রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
☰ সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

লালমনিরহাট জেলা-শিল্প উন্নয়নে বাধা-২


প্রকাশ : (৯ ঘন্টা আগে)
লালমনিরহাট জেলা-শিল্প উন্নয়নে বাধা-২

লালমনিরহাট জেলা শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা ও বাধা এই বিষয়ে আজকে দ্বিতীয় পর্বে আমার আলোচনা পর্যালোচনা লালমনিরহাট জেলা বাসীর বিবেচনার জন্য নিচে তুলে ধরলাম-
(১) রাজনৈতিক দলের প্রভাব-লালমনিরহাট জেলায় যে কোন ধরনের শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সমসাময়িক সময়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা পাতিনেতা কিংবা দলের উর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ নানা রকম চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। তারা সামনে বাধা দিতে না পারলেও পিছনে বাধা দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। বাধা দেওয়ার দুটি পদ্ধতি দ্বারা অবলম্বন করে প্রথমত তারা রাজনৈতিকভাবে তাকে নানা রকম হয়রানি করার জন্য চেষ্টা করে অথবা তাদের মনোভাবে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা করে । নইলে বড় অংকের চাঁদা বা কমিশন দেওয়ার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে। কোন কোন ক্ষেত্রে ক্ষমতাশীন দলের নেতৃবৃন্দের ছেলেরা অথবা সদস্যরা ওই কোম্পানিতে শেয়ার বা অংশীদার হওয়ার জন্য নানারকম অপচেষ্টা করতে থাকে । উদাহরণ হিসেবে আমি নিজেই কালীগঞ্জে আমার কোলেস্টোরেজ শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সমসাময়িক রাজনৈতিক নেতার ছেলে এবং তার সহযোগীদের দ্বারা নানান রকম চাপের মধ্যে পড়ে প্রচুর পরিমাণে টাকা খরচ করতে বাধ্য হই। ঠিক একই সময়ে হাতিবান্ধা উপজেলায় একটি অটো রাইস মিল করতে যেয়ে সেই সময়কার একজন উদ্যোক্তা জমি কেনার পরেও কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে কারন সেখানকার নেতার অংশীদারী দাবি। আবার লালমনিরহাট জেলায় আজাদ জুটমিল ইন্ডাস্ট্রি কমপ্লেক্সটি সেই সময়কার নেতৃবৃন্দের চাপে পরে  ব্যর্থ হতে বাধ্য হয়। আবার গত মৌসুমী ভাটার সময় তৎকালীন রাজনৈতিক নেতাদের ইট ভাটা গুলোকে ভেঙ্গে দেওয়ার প্রক্রিয়া শিল্প নষ্টের একটি অংশ ছিল বলে মনে হয়। হাতীবান্ধার সিন্দুর মতি এলাকায় ৫ মেগাওয়াট সোলার  প্রকল্প এবং কালিগঞ্জ উপজেলায় ভোটমারী ইউনিয়নে ৩০ মেগাওয়াট সোলার প্রকল্প করতে গিয়ে সরকারি দলকে এবং তাদের সহযোগীদের যে পরিমাণ কে টাকা পয়সা দিতে হয়েছে তাতে এই সমস্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কখনোই লাভজনক করা সম্ভব হবে না । হাতীবান্ধায় সোলার প্রকল্পের এলাকায় মাটি ভরাট করাকে কেন্দ্র করে যে পরিমাণ চাঁদাবাজি এবং ভয় দেখানো হয়েছে শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তারা প্রকল্পটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন । আজ পর্যন্ত সেখানে সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি অথচ সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে হাতীবান্ধা পাটগ্রাম এলাকার বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হতো। সর্বোপরি  ভাবনার বিষয় হলো রাজনৈতিক নেতারা এলাকায় বড় কোন বিনিয়োগ কারীকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে করে ‍ ব্যাংক ও বিভিন্ন বিভাগ গুলোকে প্রভাবিত করে থাকে অর্থাৎ ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়া না দেওয়ার ব্যাপারে তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রভাবিত করে থাকে।

