১৯৭৬ সাল আষাঢ় মাসের শেষ, শ্রাবণের শুরু ঠিক এমনি একটি সময়ে ন্যাপ ভাসানীর মহাসচিব আমার প্রিয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া হঠাৎ টাঙ্গাইলে আমার ভাড়া বাসায় হাজির সঙ্গে তার দেহরক্ষী ঢাকার আলিম সিরাজগঞ্জে ফারাক্কার উপর অনুষ্ঠিতব্য সেমিনার, আমি সেই সেমিনারে একজন বক্তা। আমাকে দ্রুত প্রস্তুত হতে বলে চলে গেলেন যাদু ভাই সন্তোষে হুজুর ভাসানীর সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। আমি প্রস্তুত, রাত্রিযাপন করতে হবে সিরাজগঞ্জে। হঠাৎ যাদু ভাই ফিরে এসে বললেন মোহন তুই প্রস্তুত? আমি অবাক। এত দ্রুত ফিরে আসার কারনে। যাদু ভাইকে জিজ্ঞেস করাতে উত্তরে বললেন হুজুর ঘুমাচ্ছেন, শরীরটা ভালো নেই, চল সিরাজগঞ্জ থেকে ফেরার পথে হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করব।
যাদু ভাইয়ের প্রাইভেট কারে ভুঞাপুর পৌঁছলাম, সেখান থেকে নৌপথে সিরাজগঞ্জ। সামান্য বিশ্রামের পর শুরু হল সেমিনার। সেমিনার শেষে দলীয় নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক আলোচনা শেষে রাত হয়ে গেল। সিরাজগঞ্জে রাত্রি যাপন করে পরের দিন সকালে লঞ্চ যোগে রওনা করলাম চারাবাড়ি ঘাটে, উদ্দেশ্য হুজুর ভাসানীর সাক্ষাৎ
লঞ্চের দিতলে বসে যাদু ভাই, আমি ও আলিম। তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যাদু ভাই তার অভিজ্ঞতালব্ধ ও তীক্ষণ দুরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রজ্ঞা দিয়ে আলোচনায় মগ্ন।
আমরা দুইজন শ্রোতা। আলোচনায় আগামী দিনে সরকার গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন। এবং আলোচনায় সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা গঠনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে মন্ত্রিসভায় কে কে থাকতে পারে তার একটা ধারণাও তিনি ব্যক্ত করলেন। সাড়ে ১১ টা ১২:০০ টা নাগাদ চারাবাড়ি ঘাটে পৌঁছে গেলাম। ওখান থেকে ঘোড়াগাড়ি সহযোগে সন্তোষ হুজুরের হুজরাখানার সামনে হাজির হলাম। হুজুররা খানার সামনে আসতেই টাঙ্গাইল জেলা ন্যাপ সভাপতি আব্দুর রহমান সাহেবের সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি হুজরাখানার বাইরে পায়চারি করছেন আর স্টার সিগারেট টানছেন। যাদু ভাই কে দেখে রহমান ভাই হচকিত হলেন। আমি রহমান ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম বাইরে কেন? হুজুর কি করছেন? উত্তরে রহমান ভাই বললেন হুজুরের শরীরটা ভালো না তন্দ্রাচ্ছন্ন
অবস্থায় আছেন। আমি হুজরাখানায় প্রবেশ করে তাল পাতার পাখা দিয়ে হুজুরকে কিছুক্ষণ বাতাস করার পর হুজুর হঠাৎ চোখ মেলে তাকালেন।
জননেতা, মওলানা ভাসানীর অনুসারী
আমাকে জিজ্ঞেস করলেন মোহন তুমি? উত্তরে বললাম হুজুর যাদু ভাই এসেছেন, হুজুর আস্তে ধীরে বলে উঠলেন মশিউর আসছে? আমি বললাম জী হুজুর।
হুজুর সঙ্গে সঙ্গে বললেন মশিউর আসছে? মশিউরকে ডাকো, যাদু ভাই হুজুররাখানার ভিতরে ঢুকলেন সঙ্গে রহমান ভাই। যাদু ভাই বসলেন হুজুরের হুজরাখানায় রক্ষিত জলচৌকিতে, রহমান ভাই মাঝখানে দাঁড়িয়ে, আমি তালপাতা পাখা দিয়ে হুজুরকে বাতাস করছি।
যাদু ভাই হুজুরকে কুশলাদি বিনিময় করতেই হুজুর ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন মশিউর আমার শরীরটা ভালো নেই। আমি কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকার পিজিতে ভর্তি হব, সামনে আমার হুক্কল এবাদ* মিশনের সম্মেলন। এই সম্মেলনে আমি ফিরে আসতেও পারি নাও আসতে পারি।
