বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

দাদন চক্রে হারিয়ে যাচ্ছে হাওলাদ


প্রকাশ : (১ দিন আগে)
দাদন চক্রে হারিয়ে যাচ্ছে হাওলাদ

মানুষের বিপদে আপদে বন্ধু বান্ধব আত্বীয় স্বজন কিংবা অতি আপনজনদের নিকট থেকে বিনা সুদে ঋন গ্রহণ বা টাকা পয়সা ধার দেওয়া নেওয়ার পদ্ধতির নাম হাওলাদ। ব্যক্তিকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক এ বাস্তবতা এবং আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের ঐতিহ্যবাহী সমাজব্যবস্থার ‘হাওলাদ প্রথা’ আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

এক সময় গ্রামীণ অর্থনীতি ও পারস্পরিক সামাজিক আস্থার এক উজ্জ্বল নিদর্শন ছিল ‘হাওলাদ প্রথা’ (বিনা সুদে বা শর্তহীনভাবে আপৎকালীন ধার নেওয়া ও দেওয়ার নিয়ম) ইসলাম ধর্মে যাকে কর্জে হাসানা বলা হয় । কালের বিবর্তনে গ্রামীণ জীবনের এই সুন্দর চর্চাটি ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধানত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত কিছু কারণ কাজ করেছে: তারমধ্যে সামাজিক পুঁজি ও পারস্পরিক আস্থার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অতীতে গ্রামের মানুষ একে অপরের প্রতি গভীর বিশ্বাস রাখতেন। সমাজের ঘনিষ্ঠ বন্ধন বা সামাজিক আস্থার ওপর ভিত্তি করেই হাওলাদ চলত।আধুনিকায়ন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনোভাব বৃদ্ধির ফলে সেই যৌথ মানসিকতা ও পারস্পরিক আস্থা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। অপরদিকে অর্থনৈতিক চাপ ও মুদ্রাস্ফীতি কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মানুষের হাতে কোনো অলস বা অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত নগদ অর্থ রাখার প্রবণতা কমেছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, ভবিষ্যৎ সঞ্চয় এবং জরুরি তহবিলের বাড়তি চাহিদার কারণে পরিচিত কাউকে নিঃশর্তে বড় অঙ্কের অর্থ হাওলাদ দেওয়া সাধারণ মানুষের জন্য আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানিক ঋণ ও এনজিওর কার্যক্রমের বিস্তার লাভের কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (NGO) বা গ্রামীণ ব্যাংক এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ফলে মানুষ এখন ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর না করে নির্দিষ্ট নিয়ম ও কিস্তির ভিত্তিতে ঋণ নেওয়াকে বেশি ভালো মনে করে এর সঙ্গে যুক্ত পরছে। এদিকে বর্তমানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ও ডিজিটাল লোন যেমন বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো সেবার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ‘ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ’ এবং ব্যাংকিং সুবিধা সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ অনানুষ্ঠানিক ধার নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আগের মতো অনুভব করে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অলিখিত বা মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে হাওলাদ নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে টাকা ফেরত না দেওয়া বা টালবাহানা করার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করেছে। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বাঁচতে অনেকেই পরিচিত মহলে অর্থ ধার দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। ইদানীংকালে মানুষের মানবিকতা হ্রাস পাচ্ছে আর বাণিজ্যিক মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে ফলে বিনা সুদে বিনিয়োগ না করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় চড়া সুদে দাদন ব্যবসা বা ঋণ দেওয়ার অপ্রাতিষ্ঠানিক বাজার শক্তিশালী হয়েছে । যার কারণে কেউই আর বিনা লাভে অর্থ ফেলে না রেখে সুদে খাটানো বা লাভজনক কোনো খাতে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

এতে গ্রামের অসহায় দরিদ্র মানুষ গুলো দাদন ব্যবসা কিংবা চড়া সুদের চক্রে জড়িয়ে নিঃস্ব হচ্ছে আর দাদন ব্যবসায়ীরা সমাজকে চুষে খাচ্ছে।

লেখক : স্বত্বাধিকারী, আলীবাবা থিম পার্ক

বিজ্ঞাপন