পত্রিকার পাতায় বড় বড় হেডলাইনে দেশ বিদেশের সন্ত্রাসী,গডফাদার, গ্যাং ষ্টার, মস্তান কিংবা ক্রিমিনালদের ছবি এবং কর্মের গল্প কত ভাবে যে লেখা হয় তা বলা মুশকিল। যা নয় তাও লেখা হয়, যা হয় তাও লেখা হয় কারন সেখানে সত্যি মিথ্যা প্রমাণ করার কোন সুযোগ নাই । ঐসব কাহিনীকে কেন্দ্র করেই চলচিত্র নির্মাণ করা হয়,যেখানে নায়ক সব সময় নিরীহ শ্রেণির মানুষ আর সমাজপতিরা গডফাদারের ভূমিকায় থাকে। প্রথমে গড ফাদাররা জয়ী থাকে পরিশেষে সমাজের নিরীহ মানুষদের প্রতীক নায়ক জয়ী হয়, গড ফাদারদের করুন পরিনতি দেখা যায়। বিশেষ করে অপরাধীদের ইতিহাস পুলিশ বাহিনীই বেশি জানে বিধায় তারা যে ভাবে গল্প বলে সে ভাবেই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ফলে মানুষ সেটাই জানে মানে এবং বিশ্বাস করে।অপরাধ জগতে পত্রপত্রিকার পাতায় এমন বহু অপরাধী চক্র বা সিন্ডিকেটের গল্প লেখা রয়েছে, যারা একসময় নিজেদের অপরাজেয় ভাবত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের পতন হয়েছে অত্যন্ত করুণ ও নির্মমভাবে।
বাংলাদেশের অপরাধ জগতের বাস্তব ইতিহাসে নব্বইয়ের দশক ও দুই হাজার সালের শুরুর দিকটি ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ড বা গ্যাং সংস্কৃতির চরম উত্থানের সময়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারি এবং ভাড়াটে খুনের মাধ্যমে একদল শীর্ষ সন্ত্রাসী নিজেদের অপরাজেয় ভাবত। কিন্তু তাদের প্রায় প্রত্যেকের পরিণতিই হয়েছিল অত্যন্ত নির্মম ও করুণ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও রক্তক্ষয়ী উদাহরণ হলো ঢাকায় তালিকাভুক্ত ‘২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসী’ গ্যাংগুলোর পারস্পরিক ধ্বংসযজ্ঞ ও পতন। তার মধ্যে অন্যতম হলো-
১. ‘সেভেন স্টার’ বনাম ‘ফাইভ স্টার’: রক্তের দামে রক্ত নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ঢাকার অপরাধ জগত মূলত দুটি বড় সিন্ডিকেটে বিভক্ত হয়ে পড়ে—সুব্রত বাইন ও জয়-এর নেতৃত্বাধীন ‘সেভেন স্টার’ এবং তানভীরুল ইসলাম জয় ও পিচ্চি হান্নানের নেতৃত্বাধীন ‘ফাইভ স্টার’। এলাকার আধিপত্য ও বখরা ভাগাভাগি নিয়ে এদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ছিল সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়েও নিষ্ঠুর।
২.কালা জাহাঙ্গীরের উত্থান ও নিখোঁজ রহস্য: মিরপুর-কাফরুল অঞ্চলের ত্রাস কালা জাহাঙ্গীর ছিল সেভেন স্টার গ্রুপের দুধর্ষ শুটার। শতাধিক খুনের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। তবে ক্ষমতার লোভে একপর্যায়ে সে নিজের গ্রুপের নেতাদের সাথেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। তার পরিণতি এতটাই নির্মম ছিল যে, অপরাধ জগতের ভেতরের সূত্র অনুযায়ী, বিরোধীদের ফাঁদে পড়ে তাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয় এবং তার মরদেহ এমনভাবে গুম করা হয় যে আজ পর্যন্ত তার কোনো হদিস মেলেনি।
৩.পিচ্চি হান্নানের পতন (২০০৪): কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁও অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারী পিচ্চি হান্নান ছিল কাঁচাবাজারের চাঁদাবাজির একক নিয়ন্ত্রক। সাধারণ ব্যবসায়ী বা পথচারীদের হত্যা করতেও সে দ্বিধা করত না। ২০০৪ সালে র্যাবের অভিযানের সময় অবরুদ্ধ হয়ে পালানোর চেষ্টা করলে গুলিবিনিময়ে তার রক্তাক্ত মৃত্যু ঘটে।