হয়তো এটাই আমার শেষ যাত্রা। হুজুর আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন। কথাগুলো এখনো আমার কানে ভাসে। হুজরাখানার ভিতর থমথমে পরিবেশ হুজুরের চোখে পানি। হঠাৎ জলচৌকি থেকে যাদু ভাই মাওলানা ভাসানীকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মত কান্না শুরু করলেন, আমাদের চোখেও পানি। সে এক বিয়োগান্তক দৃশ্য, আমি তার সাক্ষী এখনো বেঁচে আছি। হুজুর আবেগভরা কণ্ঠে বলতে লাগলেন মশিউর সারা জীবন তোমরা
আমার সঙ্গে রাজনীতি করেছ, আমি যে তোমাদের কাউকে কিছু দিয়ে যেতে পারলাম না। তুমি যুবক বয়সে নিজ ক্ষমতায় নিজ যোগ্যতায় রংপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলে, নিজ যোগ্যতায় দুইবার পাকিস্তানের এমএনএ হয়েছিলে। সারা বাংলাদেশে অসংখ্য আমার কর্মী নেতারা ত্যাগ স্বীকার করে জেল জুলুম সহ্য করে নিঃস্ব হয়েছে, আমি তাদের কিছুই দিতে পারিনি।
হঠাৎ হুজুর ভাসানী বলে উঠলেন মশিউর তুমি এখন বাংলাদেশের সবচাইতে সিনিয়ার ও যোগ্য নেতা। তোমার সমসাময়িক আর কেউ নেই। আমি দোয়া করে যাচ্ছি তোমাদের জন্য! আমার মৃত্যুর পরপরই তোমরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় চলে যাবে! তবে এই ন্যাপ দিয়ে তা সম্ভব নয়!
সবাই মিলে একটি বড় দল করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন জিয়াউর রহমান ছেলেটা ভালো, সৎ, দেশপ্রেমিক পরিশ্রমী, ওর সঙ্গে মিলেমিশে একটা বড় দল গঠন করা।। তুমি হবা ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী। তবে তোমার কাছে আমার কিছু চাওয়ার নেই, শুধু আমার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়টাকে দেখবে। এটাই আমার একমাত্র চাওয়া!!
হুজরাখানার ভেতর শুরু হয়ে গেল আবারো কান্নার রোল, আবারো হুজুরের চোখে পানি। যাদু ভাই চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন হুজুর আপনি কি সত্যিই চলে যাচ্ছেন আমাদের রেখে? হুজুর কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। নিরব নিস্তব্ধ পরিবেশ। সকলের চোখেই পানি।
এর কয়েকদিন পর হুজুর চলে গেলেন পি জি হসপিটালে, ভর্তি হলেন। চিকিৎসা চলল। এর মধ্যেই সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান বীর উত্তম হসপিটালে হুজুরকে দেখতে এলেন। ভাসানী -জিয়ার একান্ত বৈঠক হয়ে গেল। সেই বৈঠকের বিষয়বস্তু আজও অজানা!!
কথোপকথন কিন্তু বিস্ময়করভাবে সত্য, ডাক্তারদের শত নিষেধ সত্বেও তা অগ্রাহ্য করে হসপিটাল থেকেই হুজুর ভাসানী ফারাক্কা লং মার্চের ঘোষণা দিলেন।
লংমার্চ শেষে আবার তিনি পিজি হসপিটাল এ ভর্তি হলেন। ঐ পিজি হসপিটালেই ১৯৭৬ সালের ১৭ ই নভেম্বর আফ্রো এশিয়া ল্যাটিন আমেরিকার গণ মানুষের নেতা, শত ইতিহাস রচনাকারী শত ইতিহাসের সাক্ষী মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী # সমগ্র দেশবাসীকে কাঁদিয়ে কৃষক শ্রমিক কামার কুমার জেলে তাঁতি মেহনতি মানুষের নেতা বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মহান এই নেতা বিদায় নিলেন এই পার্থিব জীবন থেকে
১৯৭৬ সনের ১৭ নভেম্বর মজলুম জননেতা মুকুটহীন সম্রাট হুজুর ভাসানী পার্থিব জীবন থেকে বিদায় নিলেন। আমি আগেই উল্লেখ করেছি হুজুর ভাসানী তাঁর মৃত্যুর আগে যাদু ভাইকে জিয়ার সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি বড় দল করার নির্দেশ প্রদানের কথা। এর পেছনে একটা কারণ ছিল।
জিয়াউর রহমান সেনা প্রধান থাকা অবস্থায় একাধিকবার সন্তোষে হুজুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এর মধ্যে দুইদিন আমি ন্তোষ উপস্থিত ছিলাম, কিন্তু ওনাদের মধ্যে কি আলোচনা হয়েছে সেটা আমি বলতে পারব না কারণ ওই সময় আমাকে ওখানে থাকতে দেওয়া হয়নি!
