রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ অন্যান্য

সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টা কেন ?


প্রকাশ :

রাজনীতি হলো এক ধরনের খেলা আর খেলোয়াড় হলেন রাজনীতিকরা। তারা জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ। ফলে তাদের খেলা হয় জটিল ও কুটিল। আর এই খেলার ঘুটি হলো জনগণ। এই ঘুটি ব্যবহার করে তারা একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে চান; বসতে চান সিংহাসনে। এ কারণে পাবলিক সেন্টিমেন্টকে পক্ষে নিতে তারা দোষারোপকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কুৎসা রটনা করতেও পিছ-পা হন না। কখনো কখনো তারা সাধারণ মানুষের আবেগ কাজে লাগান; জ্বালাময়ী বক্তৃতা করে মানুষকে উত্তেজিত করে তোলেন। তারা মানুষের আবেগকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যান যে তারা (জনগণ) জীবন দিতেও দ্বিধা করেন না। এর জ¦লন্ত উদাহরণ হলেন আবু সাঈদ, নূর হোসেন’রা। গত বছর শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যে প্রবল গণআন্দোলন গড়ে ওঠে; সেখানে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দেন রংপুরের আবু সাঈদ। ’৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ হটাও আন্দোলনে বুক পেতে দিয়েছিলেন যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন। 

মহান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বাংলার লাখো শহীদের রক্ত ঝড়েছে, শুধু তাই নয় এদেশে  ’৬৯, ৬৬, ৫২ সালেও এ দেশের বীর সন্তানরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। যুগে যুগে আবু সাঈদ-নূর হোসেনরা অকাতরে প্রাণ উৎসর্গ করে গেছেন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু তাদের সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে, তা আলোচনার দাবি রাখে। তবে তাদের প্রাণের বিনিময়ে এ দেশের অনেক রাজনীতিকের ভাগ্য বদলে গেছেন। কেউ মন্ত্রী হয়েছে, কেউ এমপি হয়েছেন, কেউ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাদের অনেকে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। বিলাসী জীবন-যাপন তো আছেই। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনও এর ব্যতিক্রম নয়। এই আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ। তাদের সিংহভাগ’ই তরুণ-শিক্ষার্থী। তাদের কথা মানুষ ভুলে যেতে বসেছে। কিন্তু তাদের প্রাণের বিনিময়ে রাজনীতিক (জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা) হয়ে উঠেছেন নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আব্দুল হান্নান মাসউদরা।

তারা নিজেদের তরুণ সমাজের প্রতিনিধি দাবি করছেন। সেই দাবি তারা করতেই পারেন। কিন্তু রাজনীতির নামে আমাদের দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার অধিকার হাসনাত আব্দুল্লাহ কোথায় পেলেন? সেনাবাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে বলে তিনি সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন। অতীতে এ ধরনের অভিযোগ কেউ করেননি। তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে ফেসবুকে যে পোস্ট দিয়েছেন, তা রীতিমত এই বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নর জন্য যথেষ্ট। হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে। এই পরিকল্পনা পুরোপুরি ভারতের। সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরীন শারমিন ও তাপসকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। ১১ মার্চ সেনানিবাসে হাসনাত আবদুল্লাহসহ দুজনের কাছে এমন একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের প্রস্তাব দেওয়া হয়, আসন সমঝোতার বিনিময়ে আমরা যেন এই প্রস্তাব মেনে নিই। আমাদের বলা হয়, ইতিমধ্যে একাধিক রাজনৈতিক দলকেও এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা শর্তসাপেক্ষে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনে রাজি হয়েছে। একটি বিরোধী দল থাকার চেয়ে একটি দুর্বল আওয়ামী লীগসহ একাধিক বিরোধী দল থাকা নাকি ভালো।’

সেনাবাহিনী অবশ্য এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। নেত্র নিউজকে সেনা সদর দপ্তর বলেছে, হাসনাত আব্দুল্লাহর পোস্ট সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্ট্যানবাজি বৈ অন্য কিছু নয়। ২৭ বছর বয়সী এই ছাত্রনেতার বক্তব্যকে ‘অত্যন্ত হাস্যকর ও অপরিপক্ক গল্পের সম্ভার’ হিসেবেও আখ্যা দিয়েছে সেনাবাহিনী। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং সারজিস আলম দীর্ঘদিন যাবৎ সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য ইচ্ছা পোষণ করছিলেন। পরবর্তীতে সারজিস আলম ১১ মার্চ ২০২৫ তারিখে সেনাপ্রধানের মিলিটারি অ্যাডভাইজরকে কল করে সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সময় চান। এর প্রেক্ষিতে মিলিটারি অ্যাডভাইজর তাদেরকে সেনাসদরে আসার জন্য বলেন। অতঃপর ১১ মার্চ দুপুরে সারজিস আলম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহ সেনাসদরে না এসে সরাসরি সেনাভবনে সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করেন। পরবর্তীতে সেনাপ্রধান অফিস কার্যক্রম শেষ করে সেনাভবনে এসে তাদের সঙ্গে দেখা করেন।’

