একজন শিক্ষক কত দূর পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সঙ্গে হাঁটেন? পাঠ্যবইয়ের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত, নাকি তারও অনেক পরে? মহেন্দ্র নাথ রায় স্যারের জীবন মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠ শেষ করা নয়। কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজলে শিক্ষার্থীরা বইখাতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে বসত। সামনে এসে দাঁড়াতেন মহেন্দ্র নাথ রায় স্যার। সেদিনের পাঠ হয়তো বাংলা, হয়তো গণিত কিংবা বিজ্ঞান। কিন্তু এই শিক্ষকের নিজের জীবনেও লেখা ছিল এমন কিছু অধ্যায়, যা কোনো একটি বিষয়ের বইয়ে ধরে না—ভাষার জন্য প্রতিবাদ, দেশের মুক্তির সংগ্রাম, গান, নাটক আর দীর্ঘ শিক্ষকতা।
তিস্তা ও ধরলা বিধৌত উত্তর জনপদের শ্যামল মাটির বুকে কিছু মানুষ জন্মান, যাঁরা নিছক জীবনযাপন করেন না—ইতিহাসের বুকে নিজের স্বাক্ষর এঁকে যান। ১৯৩৫ সালের ৮ জানুয়ারি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ ঘনেশ্যাম গ্রামে তাঁর জন্ম নেন মহেন্দ্র নাথ রায়। বাবা রমনী মোহন রায়, মা সুনীতি বালা রায়। মদনপুর বৈরাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করে তিনি ভর্তি হন তুষভান্ডার আর এম এম পি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর কারমাইকেল কলেজ থেকে আই,এ এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি,এ ডিগ্রি অর্জন করেন।
কলেজে পড়ার সময় তাঁর চারপাশে ভাষার দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠছিল। মহেন্দ্র নাথ রায় কেবল দূর থেকে সেই আন্দোলন দেখেননি; নিজেও তাতে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি কারমাইকেল কলেজের ছাত্র সংসদের সদস্য ছিলেন এবং রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সংগঠিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে রংপুরে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। দশ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান।
জেলের সেই দশ দিন তাঁর জীবনের একটি ঘটনা মাত্র ছিল না। মাতৃভাষায় কথা বলা ও শেখার অধিকার রক্ষায় মানুষ কতটা দৃঢ় হতে পারে, তার সাক্ষ্য হয়ে রইল দিনগুলো। পরে যখন তিনি শ্রেণিকক্ষে বাংলা পড়িয়েছেন, শিক্ষার্থীরা হয়তো সব সময় জানত না—তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন মানুষ, যিনি এই ভাষার দাবিতে কারাবরণ করেছিলেন।
প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় পারুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও দলগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৫৬ সালে ভাদাই গিরিজা শংকর উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগ দেন। এরপর ১৯৫৯ সালের ১৫ জুন কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলা শেষ হয় ২০০২ সালে অবসর গ্রহণের মধ্য দিয়ে।
এরই মধ্যে আসে ১৯৭১। ভাষার দাবিতে যিনি পথে নেমেছিলেন, দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তির সংগ্রামেও তিনি সক্রিয় অংশ নেন। তার প্রিয় স্কুলের খেলার মাঠটি ছিল একটি ঐতিহাসিক মাঠ, এ মাঠেই ততকালীন ছাত্র ও যুব সমাজকে সংগঠিত করেছিলেন মুক্তি সংগ্রামের জন্য, এখানেই অত্র এলাকার প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক করিম উদ্দিন আহমেদকে সার্বিক সহযোগিতা করেছিলেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি সমাজ ও দেশের প্রতি তাঁর এই দায়িত্ববোধ তাঁর জীবনকে এক বিশেষ মাত্রা দেয়। শিক্ষার্থীদের কাছে দেশপ্রেম তাঁর জন্য শুধু বলার বিষয় ছিল না; নিজের জীবনেও তিনি তার মূল্য বহন করেছেন।
