদী পাড় হয়ে আসেন তাই বিলম্ব হয়। আমি বিষয়টি দেখছি ।
প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর সরকারের নির্দেশ মোতাবেক গত ১২ অক্টোবরে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলেছে। সে মোতাবেক উক্ত স্কুলটিতে প্রতিদিন (শুক্রবার ব্যতিত) পঞ্চম শ্রেনী খোলা থাকবে। অন্যান্য ক্লাস গুলো সপ্তাহে একদিন পর একদিন চালু থাকবে। সরজমিনে দেখে মনে হলে স্কুলটি সরকারী নির্দেশনা মোতাবেক খেলা হয়নি। ওখানে দেখার কেউ নেই। বলারও কেউ নেই।
চরাঞ্চলের মানুষগুলো এদিকে তিস্তা ভাঙ্গনে পযুদর্স্ত ও নাকাল, অপর দিকে পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। তারা সত্য, ন্যায় ও তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে চান না। কি জানি সরকার বিরোধী হয়ে যান। চরাঞ্চলগুলোতে কোন সামাজিক সংগঠিত শক্তি নেই সেই সাথে লোকগুলোরও আতœশক্তি নেই। এরা পতিবাদ করে নির্যাতন, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হতে চান না। এদের ট্যাক্সের টাকা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন ভাতা প্রদান করা হয় তাও জানেন না। নদী পার হয়ে আসবেন বন্যা হয়েছে (যদিও বা বন্যার পানি ২০ অক্টোবর নেমে গেছে) এরুপ কোন বক্তব্য সঠিক নয়। শিক্ষকদের বেতন, বোনাস, বাসা ভাড়াসহ আনুঙ্গিক সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়। তাছাড়াও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকেরা এককালীন অর্ধকোটি টাকার বেশি পেনশন পাবেন। তাদেরকে অবশ্যই সকাল ৯টায় বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত শিশুদেরকে লেখাপড়া শিক্ষা দিতে হবে। শিশুদের লেখাপড়া নিয়ে ধোকাবাজি ও প্রতারনা চলতে পারে না। গ্রামের অনেকে নারী পুরুষের অর্থাৎ শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সাথে কথা বলেছি। তারা উদ্বিগ,œ স্কুলের লেখাপড়ার অব্যবস্থা, উপবৃত্তি না পাওয়া, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি বিষয়ে বলে তারা কি নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হবেন? আত্মশক্তি, সামাজিক শক্তি গড়ে না উঠলে কিংবা বিকশিত না হলে দেশের মানুষের মুক্তি নেই।
১৯৬০ সালে ডুশমারা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯০ সালে স্কুলটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেলে অন্যত্রে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়।
আবারও ২০০৯ সালের ৭০ শতক জমির উপর দ্বিতল বিশিষ্ট স্কুলটি তিস্তা নদী ভাঙ্গনের মুখে পড়লে সরকারে. পক্ষ থেকে অকশন দেয়া হয়। প্রায় ৬ মাস ত্রিপল দিয়ে ঢেকে স্কুল চালু করা হয়। াতপর ২০১০ সালে ২০ শতক জমির উপর আবারও বর্তমানের এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এই চরে তিনশতাধিক পরিবারেরব বসবাস। তাদের সন্তানদের অনেকে স্কুলে আসে না। তাছাড়া ৪ কক্ষ বিশিষ্ট স্কুলটির একটি কক্ষে প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকেরা বসেনা। তিনটি কক্ষে ক্লাস চলে।
স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান স্কুলটিতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভর্ত্তি করা হয় না। একটু সাবলম্বী পরিবারের সন্তানেরা অন্যত্রে এবং অসচ্ছল পরিবারের সন্তানেরা মাদরাসা - মক্তবে আরবী পড়ে। স্কুলের সাবেক সহ- সভাপতি নজরুল ইসলাম জানান বর্তমানে দারিদ্র পীড়িত এই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০৫ জন। তম্মধ্যে উপবৃত্তি পাচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ জন।
দারিদ্র শিশুদের উপবৃত্তি প্রদানে শিক্ষকেরা সহযোগী করেন না বলে তিনি অভিযোগ করেন। শিক্ষার্থীর মাতা পিতা শিক্ষকদেরকে তাদের সন্তাদের .উপবৃত্তির বিষয়ে কথা বললে তারা সঠিক উত্তর পান না। স্কুল কমিটি সাবেক সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা সুরুজ্জামান।বর্তমানে তিনি নিজ বাসায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্কুলে কমিটি নেই। স্থানীয় ব্যক্তি তহির উদ্দিন জানান নিজেদের খেয়াল খুশি মতে শিক্ষকেরা স্কুলে আসেন। নিজেদের ইচ্ছায় চলে যান। শিক্ষকদের মধ্যে বিশেষ করে প্রধান শিক্ষকের আগমনের সময় ১১টায় চলে যাওয়ার সময় দুপুর ২টায় অধিকাংশ দিন তিনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অবস্থান করেন। অন্যান্য শিক্ষকদের অবস্থা তথইবচ ।
এলাকার হাবিবুর রহমান (৪৮) পিতা আব্দুল খালেক ফকির জানান প্রধান শিক্ষক সহ- অন্যান্য শিক্ষকদের স্কুলে যথা সময়ে উপস্থিত হওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বলেন যতদিন দল ক্ষমতায় থাকবে ততদিন এই ভাবে শিক্ষকেরা যাওয়া আসা করবে। আমির মন্ডল (৫২) পিতা মোফাজ্জল হোসেন মন্ডল জানান, .আমি স্কুলের শিক্ষকদের বলেছিলাম, স্কুলে বেল নাই কেন? তদ উত্তরে শিক্ষক বললেন তুমি মূর্খ লোক বেল দিয়ে কি করবে? স্কুলে বেল থাক না থাক তাতে তোমার কি!