হাসনাত আব্দুল্লাহর অভিযোগ সম্পর্কে কিছু কথা বলতেই হচ্ছে। সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান খাঁটি দেশপ্রেমিক, মানবিক মানুষ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যখন গণআন্দোলন শুরু হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অ্যাকশনে গেল; কিন্তু তখন সেনাবাহিনী অত্যন্ত ধৈর্য্যর সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে। এই বাহিনী একটা গুলিও ছোঁড়েনি। ট্যাংকের ওপর উঠে আন্দোলনকারীরা লাফালাফি করলেও সেনা সদস্যরা বিরক্ত হননি। তাদের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করেছেন তারা। সেনাবাহিনী অ্যাকশনে গেলে হয়তো রক্তের বন্যা বয়ে যেতো। লাশের সংখ্যা বেড়ে যেত বহু গুন। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দেশকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচিয়েছেনÑ এ কথা জোর গলায় বলা যায়। তিনি সরকারের পক্ষে জনগণের ওপর গুলি চালালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। সুতরাং তার ভূমিকা নিয়ে কোনও প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। তিনি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছেন না। রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রতি তার বিন্দুমাত্র লোভ নেই বলেই মনে হয়। লোভ থাকলে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হটিয়ে কিংবা তিনি ভারতে চলে যাওয়ার পর ক্ষমতা নিয়ে নিতেন। শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার পর তিনি ক্ষমতা নেবেনÑ এমনটাই দেশের অনেক মানুষ ভেবেছিলেন। রাজনীতিকরাও হয়তো এটাই ভেবেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা তিনি নেননি। বরং সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হ্যান্ডেল করেছেন তিনি। সেনাবাহিনী নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ রাজনীতি করছেন, তা বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স জানতে হয় না। কেবল সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্যই তিনি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তিনি যে স্ট্যানবাজি করছেন, তা উঠে এসেছে তার রাজনৈতিক সহকর্মী সারজিস আলমের ফেসবুক পোস্টেও। সারজিস আলম লিখেছেন, ‘সেদিন (১১ মার্চ) সেনানিবাসে আমাদের ডেকে নেওয়া হয়নি। যেভাবে এই কথাগুলো ফেসবুকে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এসেছে এই প্রক্রিয়াটি আমার সমীচীন মনে হয়নি বরং এর ফলে পরবর্তীতে যেকোনো স্টেকহোল্ডারের সাথে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আস্থার সংকটে পড়তে পারে।’ ‘মানুষ হিসেবে যেকোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তির অভিমতকে একেকজন একেকভাবে অবজার্ভ করে। হাসনাত সেদিন তার জায়গা থেকে যেভাবে সেনাপ্রধানের বক্তব্যকে অবজার্ভ ও রিসিভ করেছে এবং ফেসবুকে লিখেছে আমার সেক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিমত আছে। ‘আমার জায়গা থেকে আমি সেদিনের বক্তব্যকে সরাসরি “প্রস্তাব” দেয়ার আঙ্গিকে দেখিনা বরং “সরাসরি অভিমত প্রকাশের” মতো করে দেখি। “অভিমত প্রকাশ” এবং “প্রস্তাব দেওয়া“ দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যদিও পূর্বের তুলনায় সেদিন সেনাপ্রধান অনেকটা স্ট্রেইথ-ফরোয়ার্ড ভাষায় কথা বলছিলেন। পাশাপাশি “রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের” জন্য “চাপ দেওয়ার” যে বিষয়টি এসেছে সেখানে “চাপ দেওয়া হয়েছে” এমনটি আমার মনে হয়নি। বরং রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ না আসলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সমস্যার সৃষ্টি হবে, সেটা তিনি অতি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছিলেন।’

এখানে লক্ষ্যণীয় যে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, তাদের ক্যান্টনমেন্টে ডেকে নেওয়া হয়েছে। আবার সারজিস আলম বলেছেন, তাদের ডেকে নেওয়া হয়নি। তারা নিজেরাই গেছেন। একই দাবি করেছে সেনা সদর দপ্তর। সুতরাং, হাসনাত আব্দুল্লাহর কথার মধ্যে ‘ডাল মে কুঁচকালা হ্যায়’ রয়েছে। আমাদের সেনাবাহিনীর অতীত সম্পর্কে কিছু কথা বলে লেখাটা শেষ করতে চাই। এটা সুশৃঙ্খল দেশপ্রেমিক বাহিনী। ১৯৭১ সালে যখন সেনাবাহিনী বাংলাদেশে (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) হত্যাযজ্ঞ চালাতে শুরু করে; তখন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা-সদস্যদের প্রাণ কেঁদে ওঠে। অনেকে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে দেশমাতৃকা রক্ষার জন্য পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। তাদের অনেকে শহীদ হন। জীবন দিয়ে তারা দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ দিয়ে গেছেন। দেশের ক্রান্তিকালে এই বাহিনী সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আজ সেই গৌরবের সেনাবাহিনীর ভাবমূতি কেন ক্ষুণ্ন করা হচ্ছেÑ সেই প্রশ্নের উত্তর একদিন দিতেই হবে। 

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি।