ভুমিকা : যাযাবর শব্দের অর্থ -ভ্রমণকারী, ভবঘুরে, নির্দিষ্ট বাসভূমি নাই ।মানুষ হল এমন সম্প্রদায় যারা খাদ্য প্রাপ্তির উপায় হিসাবে, পশুদের জন্য চারণভূমি খোঁজার বা জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসাবে একস্থান থেকে অন্যস্থানে চলে যায়। বেশিরভাগ মানুষ তার গোষ্ঠী বা নির্দিষ্ট বার্ষিক মৌসুমের অবস্থার উপর ভিত্তি করে বসতি অনুসরণ করে। এই কাজে মানুষ আগে নৌকা,পশু, বা পায়ে হেঁটে যাতায়াত করত গাড়ি জাহাজ কিংবা উড়োজাহাজ ব্যবহার করে থাকে।
যাযাবরের শ্রেণীবিন্যাস :
পৃথিবীতে মানুষের যাযাবর হওয়ার বিভিন্ন কারন থাকে তার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি উদ্দেশ্য আলোচনা করা হলো:-
প্রথমত খাদ্যের অন্বেষণে -মানুষ খাদ্যের প্রয়োজনে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। সাধারণত সমতল ভূমিতে ফসল ফলানোর উদ্দেশ্যে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা বা মরু এলাকা থেকে সমতল ভুমিতে মানুষ স্থানান্তরিত হয় ।
দ্বিতীয়ত পানির উৎস- নদী মানুষের জীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। নদীর মাধ্যমে পানির সংস্থান হয়। সেই কারনে নদীর তীর মানুষের বসত বাড়ি তৈরি করার জন্য একটি অন্যতম বিবেচ্য স্থান। শুরু থেকেই মানুষ নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসত করে।
তৃতীয়ত আবহাওয়া- সাধারণভাবে মানুষ
নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় বসবাস করতে পছন্দ করে।উষ্ণ এলাকায় যেমন মানুষ বাস করতে পারে না তেমনি ঠান্ডা এলাকায় ও মানুষ বসবাস করতে আরাম পায় না।সেই কারণে পৃথিবীর যে সমস্ত এলাকায় মৌসুমী বায়ু প্রবাহিত হয় সেই সমস্ত এলাকায় মানুষ বসবাস গড়ার চেষ্টা করে থাকে।
চতুর্থত কর্ম করার সুবিধা- মানুষকে যেহেতু কাজ করে খেতে হয়।সেজন্য মানুষের আয়ের জন্য অবশ্যই কর্মক্ষেত্র দরকার।কর্মক্ষেত্র যে এলাকায় বেশি থাকে বা কাজ করে আয় করার মত যে এলাকায় সুবিধা থাকে মানুষ সেই এলাকায় বসত করে। সেই এলাকায় স্থানান্তর হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা করতে থাকে ।বর্তমানে এই অবস্থাটি প্রবল বেগে চালু রয়েছে।
পঞ্চমত পশু চারণভূমি ভূমি- পৃথিবীর মরু অঞ্চল সমূহের মানুষের অন্যতম খাদ্য হলো প্রাণীর মাংস,দুধ এবং আয়ের উৎস হল চামড়া ও পশম। তাই পশুকে বেচে রাখার জন্য তৃণলতা চারণ ভূমি খুঁজে বের করতে হয় ।যে অঞ্চলে চারণ ভূমি বেশি সে অঞ্চলে মানুষ পশুপাখি নিয়ে বসবাস করার চেষ্টা করে থাকে।সে কারণে কারণ চারণভূমি এলাকায় মানুষ স্থানান্তর হয়ে থাকে।
ষষ্ঠত ধর্মীয় উদ্দেশ্যে- পৃথিবীর মানুষের বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ধর্মীয় উদ্দেশ্যে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। ধর্মপ্রচার ধর্মান্তরিত হওয়া অথবা ধর্মের কারণে নির্যাতিত হওয়া থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে মানুষ যাযাবর হয়ে থাকে।
যাযাবরের গল্প
আমাদের গ্রামের শফিকুল আগে যার বাড়ি ছিল তিস্তা নদীর মধ্যচর শৌলমারি গ্রামে। নদী ভাঙ্গন বন্যা আর অভাবে পড়ে কাজের সন্ধানে গেছেন বগুড়ার কাহালু উপজেলায়। সেখানে তখন ইরি ধানের চাষ হয়।তাই মঙ্গা মৌসুমী কাজের সন্ধানে সেখানে যায়। কিছুদিন পর সে জানতে পারে সেখান থেকে বেশি আয় ফেনী জেলায়। তাইতো সে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে ফেনীতে যায় রিক্সা চালাতে।একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু সেখানে। কিছুদিন পর সেই এলাকায় বিবাহ করে বসতবাড়ি গড়ে। সন্তান জন্ম দিয়ে সেখানেই স্কুলে লেখাপড়া করায় আর সে নিজে রিক্সা চালায় আর ভাটায় কাজ করে। সন্তান স্কুলে লেখাপড়া করে বড় হয়ে কাজের সন্ধানে চট্টগ্রাম পোর্টে যায়। সেখানে ভালো কাজ না পারলেও জাহাজ ভাঙ্গা কাঁজে যুক্ত হয়ে সেখানেই বসত করে। মাঝে মাঝে বাপের বাড়িতে আসে দাদার বাড়ীর কথা ভুলে যায়। চট্টগ্রামে শফিকুলের ছেলে বিয়ে করে জাহাজের এক নাবিকের মেয়েকে। নাবিক একদিন প্রস্তাব দিল তার জাহাজে করে যদি দুবাই শহরে যায় তাহলে হয়তো ভালো আয় করতে পারবে তাই সে একদিন শফিকুলের ছেলে মফিদুল জাহাজে করে নাবিক শ্বশুরের সঙ্গে দুবাই শহরে চলে যায়। দুবাই শহরের চাকচিক্যময় জীবন দেখে মফিদুল একদিন তার স্ত্রীকেও সেখানে নিয়ে যায় শশুরের সহায়তায়। মফিদুল এর বাবা শফিকুল এর সঙ্গে মাঝে মাঝে পত্র বিনিময়ে ছাড়া আর দেখা হয় না। কয়েক বছর পর পর দেশে ফিরে পিতার বাড়িতে তার বাবা মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফিরে যায় দাদার বাড়ি আসার সময় জোটে না। অবশেষে তার চাচা ফুফুদের কথা সে ভুলে যায়।তাদের কাউকে আর সে চেনেনা। মফিদুল যেকোনোভাবেই দুবাইয়ের নাগরিক হয়ে যায়। সেখানেই সে স্ত্রী পুত্র সন্তান নিয়ে বসতগারে। মফিদুলের সন্তান দুবাই শহরে লেখাপড়া করে।দুবাইয়ের ভাষায় কথা বলে।দাদা নানার সঙ্গে মাঝে মাঝে আরবি ভাষায় হাই হ্যালো করে।স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয় না। দুবাই থেকে একদিন লেখাপড়া শেখে ইউরোপের দেশগুলোতে শিক্ষা গ্রহণের জন্য অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। উচ্চশিক্ষা শেষে অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি গ্রহণ করে অস্ট্রেলিয়ার একজন মেয়েকে বিবাহ করে সেথায় বসত করে। মফিদুল তার ছেলেকে আদর করে এরাবিক নাম আল আব্বাস রেখেছিল। আল আব্বাস নাগরিকত্ব গ্রহণ করে সিডনি শহরের।শফিকুলের যেমন তার নাতিকে দেখা হয় নাই । তেমনি নাতিরও ছবি ছাড়া নানা আর দাদার চেহারা দেখা হয়নি। শুধু শুনেছে তারা বসত করে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে। মফিদুল তার ছেলেকে বড় করে ভবিষ্যৎ বড় হওয়ার আশায় তাকে পাঠিয়েছিল সিডনি শহরে।মফিদুলের আশাপূর্ণ হয়েছে বটে কিন্তু তারও ছেলে নাতিপুতিদের সঙ্গে বসবাস করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।আল আব্বাসের অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে বাংলাদেশের ফেনী আর চিটাগাং শহর দেখা হয়নি। শুধু শুনেছে সে বাংলাদেশী বংশভূত কোন এক ব্যক্তির জেনারেশন।
অপরদিকে পর্তুগালের নাগরিক পর্তুগিজরা ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসা করার জন্য মোঘল আমলে এসেছিল ভারত বর্ষে। ভারতে এসে ব্যবসার সুবাদে কত মানুষের সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটে। তার মধ্য থেকে টমাস ভারতেই বিয়ে করে ফেলে। টমাস ভারতবর্ষের কলিকাতা শহরে বসত করে। বিয়ে করেছে সুখ চ্যাটার্জির মেয়ে শান্তা চ্যাটার্জিকে। টমাস কলকাতায় মসলা কেনে পর্তুগালে পাঠায়। টমাস পর্তুগাল থেকে ভারতবর্ষে আসতে আগে পরে কত দেশ ঘুরেছে কত দেশে বসত করেছে কিন্তু অবশেষে এসে বিয়ে করেছে কলিকাতায়। টমাসের দুই ছেলে নাম মহেশ্বর চ্যাটার্জি আর ভরত চ্যাটার্জি। দুজনেই কলকাতা শহরে প্রাথমিক লেখাপড়া শেষে উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য জাহাজে করে ব্রিটিশ নাবিকদের সাথে চলে যায় ইংল্যান্ডে। সেখানে ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া শিখে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি নিয়ে বৃটেনেই বসবাস শুরু করে। টমাস তাদেরকে ব্রিটেনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য সার্বিক সহযোগিতা করে। মহেশ ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটিতে আর ভরত ক্যানাডায় সরকারের অধীনে চাকরি নেয়। দুই ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয় না অনেকদিন ।আর টমাসের সঙ্গে মাঝে মাঝে পত্র বিনিময়। সবাই নিজে সুখী আর তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাল থাকার আশায় শুধু সামনের দিকে তাকায়। পিছনে ফেরার সুযোগ কারো হয় না।
আমাদের শিক্ষক অশোক মাস্টার জন্ম তার সিরাজগঞ্জ শহরের কোন এক নদীর পাড়ে। লেখাপড়া শিখার আশায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে একদিন এসেছিল রংপুর শহরে। কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হয়ে বিএসসি পাস করে চাকরি নেয় তুষভান্ডার রমনী মোহন সরকারি স্কুলে বিএসসি শিক্ষক হিসেবে। চাকরি করার সুবাদে এলাকার লোকজনের ভালবাসা আর ছাত্র-ছাত্রীদের আদর আপ্যায়নে সম্মান পেয়ে স্কুলের পাশেই জমি কিনে বসত করে। এখানেই বিয়ে করে সংসার জীবন গঠন করে। যাওয়া হয়নি আর সিরাজগঞ্জ সদরে। বরঞ্চ সিরাজগঞ্জের সেই নদীর তীর থেকে তার বাকি ভাইদেরকে সাথে নিয়ে এসে এখানেই সংসার গড়ে। এখানেই তার ছেলে মেয়ে জন্ম নেয়। ছেলেরা লেখাপড়া শেষে বড় হয়ে আমেরিকায় চলে যায় উচ্চ শিক্ষা আর চাকরির ধান্দায়। তার দুই ছেলে অপু আর দিপু। অপু রংপুর শহরে বসবাস করে আর দিপু উচ্চ শিক্ষার জন্য চলে যায় আমেরিকায় থাকে ক্যালিফোর্নিয়ায়। আমাদের শিক্ষক অশোক সাহেব গ্রামে বসত করে। একদিন তিনি মারা গেলেন পিতার শবদেহের সৎকারে অপু রংপুর শহর থেকে আসতে পারলেও দিপু আমেরিকা থেকে আসতে পারেনি ।পিতার মৃত্যুর পর ভবিষ্যতে হয়তো তার দেশে কোনদিনও আসা হবে না।তার সন্তানেরা আমেরিকার নাগরিক হিসেবেই বড় হবে হয়তো।আমেরিকা থেকে নিউজিল্যান্ডের কোন এক শহরে বসত করবে।
আমাদের থানার মহির পুলিশ সবাই তাকে মোহির দারোগা বলে ডাকত। অতি বড় ভালো লোক ছিল।বাড়ি তার বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার কোন এক গ্রামে। আমাদের থানা থেকে অবসর নিয়ে থানার পাশে চার শতক জমি কিনে একটি আস্তানা গাড়ে। যেহেতু চাকরির সুবাদে ছেলেমেয়েরা থানার পাশেই স্কুলে লেখাপড়া করত।তাই এলাকাকে ভালবেসে সেখানে তিনি বসত গাড়ে। ভুলে যায় গ্রামের কথা, মৃত্যু হলে সেখানেই তার মাটি হয়ে যায়। ছেলেমেয়েরা পড়াশুনার সুবাদে থানার পাশে নতুন বাড়িতেই থাকে। অতঃপর বড় হয়ে এক ছেলে চাকরি নিয়ে ঢাকায় চলে যায় অবশেষে তিনি ঢাকাতেই স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ছেলেমেয়ে সহ সুখেই সেখানে বসবাস করে। অপর ছেলেরা পিতার কেনা বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলে বিক্রি করে সবাই ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় চলে যায় ।কেউ তার আগের জায়গা বগুড়ায় ফিরে যায়নি। নিশ্চয়ই মোহির দারোগার এই পরিবার দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে মাইগ্রেটের পরিবার।
মিস্টার মজুরী বাড়ি তার তুষভান্ডারে। স্কুলের ফার্স্ট বয় ছিল। কলেজেও বিভাগ স্ট্যান করেছিল।তাই স্কলারশিপ নিয়ে স্কটল্যান্ডে পড়াশোনা করতে যান। তারপর সেখানে চাকরি সেখানেই বিবাহ। ফিরে আসা হয়নি দেশে।অনেক দিন পর বাংলাদেশে সর্বশেষ গ্রাম দেখতে এসেছিল। জমি জামা যা আছে বিক্রি করে চলে গেছেন আর ফেরেনি। সন্তানেরা স্কটল্যান্ড থেকে কানাডায় গিয়ে বসবাস শুরু করেছে।
টনি মিয়া ১৯৭১ সালে রেড কোর্সের হয়ে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে ডাক্তার হিসেবে এসেছিলেন টাঙ্গাইল শহরে। রেট কোর্সের অপারেশন শেষ কিন্তু টনি মিয়ার ফিরে গেলেন না আমেরিকায়। তার স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে টাঙ্গাইলেই বসবাস শুরু করলেন । সেখানেই একটি হাসপাতাল তৈরি করে মানুষের সেবায় স্থায়ীভাবে আত্মনিয়োগ করেন। গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশে যায়। তার ফেরা হয়নি টাঙ্গাইল হতে।তার ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গ্রামের মানুষের সঙ্গে ৫০ বছর ধরে জীবন অতিবাহিত করছে ।তার মনের মধ্যে দেশে ফিরে যাওয়ার কোন আগ্রহ নেই।
আমাদের স্কুলের মৌলভী শিক্ষক আব্দুল বাতেন সাহেব চাকরি করার উদ্দেশ্যে নোয়াখালীর লক্ষীপুর থেকে লালমনিরহাটে এসেছিলেন। পরে এখানেই তার চাকরি বিবাহ সংসার বাড়ি ঘর তৈরি হয়ে গেল। মৃত্যু পর্যন্ত জন্মস্থান লক্ষ্মীপুরে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তার ছেলে ফয়জুর লালমনিরহাট থেকে এখন ঢাকার গাজীপুরে চাকরি নিয়ে সেখানেই সে বিবাহ সাদি করে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন।শুধু বছরে ১-২ বার গ্রামে আসে দেখতে। ভবিষ্যতে তার গ্রামের ফেরার আর কোন লক্ষণ নেই। অচিরেই হয়তো জমি জমা বিক্রি করে একেবারেই ঢাকা শহরে স্থানান্তরিত হবে।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক রহমান সাহেব। বড়ই সম্মানী লোক ছিলেন। জন্মস্থান ছিল তার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার দিনহাটা গ্রামে। লেখাপড়া সেখানেই শিখেছেন বড়ও হয়েছেন সেখানে। ভারত ভাগের সময়ে মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হয়ে একটা গ্রামে বসবাস শুরু করেন।কিছুদিন পর বসবাসের সুবাদে একটি উপশহরের কাছে স্কুলে চাকরি নেন।চাকুরী কালীন সময়ে তিনবার আবাসস্থল পরিবর্তন করে সর্বশেষ স্কুলের কাছে একটি জায়গা কিনে স্থায়ী বাড়ি তৈরি করে। সেখানেই ছেলেদের লেখাপড়া শেখায়।ছেলেরা বড় হয়ে চাকুরী নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়। কেউ ফিরে কেউ আর ফেরেনা গ্রামের সেই বাসায়। ইতিমধ্যে রহমান সাহেবের নাতি নাতনি জন্ম নেয়। তারাও বড় হয়ে একজন তুরস্কে একজন কানাডায় স্কলারশিপ নিয়ে চলে যায়।ভবিষ্যতের দেশে ফেরার কোন সম্ভাবনা নেই।
নাসরিন বাড়ী কালিগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডারের পাশের গ্রামে। লেখাপড়া আর কাজের সন্ধানে যোগাযোগ করেছিল স্কটল্যান্ড প্রবাসী এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। তিনি তার বাসার কাজের লোক হিসেবে ভিসা দিয়ে তাকে স্কটল্যান্ড নিয়ে যান। তারপর নাসরিনের সেখানে বিবাহ, সংসার, ব্যবসা শুরু ।এখন সেখানেই সে বড় ব্যবসায়ী। ছেলে মেয়েরা সেখানেই জন্ম নিয়েছে ।বাংলাদেশকে সে মাঝে মাঝে স্মরণ করে । অনেকদিন পর পর একবার আসে ।ছেলেমেয়েরা জীবনে একবার দুবার এসেছিল ভবিষ্যতে আসবে কিনা ঠিক নেই। তিনি এখন ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে সেখানেই অবস্থান করছে। কাজের সন্ধানে যাওয়া বাংলাদেশ থেকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসাবে নাসরিনের সেথায় বসবাস অবশ্যই যাযাবরের বৈশিষ্ট্যই পড়ে।
শামসুল ইসলাম জন্ম ভারতের আসামে।দেশভাগের সময় আসাম থেকে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে স্থানান্তর হয়। তিনি পেশায় একজন কামার। দীর্ঘদিন চরের মাটিতে তেমন কোন আয় রোজগার করতে না পেরে, সংসারের সবাইকে সাথে নিয়ে নৌকায় করে উজানে অজানা গন্তব্য পথে যাইতে থাকে।এক সময় রংপুরের কাজে পীরগাছায় তিস্তা নদীর চরে নৌকা ভিড়ে বসবাস শুরু করে। কাজের সুবিধা সেখানে সৃষ্টি হয়।সেই এলাকায়ই শামসুল কামার নামে পরিচিত লাভ করে এবং তার বংশ আজকে সেখানেই একটা গুষ্টিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
হেদায়েতুললাহ মৌলভী বাড়ী নোয়াখালীর সুবর্নচরে।সমুদ্রের লোনা জলের সংগে বসত তার।মাছ ধরা আর মাছ বিক্রয় করে জীবন সংগ্রামে লিপ্ত তার পিতা পিতামহ। সামান্য কিছুই ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করে পেটের সন্ধানে চলে আসে উজানের তিস্তা নদীর তীরবর্তী একটি গ্রামে। এলাকায় লজিং থেকে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে আরো কিছু লেখাপড়া শেখে। মাদ্রাসায় চাকরি নেওয়ার জন্য এলাকার এমপি সাহেবের তোষামোদকারী হিসেবে বেশ কিছুদিন নিয়োজিত থাকে। অবশেষে এমপি সাহেব স্থানীয় একটি মেয়ের সংগে বিয়ে দিয়ে তার নিজের গড়া একটি মাদ্রাসায় চাকরি প্রদান করে। মাদ্রাসার পাশেই একটি চালা পেতে জীবন সংসার শুরু করে ।আস্তে আস্তে আয় থেকে জমি কিনে বাড়ি বানায়, পুত্র কন্যা সংসারে জন্ম নেয়। সন্তানদের পাশে বিয়ে হয়ে যায়। মাওলানা সাহেব জন্মভূমির সেই গ্রামের কথা ভুলে যায়। এক সময় সে মাদ্রাসা এলাকায় মারা যায়। সেখানেই তার দাফন হয়।নোয়াখালীতে আর ফিরে যাওয়া হয়নি। এভাবেই হেদায়েতুল্লাহর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। পৈতৃক জন্মভূমির সন্ধান হয়তো পরবর্তী প্রজন্ম খোঁজে নেয় নাই।
মফজেল হোসেন জন্ম কালীগঞ্জ উপজেলার জামির বাড়ি নামে একটি গ্রামে। পেশায় ব্যবসায়ী। ব্রিটিশ আমলে তিনি ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে পণ্য ক্রয় করে এনে এলাকায় বিক্রি করতেন আবার কখনো এলাকার সস্তা দামের বিভিন্ন পণ্য ক্রয় করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে বেড়াতেন। ১৯৬৫ সালের দিকে দেশ বিভাগের প্রশ্ন আসলে ব্যবসায়িক সুবিধার স্থান বিবেচনা করে ভারতের জলপাইগুড়ি নামক জেলার ময়নাকুড়ি থানার কোন এক গ্রামে স্থায়ীভাবে বসত করে ।ভুলে যায় পৈতৃক বাড়ী আর ভাইবোনদের কথা।সেখানেই তিনি বাড়ী করে ব্যবসা করে এবং ছেলেমেয়েদের বিয়ে শাদি প্রদান করে। সেই সমাজের একজন অংশীদার হয়ে অবশিষ্ট জীবন কাটান। মৃত্যু পর্যন্ত জন্মের গ্রামে কখনো ফিরে আসেনি এবং পিতা পিতামহের কবরস্থানও তার দেখা হয়নি।
মকলেছার মিয়া জন্ম ময়মনসিং জেলার কোন এক গ্রামে। এলাকায় কাজের অভাব বাড়ি নদীতে ভেঙ্গে যাওয়ায় অভাবগ্রস্ত হয়ে শুধু পরনের কাপড়টুকু নিয়ে উজান দেশে লালমনিহাট জেলার কালিগঞ্জ উপজেলায় কাজ করতে আসে। কাজের এক পর্যায়ে অনেক দুঃসাহসে তিস্তা নদীর একটি চড়ে কাশবনের ভেতর একটি ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করে ।সাধারণ জনগণ সেই এলাকায় ভূতের ভয়ে কখনোই যেতে চাইতোনা।