সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
☰ সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

তিস্তা মহাপরিকল্পনার আগেই জমি লিজ নয়- পুনর্বাসন, সরকারিভাবে কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা ও সমবায় কৃষি চায় তিস্তাপাড়ের মানুষ


প্রকাশ : (২ দিন আগে)
তিস্তা মহাপরিকল্পনার আগেই জমি লিজ নয়- পুনর্বাসন, সরকারিভাবে কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা ও সমবায় কৃষি চায় তিস্তাপাড়ের মানুষ

নদী সরে যায়, চর জাগে, কৃষক চাষ করে—তারপর সেই জমিই যদি কর্পোরেটের হাতে যায়, তিস্তাপাড়ের কৃষকের ভবিষ্যৎ কী?

তিস্তা শুধু একটি নদীর নাম নয়। তিস্তা মানে উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক প্রবাহমান বাস্তবতা। বর্ষায় তিস্তা যখন উন্মত্ত হয়ে ওঠে, তখন নদী তার দুই কূল ভাঙে, মানুষের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেয়, ফসলি জমি গ্রাস করে। আবার নদীর গতিপথ বদলে কোথাও চর জাগে, কোথাও নতুন জমি তৈরি হয়। সেই জমিতে বছরের পর বছর কৃষক ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলান। সেই ফসল দিয়েই চলে একটি পরিবার, একটি গ্রাম, কখনো একটি বৃহৎ জনপদের অর্থনীতি।

কিন্তু আজ তিস্তাপাড়ের মানুষের সামনে একটি নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই যদি সম্ভাব্য প্রকল্প এলাকায় জমি কর্পোরেট গোষ্ঠীর কাছে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় সেই জমির কী হবে? আর যে কৃষক বছরের ৮-৯ মাস সেখানে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁর কী হবে?

প্রশ্নটি কেবল জমির নয়। প্রশ্নটি একজন কৃষকের জীবন বাঁচানোর।

তিস্তার সঙ্গে কৃষকের অদ্ভুত সহাবস্থান

তিস্তাপাড়ের কৃষকের জীবন অন্য অনেক এলাকার কৃষকের মতো নয়। এখানে কৃষককে নদীর সঙ্গে প্রতিদিন সমঝোতা করে বাঁচতে হয়।

বর্ষার কয়েক মাস তিস্তা তার চরিত্র বদলায়। কখনো পানি বাড়ে, কখনো নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়, কখনো ভাঙন শুরু হয়। নদী কয়েক মাসের জন্য কোনো কোনো জমি ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কিন্তু নদী যখন কিছুটা শান্ত হয়, তখন সেই জমিতেই আবার কৃষক ফিরে আসেন। বালু সরিয়ে, মাটি তৈরি করে, শ্রম দিয়ে, ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা ফসল ফলান।

অর্থাৎ তিস্তাপাড়ের কৃষকের কাছে জমি শুধু একটি স্থাবর সম্পত্তি নয়—এটি তাঁর জীবিকার মৌসুমি ব্যাংক।

তিন-চার মাস নদী হয়তো সেই জমির ওপর তাণ্ডব চালায়; কিন্তু কৃষক বাকি ৮-৯ মাস সেই জমির ওপর নির্ভর করে সংসার চালান। সন্তানকে স্কুলে পাঠান, পরিবারের খাবার জোগান, কৃষিঋণ পরিশোধ করেন, গবাদিপশু পালন করেন।

তাই নদীর কারণে কোনো জমি কয়েক মাস অনিশ্চিত থাকলেই সেটিকে কৃষকের জীবিকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।

মহাপরিকল্পনার আগে জমি লিজ—এখানেই বড় প্রশ্ন

তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য যদি হয় নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ও ভাঙন নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, কৃষি উন্নয়ন, নৌ-যোগাযোগ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন—তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এর সম্ভাব্য ভূমি-এলাকা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে জমি অধিগ্রহণ ও সীমানা চিহ্নিতকরণসহ বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজের প্রয়োজনীয়তার রয়েছে।

এ অবস্থায় প্রকল্পের সম্ভাব্য এলাকার জমি যদি আগে থেকেই দীর্ঘমেয়াদে কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—আগে লিজ, না আগে মহাপরিকল্পনার ভূমি-সীমা নির্ধারণ?

আজ যে জমি বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য লিজ দেওয়া হচ্ছে, আগামীকাল যদি সেটিই প্রকল্পের বাঁধ, নদী প্রশস্তকরণ, জলাধার, সড়ক, পুনর্বাসন এলাকা, কৃষি অবকাঠামো বা অন্য কোনো প্রকল্পের কাজে প্রয়োজন হয়, তখন কী হবে?

তখন সরকারকে আবার সেই জমি উদ্ধার করতে হবে। লিজ বাতিল করতে হবে। ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। মামলা হতে পারে। বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে পারে। সময়ও পিছিয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ একটি সমন্বয়হীন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের একটি বৃহৎ জাতীয় প্রকল্পের জন্য অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করতে পারে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু প্রকল্প নয়—এটি ভবিষ্যৎ ভূমি ব্যবস্থাপনারও পরিকল্পনা।

তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে কেবল নদী খনন বা বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি যদি সত্যিই উত্তরাঞ্চলের পুনর্গঠনের পরিকল্পনা হয়, তাহলে এর সঙ্গে নদী, কৃষি, ভূমি, মানুষ, পরিবেশ এবং অর্থনীতিকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান নীতিমালার তালিকাতেও জাতীয় কৃষি বিপণন নীতি, উত্তম কৃষি চর্চা নীতিমালা এবং কৃষি সম্প্রসারণ নীতির মতো কৃষি-সম্পর্কিত নীতিমালা রয়েছে। অর্থাৎ কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের স্বার্থ রাষ্ট্রীয় নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে তিস্তাপাড়ে নদীর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা কৃষকের জমি ব্যবহারের প্রশ্নটিও বৃহত্তর জাতীয় কৃষিনীতি ও নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বিত হওয়া প্রয়োজন।

কর্পোরেট কৃষি কি কৃষকের বিকল্প?

কর্পোরেট বিনিয়োগ কৃষির জন্য সবসময় খারাপ—এমন কথা বলা হচ্ছে না। আধুনিক কৃষি, প্রযুক্তি, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনে বেসরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর জন্য ভুক্তভোগী তিস্তাবাসীর জমিকেই বেছে নিতে হবে কেন?

প্রশ্ন হচ্ছে—কর্পোরেট বিনিয়োগের জন্য কৃষকের জমিই কি প্রধান অবলম্বন হবে?

আর যদি হয়, তাহলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক কোথায় দাঁড়াবেন?

একজন বড় কোম্পানি জমি লিজ নিয়ে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু একজন কৃষক হয়তো নিজের জমিতে ধান, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, মরিচ কিংবা অন্য ফসল উৎপাদন করে নিজের পরিবারের খাদ্য নিশ্চিত করেন।

কোম্পানির কাছে জমি একটি উৎপাদন-উপকরণ।

কিন্তু কৃষকের কাছে জমি একই সঙ্গে উৎপাদন, খাদ্য, পরিবার, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থানও বটে।

এই পার্থক্যটি নীতিনির্ধারণের সময় ভুলে গেলে চলবে না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ভুক্তভোগী কৃষকের কী হবে?

ধরা যাক, একজন কৃষক তিস্তাপাড়ে ১০ একর জমি চাষ করেন। বর্ষায় তিন-চার মাস নদীর পানি বা ভাঙনের কারণে জমিটি ব্যবহার করতে পারেন না। কিন্তু নদী সরে গেলে তিনি আবার সেই জমিতে ফিরে আসেন এবং ৮-৯ মাস চাষ করেন। অনেক এলাকায় হাজার হাজার ঘরবাড়ি তৈরি করে বছরের পর বছর বসবাস করছে। ক্রয়কৃত বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমি থেকে কী তাদের উচ্ছেদ করে কর্পোরেট কোম্পানিকে লিজ দেয়া কোনো মানবিক পর্যায়ে পড়ে।

এখন যদি বলা হয়—এই জমি একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়া হয়েছে, তাহলে কৃষক কোথায় যাবেন?

তাঁকে কি বিকল্প জমি দেওয়া হবে?

তাঁর হারানো কৃষি-আয় কি হিসাব করা হবে?

তাঁর পরিবারের জীবিকা কি বিবেচনায় নেওয়া হবে?

৪০/৫০ বছর আগের ভূমি জরিপের সিদ্ধান্ত কী যথেষ্ট। শুধু জমির কাগজে মালিকানা আছে কি না—এই প্রশ্ন দিয়ে কি তাঁর ক্ষতি নির্ধারণ করা যাবে?

তিস্তাপাড়ের বাস্তবতা বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়।

নদীভাঙনের কারণে জমির রেকর্ড, দখল, পুনর্জাগরণ ও চাষাবাদের মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়। ‘সিকস্তি-পয়স্তি’ ব্যবস্থাপনা নিয়েও ভূমি প্রশাসনে আলাদা প্রক্রিয়া রয়েছে। সরকারি ভূমি-সংক্রান্ত নির্দেশনায় নদী পয়স্তি জমি চিহ্নিতকরণ, দিয়ারা জরিপ ও রেকর্ড হালনাগাদের বিষয়ও উল্লেখ আছে।

সুতরাং তিস্তাপাড়ের কৃষকের বাস্তব অধিকার নির্ধারণে শুধু কাগজের খতিয়ান নয়, বাস্তব দখল, চাষাবাদ, জীবিকা ও নদীর গতিপথের ইতিহাসও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

আগে ভূমি-মানচিত্র, পরে লিজ

এখানেই সরকারের কাছে একটি যৌক্তিক প্রস্তাব আসতে পারে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্য এলাকা নিয়ে আগে একটি সমন্বিত ভূমি-মানচিত্র তৈরি করা হোক।

কোন জমি প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন হতে পারে, কোন জমি নদীর গতিপথে, কোন জমি কৃষকের চাষাধীন, কোন জমি সরকারি, কোন জমি খাস, কোন জমি ভবিষ্যতে পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজন হতে পারে—সবকিছুর ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা দরকার।

তারপর সেই মানচিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে সর্বাগ্রে তিস্তা পাড়ের ভূমিহীনকে বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তিস্তা পাড়ের মানুষের দাবি যে খাস জমি উদ্ধার হবে সেগুলি সরকার নিজের কাছে রেখে সমবায় ভিত্তিতে আধুনিক কৃষি ও সরকারিভাবে কৃষিভিত্তিক কলকারখানা স্থাপন করতে হবে।

এতে একদিকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা কমবে অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সরকারি প্রকল্পও জটিলতায় পড়বে না।

 

উদ্ধারকৃত খাসজমিতে সরকারি উদ্যোগে বিনিয়োগ হোক পরিকল্পিতভাবে - এটিই চাচ্ছে তিস্তাপাড়ের কৃষক। কৃষককে প্রকল্পের বাধা নয়, অংশীদার করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিস্তাপাড়ের কৃষককে কখনোই মহাপরিকল্পনার ‘বাধা’ হিসেবে দেখা যাবে না।

তাঁরা এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশীজন।

কারণ যে কৃষক বছরের পর বছর তিস্তাকে মোকাবিলা করে জমিতে চাষ করেছেন, তারা নদীর চরিত্র জানেন। কোন জায়গায় কখন পানি আসে, কোথায় ভাঙন হয়, কোথায় চর জাগে, কোন জমিতে কোন ফসল ভালো হয়—এই বাস্তব জ্ঞান কোনো কাগজে পাওয়া যায় না।

তাঁদের জমি, চাষাবাদ, ক্ষতি ও সম্ভাব্য পুনর্বাসনের বিষয় নথিভুক্ত করতে হবে।

কৃষকের জন্য ‘জীবিকা ক্ষতিপূরণ’ ভাবতে হবে। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা দরকার। জমির ক্ষতিপূরণ আর জীবিকার ক্ষতিপূরণ এক বিষয় নয়।

একজন কৃষক জমি হারালে শুধু জমির মূল্য হারান না। তিনি হারান প্রতি বছরের ফসল, কৃষি-অভিজ্ঞতা, পারিবারিক খাদ্যনিরাপত্তা এবং নিজের একটি স্বনির্ভর জীবিকা।

তাই ভবিষ্যতে তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় জমি ব্যবহার বা অধিগ্রহণের প্রয়োজন হলে শুধু জমির বাজারমূল্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষক প্রকল্পের অংশীদার হওয়ার দাবি করছে ।

কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে লিজ নয়, সরকার সমবায় ভিত্তিতে কৃষিতে বিনিয়োগ করলে কৃষকের উৎপাদন অংশীদারিত্ব, শ্রমের নিশ্চয়তা এবং ফসল বিপণনের সুযোগ তৈরি হবে।

তাহলে এই বিনিয়োগ কৃষকের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—সহযোগী ও অংশীদারীত্ব।

কর্পোরেট কোম্পানিকে লিজ দেয়ার মত আজকের একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেন আগামী দিনের মহাপরিকল্পনাকে আটকে না দেয়।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে পানিসম্পদ মন্ত্রীও দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

এই অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ভূমি ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।