৪.এরশাদ শিকদারের ‘স্বর্ণকমল’ ও ফাঁসির মঞ্চ-বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসে খুলনার এরশাদ শিকদার ছিল এক অনন্য বর্বরতার নাম। ঘাট দখল ও চাঁদাবাজি দিয়ে শুরু করে সে গড়ে তুলেছিল নিজের ব্যক্তিগত জল্লাদ বাহিনী।বিরোধীদের ধরে নিজের বিলাসবহুল বাড়ি ‘স্বর্ণকমল’-এর গোপন টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে বরফ দিয়ে শরীর অবশ করে হাত-পায়ের রগ কাটা, বস্তাবন্দী করে ইট বেঁধে ভৈরব নদে ডুবিয়ে দেওয়া ছিল তার নিয়মিত কাজ। এমনকি তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অন্যতম জল্লাদ নূরে আলমকেও সে সন্দেহ করতে শুরু করেছিল ।পরিণতিতে যে সহযোগীদের সে নিজের হাতের পুতুল ভাবত, সেই নূরে আলমই আদালতে তার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে দাঁড়ায় এবং ২৪টি হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দেয়। ২০০৪ সালের মে মাসে খুলনা জেলা কারাগারে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তার মৃত্যুর পর ‘স্বর্ণকমল’ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তার পরিবারের সদস্যরাও পরিচয় গোপন করে নিঃস্ব অবস্থায় জীবন কাটাতে বাধ্য হয়।
৫.প্রকাশ-বিকাশ চক্র ও বিদেশে আত্মগোপনের ট্র্যাজেডি-মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকার দুই সহোদর প্রকাশ ও বিকাশ নব্বইয়ের দশকে এক আতঙ্কের সাম্রাজ্য কায়েম করেছিল। তাদের হুমকির একটি মাত্র ফোন কলই ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। পরিণতিতে পুলিশ ও যৌথবাহিনীর অভিযানের মুখে তারা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায়। কিন্তু অপরাধ তাদের পিছু ছাড়েনি। কলকাতায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থাতেই এক ভাই ভারতীয় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে দীর্ঘ বছর কলকাতার প্রেসিডেন্সি ও আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে কাটাতে বাধ্য হয়। অন্য ভাই দীর্ঘদিন অজ্ঞাতবাসে থেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে। কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তোলা এই চক্রের শেষ পরিণতি ছিল পরিবার-পরিজন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিনদেশের কারাগারে চরম নিঃসঙ্গ জীবন।
বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাস প্রমাণ করে—অস্ত্রের শক্তিতে যারা শহর কাঁপিয়েছিল, তাদের প্রায় কাউকেই স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করতে হয়নি। কেউ প্রতিপক্ষের গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়েছে, কেউ আইনশৃঙ্খলার অভিযানে মারা পড়েছে, আর যারা বেঁচে ছিল তাদের শেষ জীবন কেটেছে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কিংবা চরম নিঃসঙ্গতায়। তেমনি পৃথিবীর অন্যান্য দেশে অপরাধীদের একই অবস্থা দেখা যায়। যেমন-কলম্বিয়ার মেডেলিন কার্টেল (Medellín Cartel) এবং তাদের প্রধান সহযোগী চক্রগুলোর পতন।আশির দশকে পাবলো এসকোবারের নেতৃত্বাধীন মেডেলিন কার্টেল শুধুমাত্র একটি মাদক চোরাচালানকারী চক্র ছিল না; তারা একটি সমান্তরাল সরকার তৈরি করেছিল। শত শত কোটি ডলারের মালিক এসকোবার ও তার সহযোগীরা কলম্বিয়ার পুলিশ কর্মকর্তা, বিচারক, রাজনীতিক এবং সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাদের স্লোগানই ছিল—“প্লাতা ও প্লোমো” (টাকা নাও নয়তো গুলি খাও)।কিন্তু এই চরম বর্বরতার পরিণাম তাদের ওপর ফিরে এসেছিল তার চেয়েও বহুগুণ নিষ্ঠুর হয়ে।এসকোবারের হিংস্র আচরণে একসময় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। যখন এসকোবার লা ক্যাথেড্রাল কারাগারে বসে নিজেরই দুই শীর্ষ সহযোগী ফার্নান্দো গ্যালিয়ানো এবং জেরার্দো মোনকাদাকে নির্মমভাবে খুন করে তাদের দেহ পুড়িয়ে ফেলেন, তখন পুরো চক্রে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এসকোবারের সাবেক সহযোগী কার্লোস কাস্তানিও এবং প্রতিপক্ষ ক্যালি কার্টেল মিলে গঠন করে “লস পেপেস” (People Persecuted by Pablo Escobar)। এটি ছিল মূলত একটি কিলার স্কোয়াড, যার লক্ষ্য ছিল মেডেলিন চক্রকে সমূলে উপড়ে ফেলা। লস পেপেস মেডেলিন কার্টেলের আইনজীবী, হিসাবরক্ষক, বিশ্বস্ত শুটার এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যদেরও খুঁজে খুঁজে হত্যা করতে শুরু করে। প্রতিদিন মেডেলিন শহরের রাস্তায় কার্টেল সদস্যদের ক্ষতবিক্ষত ও বিকৃত লাশ পাওয়া যেত, যাতে লেখা থাকত তাদের অপরাধের চিহ্ন।একসময় শত শত দেহরক্ষী নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এসকোবারের পাশে শেষ দিনগুলোতে কেউই অবশিষ্ট ছিল না। তার বিশ্বস্ত হিটম্যানদের বেশিরভাগই হয় প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয়েছিল, না হয় ভয়ে পুলিশে ধরা দিয়েছিল।চরম অর্থাভাব, শীত এবং অনাহারে ভুগে পরিবারের সাথে একটি সংক্ষিপ্ত ফোন কলে কথা বলার সময় তিনি ট্র্যাকিংয়ের শিকার হন। ১৯৯৩ সালের ২ ডিসেম্বর মেডেলিনের এক ছাদের ওপর দিয়ে খালি পায়ে পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু হয়। যে ব্যক্তি নিজেকে ঈশ্বরের সমকক্ষ ভাবত, তার রক্তমাখা মরদেহ পড়ে ছিল সাধারণ এক টালিভাঙ্গা ছাদের ওপর। কার্টেলের সামরিক প্রধান হিসেবে পরিচিত গাছা ছিলেন সবচেয়ে রক্তপিপাসু। ১৯৮৯ সালে কলম্বিয়ান পুলিশ ও হেলিকপ্টার গানশিপের যৌথ অভিযানে তিনি নিজের ১৭ বছর বয়সী ছেলেসহ ধাওয়া খেয়ে একটি কলাবাগানে অবরুদ্ধ হন এবং মেশিনগানের গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কার্টেলের বিমান পরিবহন ও আন্তর্জাতিক রুটের মূল পরিকল্পনাকারী লেডারকে এসকোবার নিজেই বিশ্বাসঘাতকতা করে মার্কিন গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। দীর্ঘ কয়েক দশক তিনি কাটিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে, নিঃসঙ্গ ও পরিত্যক্ত অবস্থায়।
অপরাধ জগতের প্রতিটি শক্তিশালী চক্রের ইতিহাসেই দেখা যায়, সীমাহীন লোভ ও রক্তপাতের মাধ্যমে তারা যে সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, সেই রক্তের সাগরেই তাদের এবং তাদের পরিবার-পরিজনের সলিল সমাধি ঘটে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মের প্রভাব
৩ দিন আগে
তিস্তা চরের জীবন
৪ দিন আগে
রাজনীতির খাল ?
১ সপ্তাহ আগে
কেন কৃষি লাভজনক হচ্ছে না? ( পর্ব-২ )
২ সপ্তাহ আগে
কেন কৃষি লাভজনক হচ্ছে না? ( পর্ব-১ )
২ সপ্তাহ আগে