মহেন্দ্র নাথ রায় স্যারকে যাঁরা চিনতেন, তাঁরা তাঁর জ্ঞানের বিস্তারের কথা বলেন। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান কিংবা ভূগোল—নানা বিষয়ে তাঁর দখল ছিল। কোনো শিক্ষার্থী একটি বিষয় বুঝতে না পারলে তিনি অন্যভাবে বোঝানোর পথ খুঁজতেন—এমন বহুমুখী জ্ঞান একজন শিক্ষকের বড় শক্তি। তিনি জানার আনন্দকে শিক্ষার্থীদের কাছেও পৌঁছে দিতে পারতেন।
স্কুলের বাইরেও তাঁর ছিল শিল্পের জগৎ। তিনি গান গাইতেন, তবলা বাজাতেন, নাটকে অভিনয় করতেন। লালমনিরহাটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘অন্বেষা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’র আজীবন সভাপতি ছিলেন। দিনের এক সময়ে যিনি বিদ্যালয় পরিচালনা করছেন, অন্য সময়ে তিনিই হয়তো গান বা নাটক নিয়ে মানুষের সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছিল জীবনের পরস্পর যুক্ত দুটি অংশ।
তাঁর কাজের স্বীকৃতিও এসেছে নানা জায়গা থেকে। তিনি লালমনিরহাট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সম্মান পান, জেলা জাদুঘর থেকে বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন। দৈনিক প্রথম আলো ও লালমনিরহাট বার্তা তাঁকে সংবর্ধনা দেয়। রোটারী ক্লাব অব ঢাকা থেকেও তৃণমূল পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা পান তিনি। পুরস্কারগুলো তাঁর কাজের সাক্ষ্য বহন করে; আর তাঁর শিক্ষার্থীদের স্মৃতি ধরে রেখেছে সেই কাজের মানুষের দিকটি।
২০০২ সালে বিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার পর তাঁর জীবন যেন আবার আগের প্রশ্নটিতেই ফিরে গেল: একজন শিক্ষক কত দিন শিক্ষক থাকেন? মহেন্দ্র নাথ রায় স্যার চর শৌলমারীর ‘নদী ও জীবন স্কুল’-এর প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। একটি বিদ্যালয়ের শেষ কর্মদিবস তাঁর শেখানোর ইচ্ছার শেষ দিন হয়ে ওঠেনি।
ঘরেও শিক্ষার সেই ধারার উপস্থিতি ছিল। তাঁর সহধর্মিণী আভা রানী রায়। তাঁদের চার সন্তান—নিরঞ্জন কুমার রায়, সুরঞ্জন কুমার রায়, মুকুল রানী রায় ও মিনতী রানী রায়—সকলেই শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। বাবার দীর্ঘ পথচলার পাশে পরের প্রজন্মের এই পেশা নির্বাচন যেন একটি নীরব উত্তর: শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা ঘর থেকেও ছড়িয়ে পড়ে।
২০১৬ সালের ১ অক্টোবর মহেন্দ্র নাথ রায় স্যার মৃত্যুবরণ করেন। তারপরও তাঁর গল্প শেষ হয়ে যায়নি। কোনো প্রাক্তন শিক্ষার্থী হয়তো এখনও তাঁর পড়ানো একটি বিষয় মনে করতে পারেন। কেউ মনে রেখেছেন তাঁর কণ্ঠ, কেউ তবলার তাল, কেউ ভাষা আন্দোলনে তাঁর অংশ নেওয়ার সাহস।
বিদ্যালয়ের ঘণ্টা প্রতিদিনের মতোই বাজে। নতুন শিক্ষক আসেন, নতুন শিক্ষার্থী আসে, পাঠও বদলায়। কিন্তু কিছু মানুষের জীবন শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়েও শিক্ষা দিয়ে যায়। মহেন্দ্র নাথ রায় স্যার ছিলেন তেমনই একজন মানুষ—যাঁর কাছে শেখানো ছিল পেশা, আর জ্ঞান, সংস্কৃতি ও দেশের প্রতি দায়িত্ব ছিল সেই পেশার গভীরতম অর্থ।
লেখক: খুরশীদুজ্জামান আহমেদ, কালিগঞ্জ কে ইউ পি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
লালমনিরহাট জেলা-শিল্প উন্নয়নে বাধা-২
১ দিন আগে
হারিয়ে যাচ্ছে পীরতন্ত্র
২ দিন আগে
চর নিয়ে দাঙ্গা - নিরসনের পথ
৪ দিন আগে