শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩
☰ সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

কিস্তির বেড়াজালে গ্রাম


প্রকাশ : (৭ ঘন্টা আগে)
কিস্তির বেড়াজালে গ্রাম

লাভলু মিয়া একজন মৌসুমী কৃষক। সে মৌসুমে মৌসুমে পেশা বদলায়। বর্ষাকালে রোয়া রোপন, ধান চাষ করে, শুকনো মৌসুমে আলু, ভুট্টা, তামাক ক্ষেতে কাজ করে আর অবসর সময়ে আশ্বিন কার্তিক মাসে ঢাকা শহরে রিক্সা চালায়। নিদ্রিষট পেশা হিসেবে তার জীবনে কোন কিছুই নাই। সময়ে অন্যের বাড়িতে কৃষিকাজ করে সময়ে ঢাকা শহরের রিকশাওয়ালা সাজে।

সংসার বলতে তার এক স্ত্রী, দুই সন্তান, বৃদ্ধ মা বিদ্যমান, দুইটি খড়ের ঘর আর একটি বকরি ছাগল। জমিজমা বলতে পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত পাঁচ শতাংশ জমির উপর তিন ভাইয়ের বাড়ি, যতটুকুই ভাগ পাওয়া যায় ঠিক ততটুকুই। বাড়ি থেকে রাস্তায় উঠার মত সরাসরি কোন পথ নেই। বংশের অন্য লোকের ঘরের আনাচে কানাচে দিয়ে রাস্তায় উঠতে হয়। বংশের অন্যান্য লোক বলতে তার জ্যাঠাতো ভাইয়ের বাড়ি অথবা দাদার অন্য বংশধরদের ঘরবাড়িকে বুঝায়।

গ্রামে সাধারণত একটি বংশ বা গোষ্ঠী একটি পাড়ায় ঘনীভূতভাবে বসবাস করে। যেহেতু তাদের জমি জমাগুলো সিএস সূত্রে প্রাপ্ত, তাই বংশ যত বড় হয় জমি তত বৃদ্ধি পায় না বিধায় সবাই ঘর তৈরির জায়গা পেলেই ধন্য মনে করে। রাস্তার তেমন দরকার হয় না। সবাই সবার ঘরের কোনাকানচি দিয়ে অথবা আঙ্গিনা দিয়ে চলাচল করে। এতে কারো কোন আপত্তি থাকে না।

গ্রামে অবশ্য একই বংশের একত্রে বসবাস করার পদ্ধতিকে পাড়া কিংবা টারি বলা হয়। যেমন মুন্সিটারি, আবুল টারি, হাজী টারি ইত্যাদি। প্রতি টারিতে প্রতিদিন খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে মহিলাদের মধ্যে ঝগড়া বাধে, বিশেষ করে ছাগল, মুরগি অথবা মানুষের বাচ্চা নিয়ে এই ঝগড়ার সূত্রপাত ঘটে থাকে। তারপরেও দিন শেষে বা মাস শেষে তারা গর্ব করে যে আমি অমুক টারির লোক, অমুক টারিতে বসবাস করি বা অমুক বংশের লোক। ঠিক তেমনি লাভলু ছাত্তার টারির লোক বটে।

লাভলুর হাত দুখানার উপর ভিত্তি করেই তার সংসার চলে। যতক্ষণ সে হাতে কাজ করতে পারে, পায়ে চলতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত সংসারে অভাব থাকে না। একসময় দৈনিক দশ টাকা হাজিরা আর আধা কেজি চাল নিয়েই মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতো, তখন তেমন কোন ঋন হতো না। সময়ের পরিক্রমায় এখন তার দৈনিক হাজিরা ৫০০/ টাকা, কিন্তু সংসারে অভাব লেগেই থাকে। দুই এক দিন শরীর অসুস্থতা থাকলে বা কাজ করতে না পারলেই তার ঋণের বোঝা বেড়ে যায়।

