চারপাশে তিস্তার উন্মত্ত জলরাশি আর অগুনতি শাখা নদীর ঘূর্ণিপাক। তারই মাঝে নিঃসঙ্গ এক চর। সেই নির্জন চরে রুহুল আমিন একাই তার পরিবার নিয়ে বেঁধেছে বসত। দূর গাঁয়ের মানুষ সেই চরকে চেনে ‘রুহুলের টাপু’ বা ‘রুহুলের চর’ নামে। সাঁঝের আঁধার নামলেই সেখানে নেমে আসে গা ছমছমে নীরবতা। শনশন বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে নামে নিস্তব্ধতা—মনে হয় যেন চরের দেও-ভূত আর অতৃপ্ত আত্মাদের সাথেই রুহুলের ঘরকন্না।
তবে রুহুলের কাছে ওসব ভূতের ভয় নিতান্তই ছেলেমানুষি। তার মাথায় তখন অন্য এক নেশা চেপে বসে—মাছ ধরার নেশা। তিস্তার পানি দিনে শান্ত আর নিস্তরঙ্গ থাকলেও রাত গভীর হতেই জীবন্ত হয়ে ওঠে, মাছের দল ছোটাছুটি শুরু করে। জীবনের মায়ার চেয়ে মাছ শিকারের এই আদিম টান রুহুলের কাছে ঢের বড়। রাতভর অন্ধকার নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে সে। ভোরের আলো ফুটতেই সেই শিকার নিয়ে পাশের গাঁয়ের হাটে গিয়ে তোলে। খসখসে টাকার গন্ধ আর নগদ প্রাপ্তির স্বস্তি নিমিষেই রুহুলের মন থেকে দেও-ভূতের সব ভয় কর্পূরের মতো উড়িয়ে দেয়।
তিস্তার উত্তাল স্রোত কিংবা গভীরতার তোয়াক্কা সে কোনোদিন করেনি। লুঙ্গিটা মালকোঁচা মেরে, মাছের ডেকচি বগলে চেপে নদীতে গা ভাসিয়ে দিলেই হলো—সহজেই সে ওপারে পৌঁছে যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, নদীতে কোনো শুশুক বা ভোঁদড় কেবল মাথা তুলছে আর ডুবছে।
রুহুলের পরিবারের কোনো সদস্য বছরে একবারও মূল ভূখণ্ডের গ্রামে পা বাড়ায় না। প্রয়োজনই বা কী? নদীর চরে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি চরে বেড়ায়; আর হাতের নাগালে থাকা অথই চরে চলে অবাধ চাষাবাদ। বর্ষাকালে তাদের একমাত্র আশ্রয় একটি বড় নাও। তিস্তার পানি যত বাড়ে, রুহুলের কাঠের নাও তত ভাসে। প্রাচীনকালে নুহের (আ.) নৌকায় যেভাবে পরিবার আর প্রাণীকুল ঠাঁই পেয়েছিল, রুহুলও তেমনি তার ভিটেমাটি আর সংসার গুটিয়ে নৌকায় তোলে। পানি না নামা পর্যন্ত নৌকার পাটাতনেই রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া আর জীবনযাপন। পান করা থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক সব কাজেই নদীর জল। অথচ কারো কোনো ডায়রিয়া, কলেরা বা পেটের পীড়া নেই। চরের লোকে তো বলেই—জলে যার বাস, তার আবার সর্দি কিসের!
