বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে পাড়ায় পাড়ায় বা মহল্লায় বিভিন্ন পীরের ভক্তরা বসবাস করত এবং পীর সাহেবরা ভক্তদের জীবন চলার জন্য যা নির্দেশনা প্রদান করতেন তা দিয়েই জীবন চলার চেষ্টা করত। ধর্ম মানেই পীরের আদেশ উপদেশ কিংবা নছিহতকে তারা মনে করতো,বাংলাদেশের গোটা সমাজ ব্যবস্থাই এক সময় পীরদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত,পীরেরা ছিলেন এ দেশের মুসলিম সমাজের অঘোষিত নেতা।
যাদের কথা বা নছিহতে সমাজ পরিচালিত হতো বা সমাজ প্রভাবিত হতো। অনেক সময় পীরদের আকিদার উপর নির্ভর করে সমাজের মসজিদ মাদ্রাসা ইদগাহ বা সামাজিক কার্যক্রম চলতো। কোন কোন ক্ষেত্রে এখনো হয়। যেমন কোন পীর বিশ্বাস করতেন মাইকের মাধ্যমে কোরআন শরীফ পড়ে নামাজ পড়া নাজায়েজ আবার কোন পীর মনে করতেন জায়েজ। তাই অনেক গ্রামে মাইক পন্থী এবং মাইক বিপন্থী গ্রুপ তৈরি হয়ে মারামারি পর্যন্ত করে থাকে। কোন কোন গ্রামে এই মারামারি এত ভয়াবহ রূপ ধারণ করত যে অসংখ্য মানুষ আহত নিহত হতো,মামলা মুখোদদমা পর্যন্ত চলত এবং এর ফলে ইদগাহ মাঠ-মসজিদ সমাজ আলাদা আলাদা করতে বাধ্য হত।
পীর সাহেবদের ফতোয়ার কারণে মানুষে মানুষে দলাদলি,হানাহানি হিংসা-বিদ্বেষ মারামারির কারণে সমাজে যে অপরাধ জন্ম নিত বা অপরাধ হতো তার দায়ভার সেই পীর সাহেবেরা নিবেন কিনা জানিনা তবে সমাজ তাদের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য হতো । আল্লাহপাক কুরআনে পাকে হালাল-হারামের যে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে কাফের মুশরিক মোনাফেক এবং মুসলমান চিহ্নিত করার বিধান দিয়েছেন অনেক ক্ষেত্রে ধর্মের সে নির্ধারিত সীমা রেখা পীর সাহেবরা পরিবর্তন করে দিত। মাঝেমধ্যেই তারা ধর্মীয় সীমা রেখা অতিক্রম করে নিজের মতামত আলোকে নিজেরাই হারাম হালালের সীমা রেখা তৈরি করে দিত।এমনকি জান্নাত জাহান্নাম পর্যন্ত মানুষকে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিত । যদিও সঠিক পীর সাহেবরা এ কাজ কখনো করতো না। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার প্রসার এবং বিস্তার লাভ করার ক্ষেত্রে পীর সাহেব রাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৮০ থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত পীর সাহেব রাই এদেশের গ্রামে গঞ্জে ওয়াজ মাহফিল করত এবং লোকজনকে ধর্মীয় কিচ্ছা কাহিনী বয়ান শুনাতো এবং পীর সাহেবদের পাগড়ি দিয়ে মানুষকে বয়াত করাতো যাকে মুরিদ বলা হতো। মুরিদ মানে ভক্ত। যার যত ভক্ত তিনি যত শক্ত পীর বলে সমাজে পরিচিত ছিলেন। ভক্ত বৃন্দের দান অনুদান উপহার কিংবা নজরানাই পীর সাহেবদের বাৎসরিক আয়। ভক্তবৃন্দের গাছের ফলমূল মাঠের ধান কিংবা গোয়ালের গরু ছাগল হাঁস মুরগি বাঁশ বাগানের বাঁশ সবাই পীর সাহেবদের দরবারে নজরানা হিসেবে পেশ করা হতো। এমনও ভক্ত বা মুরিদ রয়েছে যারা ক্ষেতের ফসল গাছের ফলমূল বা শাক সবজি আগে নিজে ভোগ না করে পীরসাহেবকে দিত । কারণ তাদের বিশ্বাস পীর সাহেবদের আগে না দিয়ে নিজে খেলে ফসলের বরকত হয় না। আর সারা বছরের মহিলাদের মান্নতের কারণে হাঁস মুরগি চাউল ডাউল থেকে শুরু করে গরু ছাগল উট দুম্বা পর্যন্ত পীর সাহেবদের দরবারে বাৎসরিক ভিত্তিতে জমা হতো বা হয়। পীর সাহেবরা বাৎসরিক ভিত্তিতে ওরস মোবারক করার নামে এই সমস্ত সংগ্রহ করে সামান্য কিছু মুরিদানদের খাওয়াইয়া অথবা অনুষ্ঠান করে অবশিষ্ট গুলোকে পাইকারি দরে বিক্রি করে তাদের নিজস্ব প্রয়োজন পূরণ করে।
আশি বা নব্বই দশক পর্যন্ত পীর সাহেবদের যে দাপট এ দেশে দেখা যেত বর্তমানে কিন্তু সেরকম দেখা যায় না। বর্তমানে পীর সাহেবদের বাৎসরিক অনুষ্ঠানসমূহ ঐচ্ছিক ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কেউ ইচ্ছা করলে যায় কেউ ইচ্ছা করে যায় না অথবা কেউ দেয় কেউ দেয় না। আগে পীর সাহেবরা গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসায় অথবা মানুষের দাড়িয়া ঘরে হালকা বা হালকায়ে জিকির অনুষ্ঠান করত । সেই সমস্ত অনুষ্ঠানে যারা নিয়মিতভাবে হাজির থাকত তাদেরকে জাকেরান বলা হতো। বর্তমানে এই প্রথাটিও বিলুপ্তর পথে চলেছে। আগের মত এখন আর হালকা ঘর বা জেকেরের ঘর বা জেকেরের অনুষ্ঠান তেমন কোথাও হয় না । পীর সাহেবেরাও তাদের এলাকা ছাড়াও বাইরে তেমন আর ঘোরাফেরা করে না। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি দরবার শরীফ এর নাম শোনা যায় যেমন চরমোনাই শর্ষিনা ফরিদপুর এনায়েতপুর ইত্যাদি। সবাই নিজ দরবারের সীমানায় কেন্দ্রিভুত এবং তবে রাজনৈতিক ধারায় সংযুক্ত। যদিও বর্তমানে পীর তন্ত্র বা সুফিবাদ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, তবে ইতিহাসের তুলনায় বর্তমান এর প্রভাব, গভীরতা ও সামাজিক দৃশ্যমানতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে বা রূপ বদলেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, দার্শনিক ও আধুনিক সমাজব্যবস্থার কিছু কারণ রয়েছে তারমধ্যে অন্যতম হলো-
(১) সালাফি ও সংস্কারবাদী আন্দোলনের উত্থান- আঠারো শতক থেকে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহাবের সংস্কারবাদী ধারা এবং পরবর্তীকালে সালাফি আন্দোলনের প্রসার ঘটে। এই ধারাগুলো শরীয়াহর আক্ষরিক ও কঠোর প্রয়োগের ওপর জোর দেয় এবং তারা বিদ'আত ও শিরকের অভিযোগে মাজার জিয়ারত, তবাররুক গ্রহণ, উরস উদযাপন, পীর-মুর্শিদের মধ্যস্থতা কিংবা সামা (কাওয়ালি/আধ্যাত্মিক সংগীত)—এসব ঐতিহ্যবাহী সুফি রীতিকে সংস্কারবাদীরা কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী (বিদ'আত ও ক্ষেত্রবিশেষে শিরক) হিসেবে আখ্যায়িত করে সুফিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রচারণা চালায়।
(২) পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা-ব্রিটিশ ও ফরাসি উপনিবেশের সময় সুফি দরগাহ ও খানকাগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি (যেমন ওয়াকফ সম্পত্তি ও জায়গির) রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় বা ধ্বংস করা হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সুফি কেন্দ্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এছাড়াও ঐতিহ্যগতভাবে সুফি পীরদের পরিচালিত মাদ্রাসা ও খানকাভিত্তিক আধ্যাত্মিক শিক্ষার জায়গা দখল করে নেয় আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, যেখানে আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক দর্শনের কোনো স্থান রাখা হয়নি।
(৩) রাজনৈতিক ইসলামের (Political Islam) প্রসার-বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম ব্রাদারহুড, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ইসলামপন্থী আন্দোলনের উত্থান ঘটে। তাদের লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক সাধনার চেয়ে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য।রাজনৈতিক ইসলাম সুফিদের আত্মমগ্ন ধ্যান ও নির্জনতাকে মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক দুর্বলতা ও পশ্চাৎপদতার কারণ হিসেবে সমালোচনা করতে শুরু করে।
(৪) সুফি ঘরানার ভেতরের অবক্ষয় ও অপসংস্কৃতি-বহু মাজার ও দরগাহে আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ সাধকের বদলে অযোগ্য বংশধররা গদিনশীন পীর হতে শুরু করেন, যাদের মধ্যে মৌলিক ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ঘাটতি ছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে মাজারগুলোকে কেন্দ্র করে আর্থিক শোষণ, ভণ্ডামি, মাদকসেবন শরিয়াহ-বহির্ভূত উন্মাদনার অনুপ্রবেশ ঘটায় এর ফলে শিক্ষিত ও সচেতন তরুণ প্রজন্মের কাছে সুফি ধারার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়।
(৫) আধুনিক পুঁজিবাদ ও বস্তুবাদ-সুফিবাদের মূল শিক্ষা ছিল আত্মত্যাগ, লোভ বর্জন ও অন্তরের প্রশান্তি। আধুনিক ভোগবাদী সমাজ ও পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামো মানুষকে বস্তুগত সাফল্য ও বৈষয়িক প্রতিযোগিতার দিকে টেনে নিয়েছে, যা সুফি জীবনধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সুফি সাধনা হলো বছরের পর বছর ধৈর্য, মোরাকাবা ও কঠোর আত্মসংযমের পথ। বর্তমান দ্রুতগতির জীবনযাত্রায় মানুষ দীর্ঘমেয়াদি আধ্যাত্মিক সাধনার চেয়ে দ্রুত ফল লাভের ধারণায় বেশি আকৃষ্ট।
(৬) শিক্ষা ব্যবস্থা -আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মিডিয়ার প্রভাবে মানুষ ধর্ম শেখার জন্য এখন আর ব্যক্তির উপর নির্ভর করে না তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে পারে বিধায় একক কোন পীর বা ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয় । সাথে সাথে ভাষা জ্ঞান বৃদ্ধি জনিত কারণে মানুষ সরাসরি কুরআন হাদিস পড়ে অনুবাদ করতে পারে বিধায় ব্যক্তির ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না । তবে কোন কোন ক্ষেত্রে
সুফিবাদ তার ঐতিহাসিক খানকাভিত্তিক বিশাল রূপ হারিয়ে ফেললেও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি।বহু মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক পীর-মুরিদির বাইরে গিয়ে একাগ্র ইবাদত, জিকির ও সুফি দার্শনিকদের (যেমন জালালুদ্দিন রুমি, ইবনে আরাবি, ইমাম গাজ্জালি) লেখার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির চর্চা করছেন। প্রাচ্যে ঐতিহ্যবাহী রূপ দুর্বল হলেও পশ্চিমা বিশ্বে রুমির কবিতা ও সুফি ধ্যানচর্চা মনোদৈহিক প্রশান্তির উপায় হিসেবে নতুন আঙ্গিকে গ্রহণ করা হচ্ছে।
লেখক: মুহাম্মদ ইয়ার আলী, স্বত্বাধিকারী, আলীবাবা থিম পার্কো ।
লালমনিরহাট জেলা-শিল্প উন্নয়নে বাধা-২
১ দিন আগে
চর নিয়ে দাঙ্গা - নিরসনের পথ
৪ দিন আগে