শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

এল নিনো: ভবিষ্যতের ঝুঁকি, আজকের সিদ্ধান্ত


প্রকাশ : (৫ ঘন্টা আগে)
এল নিনো: ভবিষ্যতের ঝুঁকি, আজকের সিদ্ধান্ত

প্রকৃতির সব সতর্কবার্তার শব্দ হয় না। কিছু বিপদ আসে নদীর ফুলে ওঠা পানি নিয়ে, কিছু আসে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস হয়ে। আবার কিছু পরিবর্তন এত ধীরে ঘটে যে মানুষ তার উপস্থিতি টের পায় তখনই, যখন তার প্রভাব জীবন ও অর্থনীতির নানা স্তরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এল নিনো (El Niño) সেই ধরনেরই একটি ঘটনা। এটি কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়; বরং পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার এমন একটি পরিবর্তন, যার অভিঘাত বহু দেশ, বহু অর্থনীতি এবং কোটি মানুষের জীবনে একযোগে প্রতিফলিত হতে পারে।

বাংলাদেশে এল নিনো নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তা আবহাওয়ার খবরের গণ্ডি পেরোয়। কখনো বলা হয়, তাপমাত্রা বাড়তে পারে। কখনো আশঙ্কা করা হয়, বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে। তারপর অন্য কোনো ঘটনায় জনআলোচনার কেন্দ্র বদলে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি বিষয় যদি কৃষি, পানি, বিদ্যুৎ, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতিকে একসঙ্গে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে, তাহলে তাকে কি কেবল মৌসুমি সংবাদ হিসেবে দেখাই যথেষ্ট? সম্ভবত নয়।

এল নিনো নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, এটি যেন নিজেই একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাস্তবে তা নয়। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহের একটি স্বাভাবিক পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন। কিন্তু পৃথিবীর জলবায়ু একটি আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা, তাই প্রশান্ত মহাসাগরের এই পরিবর্তনের প্রভাব হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশগুলোর ঋতুচক্রেও প্রতিফলিত হতে পারে। কোথাও বৃষ্টিপাত কমে, কোথাও অতিবৃষ্টি হয়, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ দেখা দেয়। অর্থাৎ এল নিনো কোনো নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের নাম নয়; এটি ঝুঁকির ধরন ও মাত্রা বদলে দিতে পারে।

এই পার্থক্যটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উন্নয়নের সাফল্য যতই দৃশ্যমান হোক না কেন, তার একটি বড় ভিত্তি এখনো প্রকৃতিনির্ভর। কৃষি উৎপাদন, পানির প্রাপ্যতা, মৎস্যসম্পদ, এমনকি বিদ্যুতের চাহিদা—সবকিছুর সঙ্গেই ঋতুচক্রের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জলবায়ুর সামান্য অস্বাভাবিকতাও অনেক সময় এমন একটি প্রভাব তৈরি করে, যার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

গত এক দশকে বাংলাদেশের আবহাওয়ার দিকে তাকালেই পরিবর্তনের সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘ তাপপ্রবাহ এখন আর বিরল ঘটনা নয়। কোথাও বৃষ্টিপাতের সময় বদলেছে, কোথাও খরার প্রকোপ বেড়েছে, আবার কোথাও অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব পরিবর্তনের প্রতিটির জন্য এল নিনোকে এককভাবে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হবে না, কেননা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, নগরায়ণ, বনভূমি ও জলাধারের সংকোচন—সবকিছু মিলিয়েই আজকের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তবে এটাও সত্য, এল নিনোর মতো জলবায়ুগত প্রক্রিয়া এই বিদ্যমান ঝুঁকিগুলোকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

এই কারণেই এল নিনোকে শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নীতিনির্ধারণেরও বিষয়। একটি দেশের উন্নয়ন কেবল সড়ক, সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; সেই উন্নয়ন পরিবর্তিত জলবায়ুর চাপ কতটা সহ্য করতে পারবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ুর বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়, তা হয়তো বর্তমানের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার সামনে টেকসই থাকে না।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখন একটি প্রশ্ন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আমরা কি এখনো জলবায়ুগত ঝুঁকিকে মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখব, নাকি উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে নিয়ে আসব? প্রশ্নটি শুধু পরিবেশের নয়; এটি অর্থনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তারও প্রশ্ন।

কৃষির কথাই ধরা যাক। স্বাধীনতার পর খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা নিঃসন্দেহে দেশের উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। একসময় যে দেশ খাদ্যঘাটতির প্রতীক ছিল, আজ সেই দেশ অনেক ক্ষেত্রেই আত্মনির্ভরতার সক্ষমতা দেখিয়েছে। কিন্তু এই অর্জনের পেছনে একটি নীরব শর্ত কাজ করে—প্রকৃতির একটি ন্যূনতম স্থিতিশীলতা। সেই স্থিতিশীলতাই যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, তখন খাদ্যনিরাপত্তার হিসাবও নতুন করে করতে হবে।

