রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

কোচবিহারের স্বাধীনতা থেকে মুঘল আধিপত্য: ১৬১২ সালের সন্ধি, ১৬৮৭ সালের এবাদত খানের অভিযান এবং কাকিনা জমিদারির উত্থান


প্রকাশ : (১ ঘন্টা আগে)
কোচবিহারের স্বাধীনতা থেকে মুঘল আধিপত্য: ১৬১২ সালের সন্ধি, ১৬৮৭ সালের এবাদত খানের অভিযান এবং কাকিনা জমিদারির উত্থান

লালমনিরহাট জেলার ইতিহাস (তিন পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব)

প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি, কীভাবে বিশ্বসিংহ ও নরনারায়ণের নেতৃত্বে কোচ রাজ্য উত্তরবঙ্গের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল এবং বর্তমান লালমনিরহাট সেই রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার সামরিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না; রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উত্তরাধিকার, কূটনীতি এবং প্রতিবেশী শক্তির সঙ্গে সম্পর্কও তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কোচবিহারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

নরনারায়ণের মৃত্যুর পর: এক শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভাঙন

১৫৮৭ সালে মহারাজা নরনারায়ণের মৃত্যুর পর কোচ রাজ্যে উত্তরাধিকার প্রশ্নে বিভক্তি দেখা দেয়। রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধের ফলে বৃহৎ কোচ রাষ্ট্র দুটি অংশে বিভক্ত হয়—কোচবিহার এবং কোচ হাজো। এই বিভক্তি শুধু ভূখণ্ডের নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক শক্তিরও বিভাজন।

রাজ্য বিভক্ত হওয়ার পর পশ্চিম অংশে কোচবিহার রাজ্য টিকে থাকলেও পূর্বাঞ্চলের কোচ হাজো দ্রুত মুঘল ও আহোম শক্তির সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ফলে উত্তরবঙ্গের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে শুরু করে।

১৬১২: স্বাধীনতা থেকে করদ রাজ্যে

সপ্তদশ শতকের শুরুতে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার সুবাদার ইসলাম খান উত্তর-পূর্ব সীমান্তে মুঘল প্রভাব বিস্তারে উদ্যোগী হন। এই সময় কোচবিহারের মহারাজা লক্ষ্মীনারায়ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করে মুঘলদের সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নেন।

১৬১২ সালের সন্ধির মাধ্যমে কোচবিহার তার অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা বজায় রাখলেও মুঘল সম্রাটের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব স্বীকার করে। ইতিহাসের ভাষায় এটি ছিল Suzerainty—অর্থাৎ, কোচবিহার সম্পূর্ণ স্বাধীনও নয়, আবার মুঘল সাম্রাজ্যের সাধারণ প্রদেশও নয়। রাজা তাঁর সিংহাসন ধরে রাখেন, কিন্তু সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য ও নির্দিষ্ট আর্থিক দায়বদ্ধতা স্বীকার করেন।

এই পরিবর্তনের প্রভাব বর্তমান লালমনিরহাট অঞ্চলেও পড়তে শুরু করে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে মুঘল প্রশাসনিক ও সামরিক উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ে।

সীমান্তভূমির নতুন বাস্তবতা

বর্তমান লালমনিরহাট ছিল কোচবিহার ও মুঘল বাংলার মধ্যবর্তী সংযোগভূমি। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের নদীপথ ব্যবহার করে সৈন্য চলাচল, বাণিজ্য এবং রাজস্ব আদায় সহজ ছিল। ফলে এই অঞ্চল ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মুঘলরা বুঝতে পেরেছিল, উত্তরবঙ্গে স্থায়ী প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে হলে কেবল রাজধানী দখল করলেই হবে না; সীমান্তবর্তী পরগনাগুলোকেও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় ১৬৮৭ সালের ঘটনায়।

১৬৮৭: এবাদত খানের অভিযান

১৭শ শতকের শেষভাগে কোচবিহার আবারও রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। রাজপরিবারের দ্বন্দ্ব, ভুটানি প্রভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে ঘোড়াঘাটের মুঘল ফৌজদার এবাদত খান (Ibadat Khan) দক্ষিণ কোচবিহারের দিকে অগ্রসর হন।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, তাঁর অভিযানের ফলে কাকিনা, কারজিহাট, ফতেপুরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরগনায় মুঘল প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। কোচবিহারের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এই অভিযানের পর বর্তমান লালমনিরহাট অঞ্চলের রাজনৈতিক চরিত্র পাল্টে যেতে শুরু করে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—১৬৮৭ সালের পরই পুরো বর্তমান লালমনিরহাট একযোগে মুঘল প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়—এমন দাবি ইতিহাস সমর্থন করে না। বরং বহু বছর ধরে এই অঞ্চল ছিল কোচবিহার ও মুঘল প্রভাবের সীমান্তভূমি, যেখানে বিভিন্ন পরগনায় নিয়ন্ত্রণের মাত্রা ভিন্ন ছিল।

কাকিনা জমিদারির উত্থান

মুঘল শাসনের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে রাজস্ব প্রশাসন পরিচালনা করা। এই নীতির অংশ হিসেবে কাকিনা অঞ্চলে একটি শক্তিশালী জমিদার পরিবারের উত্থান ঘটে।

পরবর্তীকালে এই পরিবারের সদস্যরা 'রাজা' উপাধিতে পরিচিত হলেও তাঁদের অবস্থান কোচবিহারের মহারাজার সমতুল্য ছিল না। তাঁরা ছিলেন মুঘল সরকারের স্বীকৃত জমিদার; পরে ব্রিটিশ শাসনামলেও একই কাঠামো বজায় থাকে।

এই পার্থক্যটি ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ 'রাজা' শব্দটি সামাজিক মর্যাদা নির্দেশ করতে পারে, কিন্তু তা সবসময় সার্বভৌম রাজনৈতিক ক্ষমতার সমার্থক নয়।

লালমনিরহাটের ইতিহাসে এই পর্বের তাৎপর্য

১৬১২ থেকে ১৬৮৭—এই প্রায় পঁচাত্তর বছর লালমনিরহাটের ইতিহাসে এক রূপান্তরের যুগ। এই সময়ে অঞ্চলটি স্বাধীন কোচ রাষ্ট্রের অংশ থেকে ধীরে ধীরে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রভাববলয়ে প্রবেশ করে। প্রশাসন, রাজস্ব ব্যবস্থা, জমিদারি কাঠামো এবং সীমান্ত রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই নতুন বাস্তবতার সূচনা হয়।

এই রূপান্তরের ফলই পরবর্তী ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি তৈরি করে। কারণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উত্তরবঙ্গে যে প্রশাসনিক কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, তার অনেকটাই মুঘল আমলে গড়ে ওঠা রাজস্ব ও জমিদারি ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তাই ১৬৮৭ সালের এবাদত খানের অভিযানকে শুধু একটি সামরিক অভিযান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আজও লালমনিরহাটের ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

লেখক: সিনিয়র সহকারী পরিচালক,  বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

বিজ্ঞাপন