এরপর শুরু হয় যাদু ভাইয়ের হুজুর ভাসানীর নির্দেশিত পথে একটি বড় দল গঠনের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ঢাকার ডেফোডিল হোটেলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এবং সেখানে যাদু ভাইকে চেয়ারম্যান ও এস এ বারী এটি কে মহাসচিব করে ন্যাপ এর নতুন কমিটি গঠিত হয়। ওই কাউন্সিলে গঠিত কমিটির আমি সদস্য ছিলাম।
এরপর শুরু হয় জিয়া-যাদু বেঠকের পর বৈঠক! এর কিছুদিন বাদে ১৯৭৭সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে বিচারপতি সায়েম স্বাস্থ্যগত কারনে জেনারেল জিয়ার নিকট রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব অর্পণ করে অবসরে চলে যান।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর জিয়া জনগণের মতামত গ্রহণের নিমিত্তে ১৯৭৭সনের ৩০ মে দেশব্যাপী তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে হা-না ভোট করে বিপুল জনসমর্থন লাভকরেন। এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পর গঠন করেন মন্ত্রীর পদ মর্যাদায় একটি উপদেষ্টা পরিষদ।
এরপর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে যাদু ভাইয়ের উদ্যোগী ভূমিকায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় যাদু ভাইয়ের নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিচারপতি আব্দুস সাত্তার এর নেতৃত্বে জাগো দল, কাজী জাফরের নেতৃত্বে ইউনাইটেড পিপল্স পার্টি, শাহ্ আজিজের
নেতৃত্বে মুসলিম লীগ, মাওলানা মান্নানের নেতৃত্বে লেবার পার্টি ও রসরাজ মন্ডলের নেতৃত্বে তফসিলি সম্প্রদায় পার্টি নিয়ে গঠিত হয় ৬ দলীয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। এখানে বলে রাখা ভালো সেই ফ্রন্ট সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায়ও গঠিত হয়, তার মধ্যে টাঙ্গাইল জেলায় এই ফ্রন্ট এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম ন্যাপ সভাপতি আব্দুর রহমান এবং আমি হামিদুল হক মোহন।
এরপর মাওলানা ভাসানী নির্দেশিত, ন্যাপ চেয়ারম্যান ও ফ্রন্ট নেতা হিসেবে মশিউর রহমান যাদু মিয়া কর্তৃক প্রদেয় ধানের শীষ প্রতীক প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাতে তুলে দেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া সাদরে ধানের শীষ প্রতিক গ্রহণ করেন এবং ধানের শীষ প্রতিক নিয়েই দ্বিতীয়বার ৭৮ সনে ৩ জুন ৬ দলিয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট এর পক্ষে ঘোষিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে, জিয়া প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিচারপতি আব্দুস কে সাত্তার ভাইস প্রেসিডেন্ট, মশিউর রহমানকে সিনিয়ার মিনিষ্টার করে গঠন করেন ৪২ সদস্যের মন্ত্রী পরিষদ।
উল্লেখ্য ঐ মন্ত্রিসভা গঠনের আগ দিয়ে ইউনাইটেড পিপুলস পার্টির এক অংশ কে নিয়ে বেরিয়ে যান কাজী জাফর আহমেদ। ইউনাইটেড পিপলস পার্টির বাকি অংশ থেকে যায় ক্যাপ্টেন হালিমের নেতৃত্বে প্রেসিডেন্ট জিয়ার মন্ত্রিসভায়।
(বাকি অংশ প্রয়াত হামিদুল হক মোহন লেখা শেষ করতে পারেনননি, তিনি পরলোকগত হয়েছেন, আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি, লেখা টি সম্পূর্ন হলে হয়তো অনেক বিষয় জানার সুযোগ হত আমাদের )