আগে দোকানে বাকি নিয়ে, বন্ধু-বান্ধবের কাছে ধার কর্য করে কিংবা পাড়া প্রতিবেশীর কাছে চাল, ডাল, তেল, লবণ ধার করে নিয়ে দুই চার দিন সংসার চলে যেত। এখন টারির মানুষের মধ্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, কেউ আর ধার দিতে চায় না, দোকানদার বাকি দিতে চায় না, বন্ধু-বান্ধব রাও বিনা সুদে ঋণ নিতে চায় না। নিরুপায় হয়ে লাভলু তার স্ত্রীকে পার্শ্ববর্তী এনজিওর সমিতিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করায়। এনজিও থেকে সাপ্তাহিক কিস্তিতে ঋণ গ্রহণ শুরু করে সংসারের ঘাটতি পূরণ করে।

অতঃপর সাপ্তাহিকভাবে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে থাকে। মাঝে মাঝে কিস্তি পরিশোধে অসুবিধা হলে কিস্তি অফিসারের গালিগালাজ ভয়ে পালিয়ে থাকতে হয়। একসঙ্গে চার বা পাঁচটি কিস্তি খেলাপি হলে কিস্তি অফিসারের পরামর্শের নতুন করে আরেকটি ঋন নিয়ে পুরাতন ঋন পরিশোধ করে। এভাবেই দিনের পর দিন ঋণের পরিমাণ ও কিস্তির পরিমাণ বাড়তে বাড়তে ঋনের বোঝা বেড়ে যায়, কিন্তু আয় আর বাড়ে না, বরং বয়সের কারনে কমে ফলে সে ঋন পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে পরে।

ঋণের কিস্তি তার জীবনের নৈমত্তিক অংশ হয়ে দাঁড়ায়। খাওয়ার জন্য চাল কেনার আগেই কিস্তির কথা ভাবতে হয়। এক সময় কিস্তি পরিশোধে অপারগ হয়ে পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে নিজের জীবনকে এই পৃথিবীতে অপাংতেয় মনে হতে থাকে। হতাশা আর অশান্তিতে জর্জরিত হয়ে পৃথিবী থেকে অকালে বিদায় নেওয়ার জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

ঋনের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ লাভলু অকালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তার পরিবারের উপর থেকে যায় ঋনের দায়ভার। কেউ এ বোঝা লাগবের জন্য এগিয়ে আসে না। এনজিওগুলো তাদের নিয়ম-নীতির বাইরে গেলে অফিসার পরিবর্তন করে, কিন্তু লোনের দায়ভার মাপ করে না।

অবশেষে লাভলুর পরিবার তার মৃত্যুর পর হঠাৎ একদিন নিখোঁজ হয়ে যায়। ঢাকা শহরে মানুষের বাড়িতে কাজ করার উদ্দেশ্যে লাভলুর স্ত্রী আর সন্তানেরা গার্মেন্টস এ কাজের উদ্দেশ্যে নিরুদ্দেশ হয়। অযত্ন অবহেলায় ভেঙ্গে পরে তাদের রেখে যাওয়া ঘর গুলো। তারপরেও কিস্তির অফিসাররা তার বাড়িতে নিয়মিত টহল দিতে থাকে কবে ফিরবে তাদের পরিবারের সদস্যরা। দেনার ভয়ে লাভলুর পরিবারের সদস্যদের আর কোন দিন গ্রামে ফেরা হয় না।

এভাবেই গ্রামের একটি পরিবার শহরে এসে বিলীন হয়ে যায়। শহরে জনবসতি বৃদ্ধি করে আর গ্রামে মানুষের বসতি হ্রাস করে চলেছে। হায়রে ঋনের কিস্তি, গ্রামের মানুষকে ছিন্নমূল করতে আর শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে তোমার বড়ই অবদান। জাতি ভবিষ্যতে তোমাকে স্বরন করতে বাধ্য হবে।

ধন্যবাদ।

লেখক: মুহাম্মদ ইয়ার আলী
স্বত্বাধিকারী
আলীবাবা থিম পার্ক

বিজ্ঞাপন