আজ যদি কোনো জমি এমনভাবে লিজ দেওয়া হয়, যা আগামী দিনের প্রকল্পের প্রয়োজনীয় জমির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে কাল সরকারকে একই জমি উদ্ধারে অর্থ, সময় ও প্রশাসনিক শক্তি ব্যয় করতে হতে পারে। কৃষকের সাথে সংঘর্ষের সৃষ্টি হবে।

এতে ক্ষতি হবে তিন পক্ষের—

রাষ্ট্রের,কৃষকের,এবং শেষ পর্যন্ত তিস্তা মহাপরিকল্পনার।

তাই এখনই একটি নীতি হওয়া দরকার—

‘তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্য ভূমি-সীমা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ভূমি লিজ নয়। এটি পরিকল্পনার আগে পরিকল্পনা না ভাঙার দাবি।

তিস্তার জমি তিস্তাপাড়ের মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। তিস্তার পানি যেমন শুধু নদীর পানি নয়, তেমনি তিস্তাপাড়ের জমিও শুধু মাটির একটি টুকরো নয়।

এই জমিতে কৃষকের ঘাম আছে।

কোনো জমিতে হয়তো বাবার হাতে রোপণ করা গাছের স্মৃতি আছে। কোনো জমিতে সন্তানের পড়াশোনার খরচ উঠেছে। কোনো জমি বিক্রি না করে কৃষক বছরের পর বছর সংসার চালিয়েছেন। নদী সেই জমি কেড়ে নিয়েছে, আবার নদী সরে গেলে কৃষক সেখানে ফিরে এসেছেন।

তাঁর জীবনে নদী যেমন শত্রু, তেমনি সেই নদীর পাড়ের জমিই তাঁর বেঁচে থাকার আশ্রয়।

তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা যদি সত্যিই মানুষের জন্য হয়, তাহলে সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে।

সমবায় কৃষি শুরু হোক। কৃষির আধুনিকায়ন হোক। উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি শক্তিশালী হোক। কিন্তু তার আগে নিশ্চিত করতে হবে—তিস্তাপাড়ের সেই কৃষক, যিনি নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে ৮-৯ মাস জমিতে চাষ করেন, তিনি যেন উন্নয়নের নামে নিজের জমি ও জীবিকা দুটোই না হারান।

শেষ কথা

তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুরু হওয়ার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—এই মহাপরিকল্পনার জমি কার?

রাষ্ট্রের? কর্পোরেটের? নাকি সেই কৃষকের, যিনি বছরের পর বছর তিস্তাকে মোকাবিলা করে সেখানে ফসল ফলিয়ে আসছেন?

উত্তরটি সহজ—জমির আইনগত মালিকানা যারই হোক, তিস্তা মহাপরিকল্পনার পরিকল্পনায় কৃষকের জীবিকা ও অধিকার অবশ্যই অগ্রাধিকার পেতে হবে।

কারণ তিস্তা মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য যদি হয় তিস্তাপাড়ের মানুষের দুর্দশা দূর করা, তাহলে এমন কোনো ভূমি-নীতি গ্রহণ করা যাবে না, যার ফলে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তিস্তাপাড়ের কৃষক নিজের জমিতে পরবাসী হয়ে যান। নদী সরে যায়, চর জাগে, কৃষক চাষ করে—তারপর সেই জমিই যদি কর্পোরেটের হাতে যায়, তিস্তাপাড়ের কৃষকের ভবিষ্যৎ কী? সবার আগে তিস্তাপাড়ের কৃষকের নিরাপত্তা।

আগে মহাপরিকল্পনার ভূমি-সীমা নির্ধারণ, তারপর দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ব্যবহার।

কারণ আজকের একটি ভুল লিজ চুক্তি যেন আগামী দিনের তিস্তা মহাপরিকল্পনার পথে নতুন জটিলতার বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়।

আর সবচেয়ে বড় কথা—তিস্তা বাঁচাতে গিয়ে যেন তিস্তাপাড়ের কৃষক হারিয়ে না যান।

সবশেষে আমরা চাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা যেন তিস্তা পাড়ের কৃষকের জন্যই হয়, কৃষককে উচ্ছেদ করে কর্পোরেট কোম্পানিকে সুযোগ করে দেয়ার জন্য নয়। তিস্তা বাঁচবে, কৃষক বাঁচবে তবেই সফল হবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা।

 

লেখক: শফিয়ার রহমানসা, সাধারণ সম্পাদক, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রংপুর জিলা স্কুল।

বিজ্ঞাপন