বাংলায় প্রচলিত একটি প্রবচন রয়েছে—‘যে খাল খোঁড়ে, সে নিজেই একদিন সেই খালে পড়ে।’ অন্য কোথাও এর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে এটি প্রায় এক ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ক্ষমতার মোহে যখনই কোনো শাসকগোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কোনো ফাঁদ পেতেছে কিংবা চক্রান্তের ‘খাল’ কেটেছে, কালের পরিক্রমায় সেই খালে পড়ে তাদের নিজেদেরই রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এর বহু নির্মম দৃষ্টান্ত রয়েছে:
• ১৯৭২–১৯৭৫ (বিকল্প বাহিনী ও রাজনৈতিক সংঘাত): স্বাধীনতার পর জাতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি সমান্তরাল শক্তি হিসেবে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর মতো বিতর্কিত কাঠামো তৈরি এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়নের যে সূচনা হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের নির্মম ট্র্যাজেডিতে সামরিক বাহিনীর একাংশের হাতেই তৎকালীন রাষ্ট্রক্ষমতার করুণ পরিণতি রচিত হয়।
• ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ (খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থান): রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে যে পাল্টা অভ্যুত্থানের পথ তৈরি হয়েছিল, মাত্র চার দিনের মাথায় ৭ই নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে সেই প্রক্রিয়ার রূপকারদেরই নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হয়।
• কর্নেল তাহের ও জাসদের ভূমিকা: ৭ই নভেম্বরের সিপাহি বিপ্লবের নেপথ্য শক্তি হিসেবে কর্নেল তাহের এবং জাসদ যে অভ্যুত্থানের সূচনা করেছিল, পরবর্তীতে সেই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সংহত হওয়া শাসনকাঠামোর হাতেই কর্নেল তাহেরকে মৃত্যুদণ্ডবরণ করতে হয় এবং জাসদ নেতৃত্ব চরম বিপর্যয়ে পড়ে।
• ৩০ মে ১৯৮১ (জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড): দীর্ঘ টানাপোড়েন ও সামরিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার যে চড়াই-উতরাই রচিত হয়েছিল, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত আরেক রক্তাক্ত সামরিক চক্রান্তের শিকার হয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিহত হতে হয়।
• ১৯৮২–১৯৯০ (এরশাদের সামরিক শাসন): ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এরশাদ বিরোধী দলগুলোকে দাবিয়ে রাখতে দীর্ঘকাল যে প্রশাসনিক ও আইনি নিপীড়নের চর্চা করেছিলেন, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই ব্যবস্থার কারণেই তাঁকে বহু বছর কারাবন্দী থাকতে হয়।
• ১৯৯১–১৯৯৬ (তত্ত্বাবধায়ক সংকট ও ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন): ১৯৯১ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তৎকালীন বিএনপি সরকার সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তির বিরোধী দলের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে একতরফা নির্বাচন আয়োজন করলেও, দেশজুড়ে তীব্র গণআন্দোলন ও অসহযোগের মুখে মাত্র ১২ দিনের মাথায় ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। নিজেদের রাজনৈতিক জেদের কারণে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতা হারাতে হয় তাদের।
• ১৯৯৬–২০০১ (আওয়ামী লীগ শাসন ও জনরোষ): ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে যে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা তৈরি করে, তৎকালীন সময়ে দুর্নীতির বৈশ্বিক সূচকে দেশের অবস্থান ও রাজনৈতিক সংঘাতের ফলে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়। সেই ক্ষোভের পথ ধরেই ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা শোচনীয় পরাজয়ের মুখোমুখি হয় এবং পরবর্তীতে দমন-পীড়নের শিকার হয়।
• ২০০১–২০০৬ (বিচারপতিদের বয়স বিতর্ক ও ১/১১-এর আগমন): বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার পুনরায় ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল হিসেবে প্রধান বিচারপতির অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি কে. এম. হাসানকে ঘিরে যে জটিলতা তৈরি করেছিল, তা রাজপথের সহিংস সংঘাত (যেমন লগি-বৈঠার তাণ্ডব) ডেকে আনে। এর পরিণতিতেই আবির্ভাব ঘটে ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের, যার যাঁতাকলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—উভয় দলের শীর্ষ নেতৃত্বকেই কারাবরণ ও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।
• ২০০৯–২০২৪ (তত্ত্বাবধায়ক বিলোপ ও দীর্ঘমেয়াদী শাসন): ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগ আদালতের রায়ের প্রেক্ষাপটে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। এর ফলে ২০১৪ ২০১৮ ও ২০২৪ সালে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের মাধ্যমে টানা শাসন কায়েম করা গেলেও, রাজনৈতিক ক্ষোভের যে অগ্নিকুণ্ড তৈরি হয়েছিল, তা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট এক নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফেটে পড়ে এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে চরম বিপর্যয়ের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হতে হয়।
