বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন খুব বেশি কিছু নয়। একজন কৃষক চান তাঁর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম, একজন শ্রমিক চান নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সম্মানজনক মজুরি, একজন ব্যবসায়ী চান ঘুষ ও অযথা হয়রানি ছাড়া ব্যবসা করার সুযোগ, একজন তরুণ চান মানসম্মত শিক্ষা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান, একজন মা চান তাঁর সন্তান নিরাপদে স্কুলে যাক এবং সুস্থভাবে ঘরে ফিরুক, একজন নারী চান রাস্তা, কর্মস্থল ও গণপরিবহনে নিরাপদ জীবন, আর একজন অসুস্থ মানুষ চান হাসপাতালে গিয়ে দালালের দ্বারস্থ না হয়ে চিকিৎসা পেতে। এগুলো কোনো বিশেষ শ্রেণির দাবি নয়; একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্রে এগুলো নাগরিকের ন্যায্য অধিকার। তাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কে ক্ষমতায় থাকবে তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, রাষ্ট্রকে কীভাবে এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে এবং নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে জীবন গড়তে পারে।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অনেক দূর এগিয়েছে। কৃষি, শিল্প, রপ্তানি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, প্রবাসী আয় এবং মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। এই অর্জনকে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু উন্নয়ন কোনো একদিনে শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। সময়ের সঙ্গে নতুন সমস্যা আসে, নতুন সুযোগ আসে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিকেও সেই অনুযায়ী উন্নত করতে হয়। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ, রাজস্ব, দুর্নীতি, বিচারব্যবস্থা, জননিরাপত্তা, শিক্ষার মান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতের সংস্কার, সুশাসন, কর্মসংস্থান ও দুর্যোগ সহনশীলতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। অতএব এখন প্রয়োজন পরস্পরকে দোষারোপ করার চেয়ে রাষ্ট্রের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ধীরে, স্থিরভাবে এবং সম্মিলিতভাবে শক্ত করা।
সবচেয়ে আগে একটি পার্থক্য পরিষ্কার করা দরকার—সরকার ও রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। সরকার পরিবর্তন হবে, রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে ও যাবে; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থায়ী ও পেশাদার হতে হবে। একজন সরকারি কর্মকর্তা আজ যে সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করছে, আগামীকাল অন্য সরকার এলেও তাঁর দায়িত্ব ও পেশাগত মর্যাদা যেন একই থাকে। পুলিশ যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করে। বিচারক যেন বিচার করতে গিয়ে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে। একজন নাগরিক যেন নিজের অধিকার পাওয়ার জন্য কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির পরিচয়ের প্রয়োজন অনুভব না করে। রাষ্ট্রের এই নিরপেক্ষতা যত শক্ত হবে, ক্ষমতার পরিবর্তন তত কম ভয় সৃষ্টি করবে।
রাষ্ট্রের শক্তি হবে আইন, প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহি
রাষ্ট্র সংস্কার মানে অতীতের সবকিছুকে অস্বীকার করা নয়। প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ কাজ করে। তাঁদের মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা রক্ষা করেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে। লক্ষ্য হবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সৎ মানুষ সৎ থাকার জন্য অসহায় বোধ করবে না এবং অন্যায় করতে চাইলে সহজ পথ পাবে না।
দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে ঘুষ বন্ধ করা কঠিন। বরং এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে ঘুষ দেওয়ার প্রয়োজনই কমে যায়। জন্মনিবন্ধন, ভূমি, কর, লাইসেন্স, সরকারি অনুমোদন, ভাতা কিংবা অন্যান্য নাগরিক সেবা—যেখানে সম্ভব, সেগুলোকে সহজ, অনলাইনভিত্তিক ও সময়সীমাবদ্ধ করা দরকার। একজন নাগরিক যেন জানতে পারে তাঁর আবেদন কোথায় আছে, কার কাছে আছে, কতদিন ধরে আছে এবং বিলম্ব হলে তার কারণ কী। সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও কোন প্রতিষ্ঠান কত টাকায় কী কিনল, কাজটি কে পেল এবং কাজ কতদূর এগোল—এসব তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করা যেতে পারে। প্রযুক্তি তখন শুধু মানুষের সময় বাঁচাবে না, দুর্নীতির সুযোগও কমাবে।
তবে প্রযুক্তি একা দুর্নীতি বন্ধ করতে পারবে না। তার সঙ্গে প্রয়োজন স্বাধীন নিরীক্ষা, কার্যকর তদন্ত, সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব, সরকারি ক্রয়ে কঠোর নিয়ম এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি। দুর্নীতির অভিযোগ যেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার অস্ত্র না হয়, আবার ক্ষমতাবান কাউকে রক্ষা করার উপায়ও না হয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিপদের সময় সাধারণ মানুষ প্রথমে পুলিশের কাছেই সাহায্য চায়। তাই পুলিশকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, জনবল ও পেশাগত মর্যাদা দিতে হবে এবং একই সঙ্গে জবাবদিহির আওতায় রাখতে হবে। থানায় অভিযোগ গ্রহণে অনীহা, তদন্তে অযথা বিলম্ব কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির জন্য আলাদা আচরণের সুযোগ কমাতে হবে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাফল্য শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা দিয়ে বিচার না করে, কতটি অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত হয়েছে, কতজন ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেয়েছে এবং জনগণের আস্থা কতটা বেড়েছে—এসব দিয়েও মূল্যায়ন করা উচিত।
দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ক্ষেত্রেও পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বের সুস্পষ্ট সীমারেখা থাকা জরুরি। সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা দেশের নিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। তাঁদের দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের মর্যাদা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি তাঁদের দায়িত্বকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরে পেশাগত ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে রাখতে হবে। এতে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বাড়বে এবং জনগণের আস্থাও দৃঢ় হবে।
বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও মূল কথা হলো—বিচার শুধু হতে হবে না, সময়মতো হতে হবে। বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মামলার জট কমানো, বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, বিচারপ্রার্থীদের সহজ তথ্য দেওয়া, আইনি সহায়তা শক্তিশালী করা এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্বের কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং প্রকৃত অপরাধের বিচার যেন ক্ষমতা, পরিচয় বা প্রভাবের কারণে থেমে না যায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে একটি নীতি রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা দরকার—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এর অর্থ প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, পুলিশ কর্মকর্তা, সেনাসদস্য কিংবা সাধারণ নাগরিক—অভিযোগ উঠলে সবার জন্য ন্যায়সংগত আইনি প্রক্রিয়া থাকবে। অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হয়ে যাবে না; আবার পদমর্যাদার কারণে কেউ তদন্তের বাইরে থাকবে না। স্বাধীন তদন্ত, প্রমাণ এবং আদালতের সিদ্ধান্তই হবে শেষ কথা। এমন রাষ্ট্রে ক্ষমতাবানও নিরাপদ থাকে, কারণ তিনি জানেন যে তাঁকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের ভিত্তিতে নয়, আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বিচার করা হবে। আর সাধারণ মানুষও আস্থা পাবে যে ক্ষমতা অন্যায়ের স্থায়ী ঢাল নয়।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও আইনের শাসন ও জবাবদিহি প্রয়োজন। ব্যাংক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধা নেওয়ার জায়গা হতে পারে না। আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে পেশাগত মানদণ্ড, খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল ব্যাংককে প্রয়োজন হলে পুনর্গঠন করতে হবে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। ব্যবসার ক্ষেত্রেও নিয়ম সহজ ও স্বচ্ছ করা জরুরি। একজন উদ্যোক্তা যেন ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় অনুমোদন, ঘুষ কিংবা দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে না পড়ে। সৎভাবে ব্যবসা করা যত সহজ হবে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তত বাড়বে।
দেশের উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখতে হবে কৃষক, শ্রমিক ও তরুণদের। কৃষককে শুধু সহায়তা পাওয়ার মানুষ হিসেবে নয়, আধুনিক উৎপাদক ও উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে হবে। উন্নত বীজ, সেচ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মাটির তথ্য, সংরক্ষণাগার, পরিবহন, বাজারসংযোগ এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। কৃষক যেন উৎপাদনের পর বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি না করে, সে জন্য উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিকের নিরাপত্তা, দক্ষতা, ন্যায্য মজুরি ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশকে উৎপাদনের বিরোধী নয়, উৎপাদনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুনভাবে ভাবতে হবে। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করানো যথেষ্ট নয়; শিক্ষা এমন হতে হবে যাতে একজন তরুণ বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করতে পারে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে নিজের কর্মসংস্থানের পথও তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কারিগরি দক্ষতা, আর্থিক জ্ঞান, ভাষা, সমস্যা সমাধান ও উদ্যোক্তা হওয়ার শিক্ষা আরও গুরুত্ব পেতে হবে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে আধুনিক দক্ষতা প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা দরকার। বাংলাদেশের তরুণরা যেন দেশের পাশাপাশি বিশ্বের কর্মবাজারেও দক্ষতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে, সেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
নারীর নিরাপত্তা একটি আলাদা সামাজিক বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতার পরীক্ষা। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন, রাস্তা কিংবা অনলাইনে হয়রানির বিরুদ্ধে সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীর পরিচয় সুরক্ষা, দ্রুত তদন্ত এবং প্রমাণিত অপরাধের বিচার প্রয়োজন। একই সঙ্গে সমাজের মানসিকতাতেও পরিবর্তন দরকার। হয়রানির শিকার নারীকে সন্দেহ না করে অপরাধীর দায় নির্ধারণ করতে হবে। নারী নিরাপদ হলে পরিবার নিরাপদ হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং দেশের অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়।
বাংলাদেশের জন্য দুর্যোগ মোকাবিলাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন কিংবা জলাবদ্ধতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়; কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব। আগাম সতর্কতা, আধুনিক বাঁধ, নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা, শহরের খাল ও জলাধার রক্ষা, দুর্যোগ-সহনশীল ঘরবাড়ি এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত উদ্ধারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। উপগ্রহের তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পূর্বাভাস উন্নত করা যেতে পারে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বিজ্ঞান ও পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই হবে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার পথ।
উন্নয়নের শেষ মাপকাঠি হবে মানুষের জীবন
দেশের উন্নয়নের হিসাবও নতুনভাবে করা দরকার। শুধু অর্থনীতির আকার বাড়লেই মানুষের জীবন ভালো হয়েছে—এমন ধারণা যথেষ্ট নয়। প্রতি বছর জনগণের সামনে একটি সহজ জনগণের রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ করা যেতে পারে। সেখানে থাকবে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অপরাধ, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, সরকারি সেবার সময়, দুর্নীতির অভিযোগ, বিশুদ্ধ পানি, পরিবেশ এবং দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির মতো সূচক। এতে সরকার নিজের কাজের মূল্যায়নের একটি পরিষ্কার কাঠামো পাবে এবং জনগণও নির্বাচনের সময় শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কাজের বাস্তব ফলাফল বিচার করতে পারবে।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ এবং তা থাকবেই। সরকার ও বিরোধী দল থাকবে, মতভেদ থাকবে, কঠিন বিতর্কও হবে। কিন্তু কিছু বিষয়কে দলীয় প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। আইনের শাসন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, পেশাদার প্রশাসন ও পুলিশ, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, যুব কর্মসংস্থান এবং দুর্যোগ মোকাবিলা—এসব কোনো দলের একার সম্পত্তি নয়। সরকার বদলালেই যেন দেশের দীর্ঘমেয়াদি নীতি আবার শূন্য থেকে শুরু না হয়, সে জন্য এসব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন।
তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন আছে, নাগরিকের দায়িত্বও তেমন আছে। আমরা যদি ঘুষ না দেওয়ার চেষ্টা করি, আইন মানি, কর দিই, গুজব ছড়ানোর আগে তথ্য যাচাই করি, অন্যের অধিকারকে সম্মান করি এবং অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে না নিই, তবে রাষ্ট্রের ওপরও একটি ইতিবাচক চাপ তৈরি হয়। একইভাবে ব্যবসায়ী, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক সদস্য, শ্রমিক, কৃষক—প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে রাষ্ট্রের ভিত শক্ত হয়।
বাংলাদেশকে কোনো এক ব্যক্তি, কোনো এক দল কিংবা কোনো এক সরকারের হাতে তুলে দিয়ে উন্নত করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র গড়ে ওঠে প্রতিষ্ঠান দিয়ে, প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে মানুষের আস্থায় এবং আস্থা তৈরি হয় ন্যায়সংগত আচরণে। তাই আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ক্ষমতা কার হাতে থাকবে তা নয়; ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার সীমা কোথায় থাকবে এবং নাগরিকের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে—এই প্রশ্নগুলোর স্থায়ী উত্তর তৈরি করা।
আমরা জানি না আগামী দিনে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, কোন দল সরকার পরিচালনা করবে কিংবা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে বদলাবে। কিন্তু আমরা আজই ঠিক করতে পারি, আগামী প্রজন্মের জন্য কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই।
এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবে, তরুণ যোগ্যতা দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়বে, ব্যবসায়ী নিয়ম মেনে এগোতে পারবে, নারী নিরাপদে চলবে, শিশু নিশ্চিন্তে বড় হবে, পুলিশ আইন মেনে জনগণের পাশে থাকবে, বিচারপ্রার্থী সময়মতো ন্যায়বিচার পাবে এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তি জানবেন—তাঁর ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেই ক্ষমতারও একটি সীমা আছে। সেই সীমার নাম আইন।
আর সেই আইনের অধীনে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হবে কোনো দলের নয়, কোনো ব্যক্তির নয়—বাংলাদেশের নাগরিক।
এই লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়। কিন্তু একটি দেশের বড় পরিবর্তন সব সময় বড় কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় না। কখনো তা শুরু হয় একটি সাধারণ উপলব্ধি থেকে—আমরা পরস্পরকে পরাজিত করার জন্য নয়, একটি ভালো রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য কাজ করব।
বাংলাদেশের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তাই ক্ষমতার লড়াইকে ছোট করে রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নটিকে বড় করা। এটি কোনো দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে লেখা নয়। এটি সেই সাধারণ মানুষের পক্ষে, যিনি শান্তিতে কাজ করতে চায়, ন্যায্য অধিকার চায় এবং তাঁর সন্তানকে নিজের চেয়ে ভালো একটি বাংলাদেশ দিয়ে যেতে চায়।
লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষকঃ হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান
ইতিহাসের দায় শোধ - মোহাম্মদ ইয়ার আলী
২ সপ্তাহ আগে