মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

লালমনিরহাটে ১৫০ কোটি টাকার মাদক নিরাময় কেন্দ্র -আমরা কি আরও বড় কিছু চাইতে পারি না?


প্রকাশ : (৯ ঘন্টা আগে)
লালমনিরহাটে ১৫০ কোটি টাকার মাদক নিরাময় কেন্দ্র -আমরা কি আরও বড় কিছু চাইতে পারি না?

লালমনিরহাটে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র ও হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগের কথা আমরা জেনেছি। ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী এ উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। এমন জনদরদী উদ্যোগের জন্য আমাদের মন্ত্রী মহোদয়কে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা !! 

সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে মাদক নিয়ন্ত্রণ, মাদকাসক্ত মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। একজন মাদকাসক্ত মানুষও আমাদের সমাজের বাইরে নন; তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অধিকার রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো -১৫০ কোটি টাকার এই বিনিয়োগকে আমরা আরও বৃহত্তর জনস্বার্থে ব্যবহার করতে পারি কি না।
আমার বিনীত প্রস্তাব, শুধু একটি স্বতন্ত্র মাদক নিরাময় কেন্দ্র নয় -এখানে একটি আধুনিক, পূর্ণাঙ্গ জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হোক, যার অন্যতম শক্তিশালী ও বিশেষায়িত বিভাগ হবে মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন।

অর্থাৎ মাদক চিকিৎসার প্রয়োজনকে অস্বীকার নয়; বরং মাদক চিকিৎসাকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা।

কেন এই প্রস্তাব?

কারণ লালমনিরহাটের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনও কম নয়। সরকারি ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী লালমনিরহাট জেলার জনসংখ্যা ১৪ লাখ ২৮ হাজারের বেশি। অন্যদিকে আমাদের বর্তমান ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতালের সরকারি ওয়েবসাইটে চিকিৎসক ও নার্সসহ বিভিন্ন পদে কর্মরত জনবলের তথ্য রয়েছে; অর্থাৎ হাসপাতালের সক্ষমতা ও জনবল -দুটিকেই আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

আমাদের দরিদ্র মানুষকে একটি ভালো চিকিৎসা পেতে কেন রংপুর, বগুড়া কিংবা ঢাকার দিকে ছুটতে হবে?

একজন কৃষক, একজন দিনমজুর, একজন রিকশাচালক, একজন নিম্নআয়ের মা -তাঁদের কাছে দূরের শহরে চিকিৎসা মানে শুধু হাসপাতালের খরচ নয়; যাতায়াত, থাকা, খাবার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কর্মদিবস হারানোরও বিশাল বোঝা। সুতরাং ১৫০ কোটি টাকার মতো একটি বড় বিনিয়োগ যদি এমন একটি হাসপাতালে করা হয়, যেখানে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি মাদকাসক্তি চিকিৎসার একটি আন্তর্জাতিক মানের বিভাগ থাকে -তাহলে একই টাকা থেকে আমরা অনেক বড় সামাজিক সুফল পেতে পারি।

আর এই হাসপাতাল শুধু লালমনিরহাটের জন্যই নয়।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলার মানুষও ভৌগোলিকভাবে সরাসরি উপকৃত হতে পারেন। সরকারি ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী এই তিন উপজেলার জনসংখ্যা যথাক্রমে প্রায় ১.৮৭ লাখ, ৪.৪৫ লাখ ও ২.৫৬ লাখ। অর্থাৎ লালমনিরহাটের ১৪.২৮ লাখ মানুষের সঙ্গে এই তিন উপজেলার প্রায় ৮.৮৭ লাখ মানুষ যোগ করলে সম্ভাব্য সেবা-পরিধি দাঁড়ায় প্রায় ২৪ থেকে ২৬ লাখ মানুষ।

একটি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করার সুযোগ আমরা কি হাতছাড়া করতে পারি?

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন -মাদক প্রতিরোধে আমরা আসলে কতটা সফল?

আমরা বছরের পর বছর মাদকবিরোধী সভা করি।
স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান হয়।
ব্যানার হয়, আলোচনা হয়, শপথ হয়, মানববন্ধন হয়।
কিন্তু এরপর?

এসব কার্যক্রমের ফলাফল কী? কতজন শিক্ষার্থী প্রকৃতভাবে উপকৃত হলো? কোন প্রতিষ্ঠান কী উদ্যোগ নিল? কতজন ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করা হলো? তাদের পরবর্তী সময়ে কী কাউন্সেলিং দেওয়া হলো? কতটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালাচ্ছে? এসবের ফলাফলভিত্তিক, স্বচ্ছ ও নিয়মিত মনিটরিং এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর -এ প্রশ্ন করতেই হয়। কারণ শুধু অনুষ্ঠান করলেই মাদক প্রতিরোধ হয় না। মাদক প্রতিরোধের কার্যক্রম যদি কাগজে-কলমে, ছবি তোলা আর প্রতিবেদন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি প্রকৃত প্রতিরোধ নয়।

জেলার সকল কমিটির সভাপতি ডিসি, উপজেলার সকল কমিটির সভাপতি ইউ এন ও -এই কন্সেপ্ট এর কার্যকারিতা নিয়ে ভাবতে হবে !! 

আমার ভাষাটা হয়তো একটু কঠিন শোনাবে, কিন্তু বাস্তবতা নিয়ে আমাদের কঠিন প্রশ্ন করতেই হবে।

সচেতনতা কার্যক্রমের সঙ্গে ফলাফল পরিমাপ করতে হবে। প্রতিটি স্কুল-কলেজে মাদক প্রতিরোধ কার্যক্রমের বার্ষিক পরিকল্পনা থাকতে পারে। প্রশিক্ষিত শিক্ষক/কাউন্সেলর থাকতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য গোপনীয় কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকতে পারে। অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ত্রৈমাসিক মনিটরিং হতে পারে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ -কাজের ফলাফল প্রকাশ্যভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। সমাজে অনেক অভিজ্ঞ, অবসরি, উদ্যোগী মানুষ রয়েছেন যাঁদেরকে কাজে লাগানো যেতে পারে। 

সরকারি প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যেই মাদকবিরোধী জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়টি রয়েছে। তাই মাদক প্রতিরোধকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না।
এটি একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবার, কর্মসংস্থান, খেলাধুলা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়।

তাই আমার দাবি-
মাদক নিরাময় কেন্দ্রের বিরোধিতা নয়। বরং সরকারের কাছে আমার অনুরোধ - ১৫০ কোটি টাকার প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করে এটিকে একটি সমন্বিত আধুনিক হাসপাতাল ও মাদক চিকিৎসা-পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক। যেখানে থাকবে -

▪️ উন্নত জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা
▪️ মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগ
▪️ নারী ও প্রসূতি সেবা
▪️ শিশু চিকিৎসা
▪️ হৃদরোগসহ প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা
▪️ আধুনিক ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা
▪️ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
▪️ মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন বিভাগ
▪️ পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিং
▪️ তরুণদের জন্য প্রতিরোধমূলক কাউন্সেলিং
▪️ মাদক প্রতিরোধ বিষয়ে গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক কর্মসূচি।

এমন একটি হাসপাতাল হলে আমরা মাদকাসক্ত মানুষকে চিকিৎসা দিতে পারব, আবার একই সঙ্গে লাখ লাখ সাধারণ মানুষকেও স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারব।
এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা চাই না লালমনিরহাটের পরিচয় হোক -“এটি মাদকে সয়লাব একটি জেলা, তাই এখানে মাদক হাসপাতাল করা হয়েছে।”

আমরা চাই লালমনিরহাট পরিচিত হোক 
একটি উন্নত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে।
একটি মাদক প্রতিরোধের মডেল জেলা হিসেবে।
একটি শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জেলা হিসেবে।
একটি কৃষি ও সীমান্ত অর্থনীতির সম্ভাবনাময় জেলা হিসেবে।

একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র নির্মাণ নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু একটি জেলার উন্নয়নকে শুধু একটি সমস্যার চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একই বিনিয়োগকে বহুমাত্রিক জনকল্যাণে কাজে লাগানোই কি বেশি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নয়?

আমরা এমন একটি প্রকল্প চাই, যার সুফল শুধু আজকের জন্য নয় -আগামী ৩০/৪০ বছর ধরে লালমনিরহাট ও আশপাশের মানুষের কাজে আসবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের কাছে বিনীত আবেদন 
লালমনিরহাটে ১৫০ কোটি টাকার এই বিনিয়োগকে আরও বড় করে দেখুন।

মাদক চিকিৎসা হোক।
মাদক প্রতিরোধ হোক।
সাধারণ মানুষের চিকিৎসাও নিশ্চিত হোক।
একই প্রকল্পে যদি এই তিনটি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়, তাহলে সেটিই হবে প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব ও দূরদর্শী উন্নয়ন।

লালমনিরহাট মাদকমুক্ত হতে চায় 
কিন্তু একই সঙ্গে লালমনিরহাট সুস্থও হতে চায়।
আমরা কোনো প্রকল্পের বিরোধিতা করছি না।
আমরা চাই ১৫০ কোটি টাকার প্রকল্পটি যেন লালমনিরহাটের মানুষের জন্য আরও বড় আশীর্বাদ হয়ে আসে।

লেখক : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোঃ নেয়ামুল ইসলাম ফাতেমী, বীর প্রতীক

বিজ্ঞাপন