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব কৃষিতে একদিনে দৃশ্যমান হয় না। কখনো দীর্ঘ তাপপ্রবাহ ধানের ফলন কমিয়ে দেয়, কখনো অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বীজতলা নষ্ট করে, কখনো পানির সংকটে সেচের ব্যয় বেড়ে যায়। প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে হয়তো খুব বড় মনে হয় না, কিন্তু এসব ছোট ছোট পরিবর্তনের সমষ্টিই শেষ পর্যন্ত উৎপাদন, বাজার এবং মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলে।

এই সম্পর্কটি আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। কৃষকের ক্ষতি কেবল কৃষকের ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎপাদন কমলে বাজারে সরবরাহ কমে, খাদ্যের দাম বাড়ে, আমদানির প্রয়োজন সৃষ্টি হয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে। অর্থাৎ মাঠে যে সংকটের শুরু, তা ধীরে ধীরে জাতীয় অর্থনীতির সংকটে রূপ নিতে পারে। জলবায়ুর অভিঘাত তাই পরিবেশের নয়, অর্থনীতিরও প্রশ্ন।

পানির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। বাংলাদেশকে আমরা নদীমাতৃক দেশ বলি, কিন্তু এই পরিচয় পুরো চিত্র তুলে ধরে না। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বহু দিনের বাস্তবতা। উপকূলে লবণাক্ততার বিস্তার কৃষি ও সুপেয় পানির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও অনেক এলাকায় ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। কোনো বছরে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম হলে এই বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে পানি ব্যবস্থাপনা এখন আর শুধু সেচের বিষয় নয়; এটি খাদ্য, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিরও বিষয়।

বিদ্যুৎ খাতেও একই ধরনের পরিবর্তন স্পষ্ট। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও দ্রুত বাড়ে। ঘর থেকে কারখানা, সবখানেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এর ফলে উৎপাদন বাড়াতে হয়, জ্বালানি আমদানির চাপ বাড়ে, ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ একটি তাপপ্রবাহ কেবল আবহাওয়ার ঘটনা নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।

নগরজীবনও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা অন্যান্য বড় শহরে কংক্রিটের বিস্তার, গাছপালা কমে যাওয়া এবং জলাধার ভরাটের ফলে 'আরবান হিট আইল্যান্ড' বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব আরও তীব্র হচ্ছে। ফলে একই তাপমাত্রা গ্রাম ও শহরে সমানভাবে অনুভূত হয় না। খোলা আকাশের নিচে কাজ করা নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, পরিবহনকর্মী কিংবা পথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই এর সবচেয়ে বড় মূল্য দেন। জলবায়ুর অভিঘাত তাই সবার জন্য সমান নয়; সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষই সাধারণত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

এখানেই উন্নয়ন নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দেয়। আমরা উন্নয়নকে প্রায়ই দৃশ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখি—নতুন সড়ক, সেতু, উড়ালসড়ক বা বিদ্যুৎকেন্দ্র। কিন্তু পরিবর্তিত জলবায়ুর বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: এই অবকাঠামো কি আগামী ত্রিশ বা চল্লিশ বছরের জলবায়ুগত চাপ মোকাবিলা করতে পারবে?

যদি উত্তর অনিশ্চিত হয়, তবে উন্নয়নের সংজ্ঞাও নতুন করে ভাবতে হবে।

টেকসই উন্নয়ন মানে শুধু নতুন কিছু নির্মাণ করা নয়; বরং এমনভাবে নির্মাণ করা, যাতে তা ভবিষ্যতের ঝুঁকিও মোকাবিলা করতে পারে। কৃষিতে জলবায়ু-সহনশীল জাত, শহরে সবুজ উন্মুক্ত স্থান, পানি সংরক্ষণ, আগাম সতর্কবার্তা, গবেষণা এবং বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা—এসব আর আলাদা আলাদা বিষয় নয়। এগুলো একই উন্নয়ন দর্শনের অংশ।

এ কারণেই এল নিনোকে কেবল আবহাওয়ার খবর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের উন্নয়ন ভাবনার একটি পরীক্ষাও বটে। আমরা কি এখনো অতীতের অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করব, নাকি পরিবর্তিত বাস্তবতাকে সামনে রেখে নতুন সিদ্ধান্ত নেব?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, ভবিষ্যতের জলবায়ুগত অনিশ্চয়তার মুখে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত থাকবে।

লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষকঃ হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান
[email protected]

বিজ্ঞাপন