• ২০১৩-এর শাপলা চত্বর থেকে ৫ই আগস্ট: ২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ওপর পরিচালিত বলপ্রয়োগ ও দমননীতি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে পরিবেশ তৈরি করেছিল, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সেই ক্ষোভের বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিফলন দেখা যায়।
• দলীয় নিষেধাজ্ঞা বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা: ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় জামায়াতে ইসলামীকে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ সরকার যে নজির স্থাপন করেছিল, ২০২৪-এর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ছাত্র-জনতার ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোও সে রকম নিষিদ্ধের তালিকায় পরে আজ অস্তিত্বের সংকটে পরতে হয়েছে।
• শাহবাগ আন্দোলন ও নিষেধাজ্ঞার বৈপরীত্য: শাহবাগ আন্দোলনের মাধ্যমে জামায়াত নিষিদ্ধের যে দাবি ও স্লোগান তীব্র হয়েছিল, ঐতিহাসিক পালাবদলে আজ ঠিক সেই স্থান থেকেই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের জোরালো স্লোগান উঠছে। যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধের সূচনা হয়েছিল, কালের পরিক্রমায় দলটিকে আজ একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
• আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও রাজনীতির পরিণতি: ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। এর মাধ্যমে জামায়াত ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার, বিচার ও ফাঁসি কার্যকর করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহৃত সেই বিচারিক প্রক্রিয়াই আজ যেন দলটির জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে ফাঁসির দাবি ও আদেশ কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও কারাবন্দিত্বের শিকার হওয়া বিরোধী শক্তির এই প্রতিক্রিয়াকে অনেকেই রাজনৈতিক প্রতিশোধের এক দীর্ঘ চক্র হিসেবে দেখছেন।
• রাজনৈতিক সহিংসতা ও পুনরাবৃত্তি: দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকাকালে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিরোধী নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের যে অভিযোগ ছিল, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ক্ষমতাচ্যুতির দিনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঠিক একই ধরণের সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে একে 'ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি' এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
• নির্বাসন ও রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা: তত্ত্বাবধায়ক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে অতীতে তৎকালীন বিরোধী দলীয় শীর্ষ নেতাদের যেভাবে বিভিন্ন শর্ত ও মুচলেকা দিয়ে দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছিল, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পুনর্বাসন বা প্রত্যাবর্তনেও হয়তো অনুরূপ কোনো শর্ত বা মুচলেকা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াতে পারে।
• পরিচয়ের রাজনীতি ও গণহত্যার দায়: অতীতে জামায়াতে ইসলামীকে যেভাবে রাজনৈতিক বয়ানে 'পাকিস্তানের দোসর' হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো, ঠিক তেমনি বর্তমানে আওয়ামী লীগকে তীব্রভাবে 'ভারতের অনুগত বা দালাল' হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি, ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগী হিসেবে যাদের দেখা হতো, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে চালানো দমন-পীড়নের কারণে আজ আওয়ামী লীগও অনুরূপভাবে ‘গণহত্যাকারী’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গণমানুষের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে।
• ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ফাঁদ: ইতিহাস বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো দল যদি নীতিমালার চেয়ে সংকীর্ণ রাজনৈতিক কৌশল বা একপেশে ফর্মুলাকে স্থায়ী ক্ষমতা কুক্ষিগত করার হাতিয়ার বানায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই ফাঁদ তাদের নিজেদের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনে।নেতাদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ভুল সিদ্ধান্তের নির্মম মাশুল সবসময় দিতে হয় তৃণমূলের সাধারণ কর্মী-সমর্থক এবং সাধারণ নাগরিকদের। রাজপথে জীবন হারায় তরুণরা, ধ্বংস হয় দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। রাজনীতির এই সর্বনাশা ‘খাল খনন’ ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়বদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
লেখক মুহাম্মদ ইয়ার আলী
স্বত্বাধিকারী
আলীবাবা থিম পার্ক
তিস্তা চরের জীবন
৫ ঘন্টা আগে
কেন কৃষি লাভজনক হচ্ছে না? ( পর্ব-২ )
১ সপ্তাহ আগে
কেন কৃষি লাভজনক হচ্ছে না? ( পর্ব-১ )
১ সপ্তাহ আগে
নেতা দেশ প্রেমিক কি না যাচাই করার উপায়
৩ সপ্তাহ আগে
কিস্তির বেড়াজালে গ্রাম
৪ সপ্তাহ আগে