(২) ঋণ প্রাপ্তির সমস্যা-কোন এলাকায় শিল্প কারখানা কিংবা বড় কোনো ব্যবসায় করার জন্য ব্যাংক ঋণের বিকল্প কিছু থাকে না। আর এই ঋণ পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাংকের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । শিল্প কারখানা করার জন্য বিশেষত লিমিটেড কোম্পানি প্রোপ্রাইটরশীপ কোম্পানি অথবা পার্টনারশিপ কোম্পানির দরকার হয়ে থাকে এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনকানুন সম্বন্ধে সংশ্লিষ্ট ব‍াংকের ম‍্যানেরজাদের সম‍্যুখ জ্ঞান থাকতে হয়। কিন্তু অতিব দুঃখের বিষয় যে লালমনিরহাট জেলার ব‍্যাংকের ম্যানেজারদের বেশিরভাগরই ব্যবসা করার জন্য কোম্পানি কিংবা পার্টনারশিপ ব্যবসা সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই । এমনকি তারা লিমিটেড কোম্পানির অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত খুলতেও চায়না। সকল ম্যানেজারদের উদ্দেশ্যে শুধু সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় অফিসে পাঠিয়ে নিরাপদে চাকরি করে জীবন কাটানো। আর কেন্দ্রীয় শাখা বা কেন্দ্র লালমনিহাট জেলার সঞ্চয় গুলোকে কেন্দ্রীভূত করে সেন্ট্রালি ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প ও কারখানায় বিনিয়োগ করে ভালো ব্যবসা করে যাচ্ছে। এতে ম্যানেজাররা নির্ঝঞ্ঝাটে সঞ্চয় সংগ্রহ করে চাকরি করে যাচ্ছে আর কেন্দ্রীয় অফিস সেই সঞ্চয়ের টাকা ঢাকা সহ  দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিনিয়োগ করে লালমনিরহাটকে শিল্প উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করে যাচ্ছে। ম্যানেজারদের অযোগ্যতা অদক্ষতা ,অল্প শিক্ষিত এবং সংকীর্ণ মনোভাব ও আঞ্চলিক উন্নয়নের উদাসীনতা ,দেশপ্রেমের চেয়ে চাকরিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার কারণে তারা বড় বিনিয়োগে অনীহা প্রকাশ করে বা ভয় পায়। অপরপক্ষে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ সেখানকার সঞ্চয়কে নিরাপদে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত থাকে। এছাড়াও লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন ব্যাংকের ম্যানেজারদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা, এজিএমদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা,ডিজিএমদের  ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা ,এমনকি জিএমদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা এত সংকুচিত যে তারা এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। যাহা শিল্প উন্নয়নে একটি বড় বাধা। 

(৩) যোগাযোগের অবস্থাপনা-লালমনিরহাট জেলা থেকে রংপুর কিংবা ঢাকায় যাতায়াতের জন্য তিস্তা নদীর উপর দুইটি সংযোগ সেতু রয়েছে । দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো একটি সংযোগ সেতু সড়ক ও জনপদ বিভাগের অপরটি হল এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সড়ক ও জনপদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিস্তা কাউনিয়া সেতুটি প্রতিবছরেই ইজারা প্রদান করা হয় । এই সেতুটি ইজারা দেওয়ার সময় কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের সংযোগসেতু হিসেবেই ইজারা প্রদান করা হয়। অপরপক্ষে কাকিনা গঙ্গাচড়ার সংযোগ সেতুটি এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনে হওয়ার কারণে বাৎসরিকভাবে কোন ইজারা প্রদান করা হয় না অথচ এ সড়ক ব্যবহার করলে রংপুর ঢাকার যোগাযোগ প্রায় ৮০ কিলোমিটার রাস্তা কমে যায়। এছাড়াও রংপুর বিভাগের পশ্চিমাঞ্চল এবং পঞ্চগড় ও দিনাজপুরের সকল জেলায় যাতায়াতের জন্য প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার রাস্তা কম হয়। ফলে যেকোনো সময় এই রাস্তা ব্যবহার করে শিল্প উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখা সম্ভব হতো। কাকিনা গঙ্গাচড়ার সংযোগ সেতুটি এলজিআরডি মিনিস্ট্রি আওতায় থাকার কারণে সকলের ব্যবহারে কোন বাধা না থাকলেও  কাউনিয়ায তিস্তা সেতুর ইজারাদার গন লালমনিরহাট এবং রংপুর জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা প্রদান করে রাস্তাটি ব্যবহার করা থেকে শিল্প কারখানার মালিকদের বঞ্চিত করে রেখেছে। অবশ্য বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে যে এখানে শুধুমাত্র প্রশাসন জড়িত নহে সংশ্লিষ্ট জেলা সমূহের রাজনৈতিক নেতারাও নিয়মিত ভাবে মাসোহারা পেয়ে থাকে। এই রাস্তাটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার কারণে যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে তার একটি উদাহরণ এখানে সকলের জন্য উন্মুক্ত করা হলো। ধরি ১০ মেট্রিক টন আলু দিনাজপুরে ক্রয়  করে লালমনিরহাটে আনতে গঙ্গাছাড়া মহিপুর ব্রিজ ব্যবহার করলে ভাড়া দাঁড়ায় ১০,০০০/ টাকা মানে কেজি প্রতি ভাড়া ১/টাকা অপরপক্ষে রংপুর হয়ে কাউনিয়া-তিস্তা হয়ে কালীগঞ্জে আনতে ভাড়া পড়ে ২০ হাজার টাকা বা প্রতি কেজি ২/ টাকা অর্থাৎ প্রতি কেজিতে এক টাকা বেশি ভাড়া পরে অথচ যদি ইজারাদার টোলও নিত তাহলে টোল হতো ২০০-৫০০/ টাকা। বিপরীত পক্ষে বিক্রির সময়ও রংপুরে যে দামে পণ্য বিক্রি হয় সেই দামের চেয়ে কালীগঞ্জ পাটগ্রাম হাতীবান্ধায় অনেক কম দামে বিক্রি হয় কারণ রাস্তার খরচ। ফলে স্বাভাবিকভাবে বলা যায় লালমনিরহাট জেলার যে কোন স্থানেই শিল্প-কারখানা করলে পণ্যের পরিবহনে যে খরচ হয় রংপুরের কাছাকাছি করলে সে খরচের চেয়ে অপেক্ষাকৃতভাবে কম হয়। তাই শিল্পে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা লালমনিরহাটের চেয়ে রংপুরকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এতে পিছিয়ে পরছে লালমনিরহাট।

(৪) সড়ক ও রেলপথ-লালমনিরহাট জেলায় শিল্প কারখানা স্থাপনের জন্য অন্যতম বিবেচ‍্য বিষয় গুলোর মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লালমনিরহাট জেলার পন্য পরিবহনের জন্য রয়েছে সরাসরি দুটি পথ। একটি সড়ক অন্যটি রেল। সড়কটির অবস্থা সব সময় বেহাল থাকে আর রেল সব সময় অনির্ধারিত সময়ে চলাচল করে। কথিত আছে যে লালমনিহাট জেলার বাস মালিক সমিতির ও ট্রাক মালিক সমিতির নিকট থেকে মাসিক টাকা গ্রহণ করে রেল কর্তৃপক্ষ রেল চলাচলে অনিয়ম এবং অনির্ধারিত সময় মেইনটেইন করে চলে ফলে রেল পথের ওপর মানুষের বিশ্বাস আস্থা দুটোই রেলের হারিয়ে যায়। আর মহাসড়কটিতে ১৩ টি বাক থাকার কারণে সকল সময় বিপদজনক ও দুর্ঘটনা  প্রবণ এড়িয়া হিসেবে পরিচিত এবং চলাচলের অনুপযুগি । বহুদিন থেকে শোনা যায় এই বুঝি লালমনিরহাট বুড়িমারী সড়কটি ফোর লেনে  উন্নীত হয় কিন্তু প্রকৃত ঘটনা অন্ধকারেই রয়ে গেছে। বাজারে যে কথা  চালু রয়েছে তা হল লালমনিহাট  জেলার রাজনৈতিক নেতাদের টানাটানি প্রতিহিংসা ও লোভ-লালসার এবং ব্যক্তিগত লাভ ক্ষতি হিসাব করে অদ্যবধি রাস্তাটি সরকারের কাছ থেকে পাস করানো সম্ভব হয় নি। যতদিন পর্যন্ত লালমনিরহাট বুড়িমারী সড়কটি মহাসড়কে রূপান্তর না হয় এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি না ঘটে কিংবা রেলের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা না হয় ততদিন পর্যন্ত লালমনিরহাটে শিল্প বিপ্লব ঘটানো অসম্ভব বলে মনে হয়।

লেখক মুহাম্মদ ইয়ার আলী, স্বত্বাধিকারী, আলী ফ্রুটস এন্ড ভেজিটেবলস কোল্ড স্টোরেজ, কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট |

বিজ্ঞাপন