রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) কমিশনার মাহবুবুর রশীদ বলেছেন, চার খুনের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আলামত বিশ্লেষণ করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।চার খুনের ঘটনায় তদন্তে আসা নানা প্রশ্নের জবাব পেশাদারিত্বের সাথে খুঁজছে পুলিশ। তদন্তে উঠা সকল প্রশ্নের সাক্ষ্য প্রমাণ ও যথাযথ জবাব খোঁজা হচ্ছে। এদিকে সনাতন ধর্মলাম্বীরা মানববন্ধন সমাবেশে বলেছেন,যে দুটি ছেলেকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের দেখে বিশ্বাস হয় না, তারা চারজনকে হত্যা করেছে। এদের সাথে রাঘব-বোয়ালরা জড়িত থাকতে পারে। অপরদিকে নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পরিবারকে হত্যার ঘটনার প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। তাদের অনুসন্ধানে ঘটনার পর পুলিশি ব্যাখ্যার সঙ্গে নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে কিছু প্রশ্ন ও অসংগতি সামনে এসেছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে নগরীর মাছুয়াপাড়ার গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পরিদর্শন শেষে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের নবাগত কমিশনার মাহবুবুর রশীদ সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। পরিদর্শনকালে তিনি বাড়ির বিভিন্ন কক্ষ, ছাদসহ হত্যাকান্ডের ঘটনাস্থল ও আশপাশ পরিদর্শন করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নরেশ চাকমা, উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক জিন্নাত আলীসহ পুলিশ সদস্যরা।
নবাগত পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রশীদ বলেন, তদন্ত একটি চলমান প্রক্রিয়া। তদন্তের ধারাবাহিকতায় অনেক প্রশ্ন আসবে। সেই প্রশ্নগুলো পেশাদারিত্বের সাথে জবাব খোঁজা আমাদের দায়িত্ব। সেই কাজ আমরা করছি। আমি মামলা সম্পর্কে এখনই বেশি কিছু বলতে পারবো না। আমি ঘটনাস্থলে বুঝতে এসেছি। পুলিশ কমিশনার বলেন, এই মামলাটি চাঞ্চল্যকর। এ মামলা নিয়ে সারাদেশে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। প্রতিটি কথাবার্তার সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ ও যথাযথ জবাব খোঁজা হচ্ছে। মামলাটি সঠিক পর্যায়ে নিয়ে আদালতে চার্জশীট দাখিল করা হবে। যেন সুবিচার হয়, আমরা সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এদিকে বিকেলে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্য হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন-সমাবেশ ঃ---শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে কর্মসূচীতে অংশ নেয়, রংপুর সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট, সনাতনী অধিকার আন্দোলন, ব্রাহ্মণ সংসদ রংপুর জেলা ও মহানগর, হিন্দু যুব জোট ও মহাজোটের নেতৃবৃন্দরা। এতে বক্তব্য রাখেন, মানিক চৌধুরী জয়, প্রদীপ কান্তি, ফিজুর দাসসহ অন্যরা।
বক্তারা বলেন, গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে নিমর্মভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দাসহ দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী করছি। সেই সাথে এ হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ সুষ্ঠুভাবে মামলার তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে।যে দুটি ছেলেকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের দেখে বিশ্বাস হয় না, তারা চারজনকে হত্যা করেছে। এদের সাথে রাঘব-বোয়ালরা জড়িত থাকতে পারে। তদন্তকারীদের সুক্ষভাবে তদন্ত করে সেই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
নবাগত পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রশীদ বলেন, আমি এখানে ঘটনাস্থল দেখতে এসেছি। এই ঘটনা এবং মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের ধারাবাহিকতা চলমান রয়েছে। তদন্তের ধারাবাহিকতায় অনেক প্রশ্ন আসবে, সে প্রশ্নগুলোর পেশাদারিত্বের সাথে জবাব খুঁজে বের করাই আমাদের দায়িত্ব। আমরা সেই কাজগুলো করছি।
এ সময় তিনি বলেন, চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এই মামলা নিয়ে সারাদেশে নানান রকম কথাবার্তা হচ্ছে। প্রতিটি কথাবার্তার সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে যথাযথ জবাবদিহির মাধ্যমে মামলাটিকে সঠিক পর্যায়ে নিয়ে আদালতে চার্জশিট দাখিল করাই আমাদের লক্ষ্য। যাতে সুবিচার নিশ্চিত হয়।
আসামি সিদ্ধার্থ দাসের পরিবারের অভিযোগ শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদ পানি দিয়ে ধুয়ে আলামত নষ্ট করেছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশ কমিশনার বলেন, আমিও আপনাদের মত শুনেছি। আমি রংপুরে গতকাল যোগদান করেছি। আলামত আসলে ধুয়ে ফেলার কিছু নেই। এটা ক্রাইমসিন, সেটাকে সংগ্রহ করা আছে।এ ধরনের ঘটনায় কোনো ধরনের গাফিলতির সুযোগ নেই। তদন্ত কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। নতুন কোন ক্লু আসলে জানাবেন আমরা তদন্ত করব। এটা পুলিশের কাজ তবে সবার কাছ থেকে আমাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।মাদক শুধু রংপুরের সমস্যা নয় এটা দেশের সমস্যা। এই মুহূর্তে এটা সামাজিক সমস্যা। আমি আজ সকালে আমার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেছি, কথা বলেছি এবং তাদেরকে সময় দিয়েছি। আশা করছি এক সপ্তাহের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখতে পারবেন।