শিশুর জন্য শুকনা খাবার বিতরনের সময় উপস্থিত চর ডুুশমারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় অধ্যায়নরত ৫ম শ্রেনীর ছাত্রী মোসলেম আক্তার পিতা মুকুল ইসলাম ও হালিমা বেগম পিতা হাবিবুর রহমানকে জিজ্ঞাসা করলাম তোমাদের স্কুলে ঠিক মতো ক্লাশ হয় কি না? তারা দুজনে বললেন, শিক্ষকেরা সময় মতো উপস্থিত থাকেন না, ক্লাসও ঠিক মতো হয় না। অতঃপর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি, তার ইংরেজী বলো, ২ জন ছাত্রী উত্তরে বললেন, আমরা বলতে পারবো না, আমরা শিখতে পারি নি। অর্থাৎ শিখিনি। হয়তো ভয় পেয়ে কিংবা শিখতে না পেয়ে উত্তর দেয়নি। আমাদের টিমের সাথে যাওয়ার রোটারিয়ানবৃন্দ বিষ্ময় প্রকাশ করলেন। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকের সংখ্যা ৪জন। তম্মধ্যে খুশি রানী বিপিইডি প্রশিক্ষণ, আসাদুজ্জামান ছুটিতে। রয়েছেন প্রধান শিক্ষক নূর ইসলাম ও সহকারি শিক্ষক মুকুল রহমান। এ ২ জনই ছিলেন অনুপস্থিত। কাউনিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে মোবাইল করার পর তারা অনেক পরে স্কুলে এসেছিলেন। শিক্ষার্থীনেই কাজেই ক্লাস ও নেই। অতপর সকাল ১০-৩০মিনিট গেঞ্জি পরিহিত প্রধান শিক্ষক নুর ইসলাম আসলেন। আমি বললাম, আপনি আপনার অফিসে বসে কাজ করেন। আমি স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বলি। তিনি চলে গেলেন, জানতে পেলাম ১১টায় শিক্ষক মুকুল মিয়া এসেছেন। ইতোমধ্যে রোটারিয়ান ১৪০জন শিশুর মাঝে শুকনা খাবার বিতরন ও ৪০ উর্দ্ধে বয়সী ৬০জনকে প্রাথমিক পরীক্ষান্তে ব্যবস্থা পত্র প্রদান সম্পন্ন করেছেন।
সকার ১১টায় আমরা লালমনিরহাট উদ্দেশ্যে ফিরছি। আবারও কাউনিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে মোবাইলে জানালাম স্কুলে .প্রধান শিক্ষক সাড়ে ১০টায় এসেছেন এবং একটু আগে ১জন শিক্ষক এসেছেন। কোন শিক্ষার্থীরা উপস্থিত নেই।
শিক্ষকেরা যাতে শিশুদের সাথে ধোকাবাজী ও প্রতারনা করতে না পারেন সে বিষয়ে তাকে তদারকী করার জন্য অনুরোধ করলাম। তিনি বললেন, আমি এক সপ্তাহ পূর্বে উক্ত স্কুলে পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। স্কুলে তালা লাগানো .কদমক্ত উঠান, ক্লাস রুমে স্তুপীকৃত ভাবে বেঞ্চ। অথচ তিনি স্কুল পরিদর্শন করছেন!
এই যদি হয় পরিদর্শনের অবস্থা তবে কি হবে শিশু শিক্ষার্থীদের। পরিশেষে পবিত্র কোর-আনের সুরা-আনফাল এর ৫৮ আয়াতে লেখা’’ নিশ্চয়ই আল্লাহ-ধোঁকাবাজ ও প্রতারককে পছন্দ করেন না’’।
এই বিভাগের আরও খবর