বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক শিক্ষক প্রভাত কুমার রায় স্যার


প্রকাশ : (১৩ ঘন্টা আগে)
মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক শিক্ষক প্রভাত কুমার রায় স্যার

জন্ম: ৩০ অক্টোবর ১৯৩৮ | মৃত্যু: ১২ নভেম্বর ২০০২
কিছু শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না-তাঁরা শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে এমন একটি জায়গা তৈরি করেন, যেখান থেকে তাঁদের কখনো অবসর হয় না। সময় চলে যায়, বিদ্যালয়ের ভবন বদলায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থী আসে-যায়; কিন্তু কোনো কোনো শিক্ষকের কণ্ঠস্বর, স্নেহমাখা মুখ আর শেখানোর ভঙ্গি থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে। প্রভাত কুমার রায় স্যার ছিলেন তেমনই একজন শিক্ষক।
১৯৩৮ সালের ৩০ অক্টোবর শ্রীখাতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রভাত কুমার রায়। তাঁর পিতা বিপিন চন্দ্র রায় এবং মাতা ব্রজবালা রায়। সহজ-সরল পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি পরবর্তী জীবনে শিক্ষকতাকেই বেছে নিয়েছিলেন তাঁর কর্ম ও সাধনার ক্ষেত্র হিসেবে।
১২ জুলাই ১৯৬৯-কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্মরণীয় একটি দিন। এদিন প্রভাত কুমার রায় স্যার মাত্র ১৮০ টাকা মাসিক বেতনে সহকারী শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। কিন্তু শিক্ষকতার মূল্য কি কখনো বেতনের অঙ্ক দিয়ে নির্ধারণ করা যায়? তাঁর প্রকৃত অর্জন ছিল শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। বিশেষ করে বাংলা বিষয়ে তাঁর ছিল অসাধারণ দক্ষতা। তাঁর কাছে বাংলা কেবল পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার একটি বিষয় ছিল না; ভাষার সৌন্দর্য, সাহিত্যের রস এবং মানুষের অনুভূতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম ছিল। তাঁর পাঠদানের স্মৃতি আজও সেই সময়ের শিক্ষার্থীদের কাছে নিশ্চয়ই একটি আলাদা আবেগের নাম।
প্রভাত কুমার রায় স্যারের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত তাঁর ব্যক্তিত্বে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, সহজ ও সরল প্রকৃতির মানুষ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল স্নেহের। তিনি সকল শিক্ষার্থীকে অতি আপন করে নিতেন। একজন শিক্ষার্থী ভালো করছে কি পিছিয়ে পড়ছে-তার আগে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই শিশুটিকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করা। তাঁর এই সহজভাবে কাছে টেনে নেওয়ার ক্ষমতাই তাঁকে এলাকার মানুষের কাছে এত প্রিয় করে তুলেছিল। শিক্ষকের প্রতি ভয় নয়, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রভাত স্যার যেন নিজের জীবন দিয়েই সেই সম্পর্কের একটি সুন্দর উদাহরণ রেখে গেছেন।
১৯৬৯ সালে শুরু হওয়া তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি ঘটে ২৯ অক্টোবর ১৯৯৮ সালে, যখন তিনি কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
প্রায় তিন দশক ধরে একই বিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থীকে তিনি শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর সামনে দিয়ে কত কিশোর বড় হয়েছে, কত শিক্ষার্থী জীবনের পথে ছড়িয়ে পড়েছে তার হিসাব হয়তো কোনো নথিতে পাওয়া যাবে না। কিন্তু একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় দলিল তো তাঁর শিক্ষার্থীরাই।

অবসরের মাত্র কয়েক বছর পর ১২ নভেম্বর ২০০২ সালে এই প্রিয় শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেন। থেমে যায় একটি কর্মময় জীবন; কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি তাঁর শিক্ষকতা। কারণ একজন ভালো শিক্ষক মৃত্যুর পরও তাঁর শিক্ষার্থীদের স্মৃতি, মূল্যবোধ ও জীবনবোধের মধ্যে বেঁচে থাকেন।
প্রভাত কুমার রায় স্যারের সহধর্মিণী স্বপ্না রায়। তাঁদের পাঁচ সন্তান-বিপ্লবী রায়, বর্ণালী রায়, হৃষিকেশ রায়, বিভা রায় ও বর্ণিতা রায়। এই পরিবারের সঙ্গে কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্পর্কটিও বিশেষভাবে আবেগের। প্রভাত স্যারের সন্তান হৃষিকেশ রায় স্বপন বর্তমানে একই বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। বাবা যে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রায় তিন দশক জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন, আজ সেই বিদ্যালয়েই তাঁর সন্তান শিক্ষকতা করছেন-এ যেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে শিক্ষার প্রদীপ তুলে দেওয়ার এক সুন্দর উত্তরাধিকার।
প্রভাত কুমার রায় স্যার আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু একটি বিদ্যালয়ের ইতিহাস শুধু ভবন, ফলাফল কিংবা পুরোনো নথিপত্র দিয়ে তৈরি হয় না। তার ইতিহাস তৈরি হয় এমন কিছু মানুষের জীবন দিয়ে, যাঁরা নিজেদের সময়, শ্রম, মেধা ও ভালোবাসা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তোলেন। প্রভাত কুমার রায় স্যার কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই ইতিহাসেরই এক উজ্জ্বল অংশ। তাঁর শান্ত মুখ, সহজ-সরল জীবন, বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং শিক্ষার্থীদের আপন করে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে আজও তাঁর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে জীবন্ত করে রেখেছে।
তিনি ১৯৯৮ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন কিন্তু শিক্ষার্থীদের হৃদয় থেকে নয়। তিনি ২০০২ সালে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন কিন্তু তাঁর শিক্ষা ও স্মৃতি আজও রয়ে গেছে।
প্রিয় প্রভাত স্যার, সময় আমাদের অনেক দূরে নিয়ে গেছে, কিন্তু আপনাকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি। KUP School পরিবারের ইতিহাসে এবং আপনার অগণিত শিক্ষার্থীর হৃদয়ে আপনি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বেঁচে থাকবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

লেখক: খুরশীদুজ্জামান আহমেদ, কালিগঞ্জ কে ইউ পি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক।

বিজ্ঞাপন