লালমনিরহাট বার্তা
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবিতে তিস্তা কনভেনশন উপলক্ষে সংবাদ-সম্মেলন
স্টাফ রিপোর্টারঃ | ১৩ মে, ২০২২ ১০:৫৫ AM
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবিতে তিস্তা কনভেনশন উপলক্ষে সংবাদ-সম্মেলন
তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের আয়োজনে রংপুরস্থ বর্ণসজ্জা প্রেস এর কার্যালয়ে আজ ১৩ মে সকাল ১০ টায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ ৬ দফা দাবিতে তিস্তা কনভেনশন উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী। এসময় সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান, স্ট্যাডিং কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদসহ স্ট্যাডিং কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনের সভাপতি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আমাদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আপনারা অবগত আছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ এক অবর্ণনীয় কষ্টের ভেতর দিয়ে দিনাতিপাত করছে। ভাঙনে, বন্যায় তাদের জীবন আজ বিপর্যস্ত। ইদানিং যুক্ত হয়েছে অসময়ের বন্যা। তিস্তাপাড়ের পাঁচ জেলায় অন্তত কোটি মানুষের জীবনে তিস্তা অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। আশীর্বাদরূপী তিস্তা আজ সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। এর প্রধানতম কারণই হলো এ নদীর কোনরূপ পরিচর্যা না করা। তিস্তার ভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ বাস্তুহীন হয়। তিস্তার বুকে যে বাদাম, কুমড়া, আলু, মরিচ, পিঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, ডাল, ধানসহ অনেক ধরনের ফসল চাষ হয় সেই ফসলও যে কৃষক ঘরে তুলতে পারবে এর কোন নিশ্চয়তা নেই।
সারাদেশে যখন গড় দারিদ্র্য কমে তখনও রংপুর বিভাগের গড় দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১১ সালের পরিসংখ্যানের চেয়ে ২০১৭ সালের সরকারি পরিসংখ্যান তাই বলে। শুধু তাই নয় সারাদেশে যখন গড় দারিদ্র্য ২০ শতাংশ, রংপুরের গড় দারিদ্র্য তখন ৪০ শতাংশের চেয়েও বেশি। নদীভাঙনের কারণে আজ দেশের ১০টি জেলার পাঁচটি জেলা রংপুরে বিভাগে। এর মধ্যে চারটি জেলার মানুষ তিস্তার ভাঙনের কারণে প্রত্যক্ষভাবে বেশি গরিব।

তিস্তা সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। আমরা দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা শুনে আসছি। আজ পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। অর্থ বরাদ্দ হয়নি। আর কয়েকদিন পরই ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপতি হবে। আমরা এ বছরের বাজেটেই তিস্তা সুরক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ চাই। বাংলাদেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী রংপুরে। তারপরও তাদের জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেই। রংপুরকে আরও পিছিয়ে রাখার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসসূচিতে মোট বরাদ্দের ১ শতাংশের চেয়ে কম বরাদ্দ দেওয়া হয় রংপুর বিভাগের জন্য। দেশে চলমান তিন লাখ কোটি টাকার মেগাপ্রকল্প চললেও রংপুর বিভাগের জন্য কোন মেগাপ্রকল্প নেই।
তিস্তা সুরক্ষায় সরকারিভাবে একটি সমীক্ষা হয়েছে। এতে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার কথা বলা হয়েছে। তিস্তা নদীর ভাঙন-বন্যায় প্রতিবছর যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তার পরিমাণ নিঃসন্দেহে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার বহুগুণ বেশি। ফলে তিস্তা সুরক্ষার জন্য এই সাড়ে আট হাজার কোট টাকা ব্যয় করে বিজ্ঞানসম্মতভাবে তিস্তার পরিচর্যা হলে প্রতিবছর ভাঙন ও বন্যা থেকে রক্ষা পাবে হাজার হাজার কোটি টাকা। রংপুরের সাথে সারাদেশের বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্যেও তিস্তা সুরক্ষার কোন বিকল্প নেই।
এজন্য আমরা ছয়দফা দাবিতে আন্দোলন করছি। ১৪ মে ২০২২ শনিবার বেলা ১১টায় আমরা লালমনিরহাটের তিস্তা বাজারের পাশে তিস্তা ডিগ্রি কলেজ মাঠে তিস্তা কনভেনশনের আয়োজন করেছি। এই কনভেনশনে তিস্তা তীরবর্তী ১২ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা অংশগ্রহণ করবে। আমাদের ছয় দফা হলোঃ
১। তিস্তা নদী সুরক্ষায় ‘মহাপরিকল্পনা’ দ্রুত বাস্তবায়ন। অভিন্ন নদী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন, তিস্তা নদীতে সারাবছর পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে জলাধার নির্মাণ করতে হবে।
২। তিস্তার ভাঙন, বন্যা ও খরায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হবে।
৩। ভাঙনের শিকার ভ‚মিহীন গৃহহীনদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
৪। তিস্তা নদী সুরক্ষায় বিজ্ঞানসম্মত খনন, মহাপরিকল্পনায় তিস্তা নদী ও তিস্তা তীরবর্তী কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষায় ‘কৃষক সমবায় এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পকলকারখানা’ গড়ে তুলতে হবে।
৫। তিস্তা নদীর শাখা-প্রশাখা ও উপ নদীগুলোর সঙ্গে পূর্বেকার সংযোগ স্থাপন এবং দখল-দূষণ মুক্ত করতে হবে। নৌ চলাচল পুনরায় চালু করতে হবে।
৬। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তা পাড়ের মানুষদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ
তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ এর উদ্যোগে ২০১৫ সালে আমরা রংপুর টাউন হল মাঠে কনভেশন করেছি। তিস্তার দুইপাড়ে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার মানববন্ধন করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত দীর্ঘ মানববন্ধন হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। তিস্তাপাড়ে স্তব্ধ কর্মসূচি পালন করেছি। তিস্তার দুই পাড়ের ১২টি উপজেলা এবং জেলায় জেলায় মানববন্ধন করেছি। তিস্তায় ক্ষতিগ্রস্ত জনপদে কয়েকশ জনসভা করেছি। তিস্তা রক্ষার দাবিতে লক্ষাধিক মানুষের স্বাক্ষর প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রেরণের কর্মসূচি পালন করেছি। এখন ১৪ মে ২০২২ তিস্তা কনভেশন করছি। আপনারা আমাদের প্রতিটি অনুষ্ঠানের খবর আপনাদের গণমাধ্যে পরিবেশন করেছেন। সেজন্য ধন্যবাদ জানাই।

সৃহৃদ সাংবাদিক বন্ধুগণ
আপনাদের কাছে আমাদের অনুরোধ তিস্তা কনভেনশনের সংবাদ আপনারা আপনাদের গণমাধ্যমে প্রতিবারের ন্যয় এবারও তুলে ধরুন। আপনাদের আন্তরিক সহায়তা আমাদের আন্দোলনকে ফলপ্রসূ করে তুলতে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করবে।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ এতক্ষণ ধৈর্য ধরে আমাদের কথা শোনার জন্য আপনাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।
শুভকামনা আপনাদের সবার জন্য।
এই বিভাগের আরও খবর