রংপুর নগরীতে একই পরিবারের চারজনের হত্যাকান্ডের ঘটনায় এরই মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যে নতুন পুলিশ কমিশনারের ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পরিবারকে হত্যার ঘটনার প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। তাদের অনুসন্ধানে ঘটনার পর পুলিশি ব্যাখ্যার সঙ্গে নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে কিছু প্রশ্ন ও অসংগতি সামনে এসেছে।ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এবং হত্যাকান্ডের সম্ভাব্য কারণ ও ঘটনাক্রম সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ব্যাখ্যা দেয়। সেই ব্যাখা ও ঘটনার প্রেক্ষাপটে আসকের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ২৪ ও ২৫ আগস্ট রংপুরে সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান করেন।প্রতিনিধি দল নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশ, থানা কর্তৃপক্ষ, মর্গ ও হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি বলে জানায় সংস্থাটি।বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পরিবারকে হত্যার ঘটনায় আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা হয়েছে।
আসকের প্রতিনিধি দলের কাছে হত্যা মামলা তদন্তের অগ্রগতি ও ডিবির বক্তব্য ঃ-রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলেন আসকের প্রতিনিধি দল। তিনি বলেন, ঘটনার বিভিন্ন দিক ও আলামত যাচাই করা হচ্ছে। হত্যাকান্ড নিয়ে বাইরে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশের ব্যাখ্যায় বাড়ির বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি সম্ভাব্য সিসিটিভি ক্যামেরায় উপস্থিতি ধরা পড়ার আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত বলে জানানো হয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়।তবে বিদ্যুৎসংযোগ কেন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, কখন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, কে বা কারা তা করেছিলেন এবং এর সঙ্গে সিসিটিভি বা হত্যাকান্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না এসব বিষয়ও বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযুক্তদের পরিবারের বক্তব্যঃ---সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস তার ছেলের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ ও প্রশ্নের কথা আসক প্রতিনিধিদের জানান। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং পুলিশে নেওয়ার সময় তার ছেলের পোশাকসহ কিছু বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসের মা সেনা রানী দাসও তার ছেলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলে জানান এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেন।
অন্যদিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার আরেক তরুণ সীমান্ত চন্দ্র দাসের বাবা-মায়ের সঙ্গেও সংস্থাটির প্রতিনিধি দল কথা বলে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত ঘটনার রাতে বাড়িতে ছিলেন এবং সে রাতে সিদ্ধার্থ দাস কিছু সময়ের জন্য তাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তবে তিনি সেখানে রাতযাপন করেননি বলে তারা জানান। এসব বক্তব্যও তদন্তের সময় অন্যান্য তথ্য ও আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মর্গ ও ময়না তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্যঃ
সংস্থাটির প্রতিনিধি দল মর্গের ইনচার্জ সাহেব আলী এবং ময়না তদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডোম যতন কুমারের সঙ্গে কথা বলে। যতন কুমারের বক্তব্য অনুযায়ী, মরদেহগুলো পচনশীল অবস্থায় ছিল। তিনি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখেননি বলে জানান, তবে শরীরের কিছু অংশে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে তার মনে হয়েছে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মর্গের কর্মীর পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক মতামত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন, যৌন সহিংসতার কোনো আলামত ছিল কি না এবং হত্যাকান্ডের পদ্ধতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তের জন্য ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক পরীক্ষা ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনই অধিকতর নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।
প্রসঙ্গত; শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে ফোন করেছিলেন পূজা চক্রবর্তী। বোনের ফোন বন্ধ পেয়ে একে একে বোনের স্বামী, তাদের মেয়ে এবং ছেলেকে ফোন করেন। সবারই ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়ায় (দাসপাড়া) বোনের বাসার সামনে গিয়ে গেটে ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে পুলিশকে বিষয়টি অবগত করে।স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে বাসায় গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় রোববার ভোরে একই এলাকা থেকে কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) আটক করা হয়। ওই দিন বিকেলে নিহত চারজনের মরদেহের ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য হয়।রোববার বিকেলে নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওইদিন রাতে আসামিরা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তাদের দুইজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।বর্তমানে আলোচিত এ মামলাটির তদন্তভার কোতয়ালী থানা থেকে বদল করে গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) দেওয়া হয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ওসি জিনাত আলী এ মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা।