তিস্তা ধরলা ব্রহ্মপুত্র যমুনা অববাহিকায় শুকনো মৌসুমে প্রতি বছরই কোথাও না কোথাও চরে বসবাসরত বাসিন্দাদের মধ্যে চরাঞ্চলের দখল নিয়ে দাঙ্গা বাঁধে এবং কেউ না কেউ মারা যায়।প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চরের দখল নিয়ে এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে কিন্তু এর কোনও স্থায়ী সমাধান নেই । যদিও দাঙ্গা পরবর্তী সময়ে মামলা হয় কিন্তু সে মামলার বিচার নিষ্পত্তি হয়েছে বলে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। উল্টো আদিম যুগের মত পাড়ায় পাড়ায় গ্রামে গ্রামে গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে চিরস্থায়ী শত্রুতা সৃষ্টি হয় এবং চলতে থাকে। আদিম যুগের মতো চরাঞ্চলের মাতব্বর শ্রেণীর লোকেরা একের অধিক বিবাহ করে বহু সন্তান জন্ম দিয়ে তাদের পরিবারের শক্তি সমর্থ্য বৃদ্ধি করার প্রতিযোগিতা চালু রেখেছে। চর যেহেতু দুর্গম অঞ্চল এবং নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না । তাই কোন চর কোন থানার অধীনে তাহা নির্ধারণ করা কঠিন বিষয় । ফলে চরের দুর্গম অঞ্চলগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা জনসাধারণ নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে, সরকারের ভূমিকা সেখানে খুব কম।
প্রতি বছর চরাঞ্চলে দাঙ্গা লাগার কারণ মুলত সরকারের ভুমি আইন ও নদী ভাঙন। নদীর দুই তীরে যারা বসবাস করে তারা সকলেই পৈত্রিক সূত্রে বা উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে কিংবা ক্রয় সূত্রে কিছু না কিছু জমির মালিক কিন্তু নদী যখন তার ভাঙ্গনে সেই জমিগুলোকে পানির নিচে বিলীন করে নিয়ে যায় বিপত্তিবাদে বাঁধে তখনই। পুর্বে আইন ছিল যে নদীতে কোন জমি ভেঙ্গে বিলীন হলে সেই জমি অবশ্যই খাস জমি হিসেবে গণ্য হবে । পরবর্তীতে যদিও আইন সংশোধন করে বলা হয়েছে যে একবার নদীতে বিলীন হলে ৩০ বছরের মধ্যে যদি সেই জমি চর হিসেবে দেখা যায় তাহলে পূর্বের মালিক ওই জমির মালিক বলে গণ্য হবে কিন্তু ৩০ বছরের মধ্যে না জাগলে সেই জমির মালিকানা নদী মানে সরকার হবে। সাধারণত বাংলাদেশে নদীভাঙনে কোনো জমি বিলীন হলে (শিকস্তি) এবং পরবর্তীতে তা পুনরায় জেগে উঠলে (পয়স্তি) নামে পরিচিত হয়। এ ধরনের জমির মালিকানা কী হবে, তা মূলত স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট, ১৯৫০ (State Acquisition and Tenancy Act, 1950) এর ধারা ৮৬ ও ৮৭ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।আইন অনুযায়ী মালিকানা নির্ধারণের মূল নিয়মগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
(১) জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার সময় (শিকস্তি)- জমি নদীতে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে মূল মালিকের দখল বা স্বত্ব স্থগিত হয়।তলিয়ে যাওয়া জমির জন্য মালিককে আর ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) দিতে হয় না। তবে এর জন্য ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আবেদন করে খাজনা মওকুফের তালিকাভুক্ত (শিকস্তি রেজিস্টারে নাম অন্তর্ভুক্ত) করাতে হয়।
(২) জমি পুনরায় জেগে উঠলে মালিকানা (পয়স্তি)-নদীতে বিলীন হওয়া জমি যদি ভবিষ্যতে চর হিসেবে আবার জেগে ওঠে, সে ক্ষেত্রে মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলি রয়েছে:
(ক) ৩০ বছরের সময়সীমা: আইন অনুযায়ী, জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে যদি তা স্বস্থানে বা তার সংলগ্ন স্থানে পুনরায় জেগে ওঠে, তবে মূল মালিক বা তার বৈধ উত্তরাধিকারীরা সেই জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার দাবি করতে পারেন।
(খ) ৩০ বছর অতিক্রম করলে: যদি জমিটি বিলীন হওয়ার ৩০ বছরের মধ্যে জেগে না ওঠে, তবে মূল মালিকের স্বত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় এবং জমিটির মালিকানা সরাসরি সরকারের (খাস জমি হিসেবে) অধীনে চলে যায়।
(৩) মালিকানা ফিরে পাওয়ার প্রক্রিয়া ও শর্ত সর্বোচ্চ জমির সীমা (Land Ceiling): চর জেগে ওঠার পর মূল মালিক জমিটি ফেরত পেতে পারেন, তবে শর্ত থাকে যে নতুন ফেরত পাওয়া জমি এবং তার বর্তমান জমির মোট পরিমাণ যেন সরকারের নির্ধারিত পারিবারিক সর্বোচ্চ সীমা (বর্তমানে ৬০ বিঘা) অতিক্রম না করে।
(ক) ভূমি রাজস্ব কর্মকর্তার পদক্ষেপ: জমি জেগে ওঠার পর সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড / সার্ভেয়ার) জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ করে চিহ্নিত করেন যে কোন অংশটি কোন জোতের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
(খ) খাজনা পুনরায় চালুর আবেদন: চর জেগে ওঠার পর সংশ্লিষ্ট মালিককে পুনরায় জমির দখল বুঝে নিতে এবং রেকর্ড সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিকট আবেদন করতে হয়। অর্থাৎ কোন জমি নদীগর্ভে থাকা অবস্থায় তার ওপর ব্যক্তিগত কোনো ব্যবহারিক কর্তৃত্ব থাকে না; তবে ৩০ বছরের মধ্যে তা পুনরায় জেগে উঠলে শর্তসাপেক্ষে মূল মালিক বা উত্তরাধিকারীই এর বৈধ দাবিদার থাকেন, অন্যথায় তা সরকারের খাস জমি হিসেবে গণ্য হয়।
সাধারণ জনগণ এ আইনের ব্যপারে একেবারেই উদাসীন। তাদের ধারণা জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেলে তার মালিকানা সরকার হয়ে যায়। তাই সরকারী খাস জমি জোরপূর্বক দখলে নিলেই মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। সে কারণে তারা চরাঞ্চলে “জোর যার মুল্লুক তার” নীতিতে চলতে চেষ্টা করে,ফলে গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়,লড়াই বাঁধে,মানুষ আহত নিহত হয় মামলা চলে ইত্যাদি ঘটনা ঘটে থাকে।
এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ হিসাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হলো-
(১) যদি সমবায় ভিত্তিতে চরাঞ্চলের জমি নদী তীরবর্তী লোকজনের মধ্যে বন্দোবস্ত করে দেওয়া যায় তাহলে সকলের যৌথ উদ্যোগে সে জমি সমুহ ব্যাপক চাষযোগ্য হবে এবং কৃষি কাজে ব্যবহৃত হবে। এতে কৃষি বিপ্লবের যেমন সুচনা হবে তেমনি জমি নিয়ে কোন দ্বন্দ্ব থাকবে না।
(২) বর্তমানে গ্রাম্য টাউট মাতব্বররা বনজিম(নালি) ভিত্তিতে চরের জমি ভাগ করে নেয়। এতে তারা গরিবদের কম করে দেয় আর নিজেরা বেশি করে নেয়। নিজেদের মধ্যে বেশি করে নেওয়ার যে প্রাধান্য থাকে,সমবায় ভিত্তিতে দিলে তা দূরীভূত হবে ফলে সংকট সৃষ্টি হবে না।
(৩) বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সরকারকে চরাঞ্চলের জমি প্রকৃত মালিকদেরকে সরেজমিনে বুঝে দিলেও দ্বন্ধ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
ধন্যবাদ
লেখক: মুহাম্মদ ইয়ার আলী, স্বত্বাধিকারী, আলীবাবা থিম পার্ক।
দাদন চক্রে হারিয়ে যাচ্ছে হাওলাদ
১ দিন আগে