সেই জায়গায় সে ঘর তুলে বসত শুরু করে। একসময় বিয়ে করে সংসার গড়ায়। আস্তে আস্তে তার জন্মভূমি থেকে ভাই-বোনদেরকে এখানে নিয়ে আসে। এক পর্যায়ে একটি পাড়ায় রূপান্তরিত হয় অদ্যবধি সেই ভাড়াটি ভাটিয়া পাড়া নামে পরিচিত লাভ করেছে। ভাটি অঞ্চল থেকে উজানের অঞ্চলে এসেছে বলে সেই জায়গাটির নাম ভাটিয়াপাড়া। এভাবেই ময়মনসিংয়ের একটি গ্রাম থেকে একগাদা মানুষ লালমনিহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীর চরে একটি পাড়া অতঃপর একটি গ্রাম তৈরি করে ফেলেছে। সবাই অভাবের তাড়নায় কাজের সন্ধানে এই অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে জানা যায়।
রাজু সাহেব বাড়ি লালমনিরহাট জেলায়।জীবনের কোন একটা সময়ে লেখাপড়া করার উদ্দেশ্যে ঢাকা শহরে চলে যায়। লেখাপড়া শেষে ঢাকা শহর থেকে আয়ের ধান্দায় ইতালিতে চলে যায়। কয়েক বছর ইতালিতে চাকরি ব্যবসা করে সেখান থেকে ইউরোপে চলে যায়। ফ্রান্সে গিয়ে কাঁচামালের ব্যবসা শুরু করে। দীর্ঘদিন ফ্রান্সে থেকে তার অন্যান্য ভাইবোনদেরকে সেখানে নিয়ে যায়। একসময় ফ্রান্সে বাংলাদেশের মত একটি বসতবাড়ি তৈরি করে বসে। অনেকদিন পর এক ভাই সেখান থেকে মালয়েশিয়া ব্যবসা করা উদ্দেশ্যে চলে যায়।এক ভাই ঢাকায় ফিরে আসে। গুলশানে একটি বাড়ি করে ব্যবসা শুরু করে। এভাবেই নয় ভাই তাই নয়টি দেশে বসতি স্থাপন করে।তাদের সবারই মনে হয় এক একটি যাযাবরের জীবন। বাবা-মা শুধু একেক সময় একেক জায়গায় বেড়াতে যায়।
মিস্টার শাহিন কালিগঞ্জের বাসিন্দা। ছাত্র জীবনে ভালো লেখাপড়া করতে পারেনি। মাস্তানি করে জীবনের এক পর্যায়ে ব্যর্থ হয়ে হতাশায় ঘুরতে থাকে। হঠাৎ একদিন দেখা মিলল এক আদম বেপারীর সঙ্গে যেকোনোভাবেই হোক তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশ থেকে ভিসা ছাড়াই ইতালিতে চলে যায়। দালালের খপ্পরে পড়ে জীবন যায় যায় ভাব। তারপরেও কোন ভাবে অনেকদিন পরে বহু বন জঙ্গল নদী সাঁতরায়ে ইটালিতে পৌঁছে। গোপনে সেখানেই বসত শুরু করে ৩০ বছর হলো সেখানেই সে জীবন অতিবাহিত করছে।
আব্দুর রাজ্জাক মিয়া ছাত্র জীবনে ভালো লেখাপড়া করতে না পেরে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।রাজনীতির সুবাদে অনেকের সঙ্গে পরিচিত হয়ে একদিন এক আদম ব্যবসায়ীর হাত ধরে সেও বন জঙ্গল নদী নালা সমুদ্রপথে ইতালিতে পৌঁছে। কয়েক বছর সেখানে থেকে বিপদে পাড়ি দেয় কানাডায়। কানাডায় আজকে সে ৩০ বছর ধরে বসবাস করছে দেশে মাঝে মাঝে হাই-হ্যালো করতে আসে কিন্তু কানাডার সে বাসিন্দা হয়ে গেছে।
জন্ম কোথায় বসত কোথায় ? মৃত্যু হবে যে কোথায় কেউ পূর্ব থেকে অনুভব করতে পারতেছে না। শুধু সবাই সামনের দিকেই চলছে। পৃথিবীতে শুধু সামনে চলার জন্যই মানুষের সৃষ্টি।কেউ পেছনের দিকে তাকাইতে চাচ্ছে না।যারা জন্মভূমিতেই স্থায়ীভাবে থাকার চেষ্টা করছে তারা পৃথিবীতে সফলতা লাভ করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। (চলবে)
লেখক : মোহাম্মদ ইয়ার আলী, প্রোপাইটার, আলিবাবা থিম পার্ক