বর্ষার আগেই তাদের ঘরে তেল-লবণ কিংবা সামান্য ডাল মজুত করা থাকে। হাটবাজারে যাওয়ার দরকার পড়ে না। শাকসবজি না থাকলে নদীর টাটকা মাছ কেবল লবণ আর মরিচ দিয়ে সিদ্ধ করেই তৃপ্তিভরে খায়। মরিচ না মিললে শুধু নুন-জলেই সেদ্ধ মাছ চলে। চরের মানুষের কাছে এটাই চিরচেনা পুষ্টিকর আহার।
স্ত্রী, পুত্র, কন্যা আর পুত্রবধূ মিলিয়ে বারো জনের এক যৌথ সংসার। প্রত্যেকেই তিস্তার সাথে সাঁতার কেটে বড় হয়েছে; মাছ ধরা আর ফসলের কাজ সবার নখদর্পণে। তাদের চাহিদা বড় সীমিত—মাথার ওপর খড়ের চাল, শোবার জন্য পাতলা তক্তাপোষ, বালিশ বলতে ছেঁড়া কাপড়ে মোড়ানো খড়ের আঁটি, আর শীতের রাতে জড়ানোর জন্য কয়েক পরত জোড়াতালির পুরোনো কাঁথা। পুরুষদের বছরে সম্বল বলতে দুটি লুঙ্গি, একটি জামা আর কোমরে বাঁধা গামছা। নারীদের জন্য দুটি ধুতি শাড়ি; অতিরিক্ত শায়া-ব্লাউজ আলনায় তোলা থাকে বটে, কিন্তু গায়ে চড়ানোর তাড়া থাকে না। তবে দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার জন্য সবারই এক সেট ‘তোলা কাপড়’ যত্নে লুকানো থাকে।
চরে চুলা জ্বালাতে দেশলাই বা কেরোসিনের বাতিই যথেষ্ট। বছরজুড়ে রান্নার জ্বালানি জোগায় নদী থেকে ভেসে আসা খড়কুটো আর চরের কাশবন। মাটির হাঁড়ি আর মাছ বেচার সিলভারের ডেকচিই তাদের রান্নাঘর। খাওয়ার জন্য মাটির সরা আর পেয়ালা। খোলা নদীর তীরই তাদের প্রাকৃতিক শৌচাগার, নদীর বহমান জলই সব শুচির মাধ্যম।
চরের জমিতে চাষাবাদের জন্য বলদ আর লাঙল দিয়ে হাল চষতে হয় না। নদীর উর্বরা পলিমাটিতে ধানের বীজ ছড়িয়ে দিলেই লকলকিয়ে সবুজ চারা বেড়ে ওঠে। ধান পাকলে শুধু কাস্তে হাতে নেমে পড়া। ভাদ্রের শেষাশেষি কাশবনের ফাঁকে ফাঁকে ঠাকুরি কলাইয়ের দানা ছিটিয়ে দিলেই মাঠ ভরে ওঠে ডালের ফসলে। মসুর কিংবা খেসারির চাষও হয় কোনো খরচ ছাড়াই—একেবারে আদিম পদ্ধতিতে। আদিপিতা আদম (আ.)-কে যেভাবে ফেরেশতারা বীজ বপন শিখিয়ে দিয়েছিলেন—একদিকে জমিনে বীজ ফেলা, অন্যদিকে আপনাআপনি পাকা ফসল ঘরে তোলা—রুহুলের জীবন যেন সেই আদিম সরলতারই প্রতিচ্ছবি।
সংসার নিয়ে রুহুলের কোনো জটিল সমীকরণ নেই, নদীর জল বয়ে গেলে কোনো দুশ্চিন্তাও নেই। বর্ষায় নদী ভাঙতে ভাঙতে উঠোনে এসে ধাক্কা দিলে সে নিঃসংকোচে ঘর ভেঙে পিছিয়ে নেয়। তিস্তার সাথে এই তার আজন্ম লুকোচুরি খেলা। অসুখ-বিসুখে মাঠের লতাপাতাই প্রধান ভরসা; খুব বেশি বাড়াবাড়ি হলে গাঁয়ের কবিরাজের কাছে গিয়ে কয়েকটা বড়ি কিংবা এক শিশি তরল দাওয়াই এনেই সেরে ওঠে।
এভাবেই দিন যায়, বছর গড়ায়। একসময় বুড়ো হয়ে রুহুল নিথর হয়ে যায়। কোনো এক গভীর রাতে চোখ বুজলে এই চরের বালিতেই তার কবর হয়। পরের বর্ষার প্রবল স্রোতে সেই মাটির ঢিবি তিস্তার জলে ধুয়েমুছে ভেসে যায়; কেউ আর কোনোদিন তার খোঁজ রাখে না। সমাজের তথাকথিত কোলাহল আর নিয়মের বাইরে এসে রুহুলরা এভাবেই মাটির সাথে মিতালি পাতিয়ে আবার মাটিতেই বিলীন হয়ে যায়। তাদের কোনো সঞ্চয় থাকে না, কোনো স্থাবর সম্পত্তি থাকে না।
কালের বিবর্তনে আজ আর সেই প্রমত্তা তিস্তাও নেই, নেই সেই যৌবনদীপ্ত রুহুল আমিনও। এখন সেখানে কেবল ধূ-ধূ বালুচর আর রুক্ষ মাটি। বেঁচে থাকার তাগিদে উত্তরাধিকারের সেই বিশাল চর আজ সংকুচিত হতে হতে কেবল এক ফালি জমিতে এসে ঠেকেছে।
লেখক মুহাম্মদ ইয়ার আলী , স্বত্বাধিকারী , আলীবাবা থিম পার্ক।
রাজনীতির খাল ?
৫ দিন আগে
কেন কৃষি লাভজনক হচ্ছে না? ( পর্ব-২ )
১ সপ্তাহ আগে
কেন কৃষি লাভজনক হচ্ছে না? ( পর্ব-১ )
১ সপ্তাহ আগে
নেতা দেশ প্রেমিক কি না যাচাই করার উপায়
৩ সপ্তাহ আগে
কিস্তির বেড়াজালে গ্রাম
৪ সপ্তাহ আগে