সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য
/ মতামত

স্মরণে বাবলা: সংবাদপথের এক নির্ভীক পথিকের বিদায়


প্রকাশ :

রংপুরের সাংবাদিক সমাজ এক নিবেদিতপ্রাণ সহযোদ্ধাকে হারাল। সিনিয়র সাংবাদিক, দৈনিক প্রথম খবর-এর নির্বাহী সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবলা আর নেই। শনিবার (১১ জুলাই) সকালে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগলেও শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে ছিলেন নিবিড়ভাবে যুক্ত।

বাবলার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, রংপুরের সংবাদমাধ্যমেরও অপূরণীয় ক্ষতি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি যে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সংবাদপত্রের জগতে কাজ করেছেন, তা তাঁকে উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকতার এক পরিচিত ও সম্মানিত মুখে পরিণত করেছিল। রংপুরে তাঁর পরিচয় ছিল একটিই—"বাবলা"। নামের চেয়ে পরিচিতি ছিল তাঁর কাজ, সততা ও মানবিকতায়।

তৌহিদুল ইসলাম বাবলার জন্ম ১৯৬৩ সালের ১০ আগস্ট নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বড়ভিটার মেলাবড় গ্রামে। শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে নানাবাড়িতে। পরে রংপুর শহরে এসে লেখাপড়া করেন। রংপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং রংপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। জীবিকার প্রয়োজনে ১৯৮১ সালে সোনালী ব্যাংকে চাকরিতে যোগ দিলেও সেই চাকরি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ব্যাংক কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে হাজারো কর্মচারীর সঙ্গে তিনিও চাকরি হারান।

এই ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অনেকে যেখানে ভেঙে পড়তেন, সেখানে বাবলা নতুন পথ বেছে নেন। টিউশনি, মুদ্রণশিল্পে কাজ এবং উচ্চশিক্ষা—সবকিছু একসঙ্গে চালিয়ে তিনি নিজের জীবনসংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। একই সময়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত হন। শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলা, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তাঁর সক্রিয় অবস্থান ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝেছিলেন, সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে সংবাদপত্র। সেই বিশ্বাস থেকেই সাংবাদিকতাকে তিনি আজীবনের পেশা হিসেবে বেছে নেন।

১৯৮৮ সালে ঢাকায় এসে সাংবাদিক শেখ কল্লোল আহমেদের হাত ধরে সাপ্তাহিক খবরের কাগজ-এ প্রুফরিডার হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। এরপর আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, লালসবুজ এবং মিডিয়া সিন্ডিকেট-এ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে তিনি ধীরে ধীরে একজন দক্ষ প্রতিবেদক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০০০ সালে রংপুরে ফিরে এসে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকতাকে নতুনভাবে সমৃদ্ধ করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। দৈনিক রংপুর, দৈনিক দাবানল, দৈনিক বাহের সংবাদ, দৈনিক প্রথম খবর এবং জাতীয় দৈনিকের রংপুর বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি আঞ্চলিক সাংবাদিকতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রথম খবর-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সংবাদ সংগ্রহে তাঁর নিষ্ঠা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সংবাদ শুধু তথ্য নয়; এটি মানুষের জীবন, সমাজ ও সময়ের দলিল। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাইয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের তিনি শুধু কাজ শেখাতেন না, শেখাতেন পেশাগত নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

বাবলা ছিলেন সংগঠকও। রিপোর্টার্স ক্লাব রংপুর প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক গণমাধ্যমের বিকাশে তিনি নীরবে কাজ করে গেছেন। জীবনের শেষ পর্যায়েও সামাজিক ও গণতান্ত্রিক নানা উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল অব্যাহত।তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন আন্দোলনে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। 

তাঁর মৃত্যুর খবরে রংপুর প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ক্লাব, সিটি প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন, রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, টিসিএ রংপুর, অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, মাহিগঞ্জ প্রেসক্লাব, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদসহ অসংখ্য সাংবাদিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। এটি প্রমাণ করে, ব্যক্তি বাবলার চেয়ে তাঁর কর্মজীবনের প্রভাব ছিল অনেক বড়।

আজকের সময়ে সাংবাদিকতা নানা ধরনের চাপ, বিভাজন ও চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে। এই বাস্তবতায় তৌহিদুল ইসলাম বাবলার মতো মানুষের জীবন নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়—সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি ক্ষমতার নৈকট্যে নয়, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতায়; ব্যক্তিগত সুবিধায় নয়, জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারে।

একজন সাংবাদিক চলে গেলে তাঁর ডেস্ক খালি হয়, কলম থেমে যায়; কিন্তু তিনি যদি সততা, সাহস ও মানবিকতার উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেন, তবে তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর সহকর্মীদের স্মৃতিতে, শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণায় এবং সমাজের ইতিহাসে।

তৌহিদুল ইসলাম বাবলা সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি জনমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক নিরন্তর অঙ্গীকার।

তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা।

লেখক: নজরুল ইসলাম হক্কানী, সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ইটাকুমারী শিবচন্দ্র রায় কলেজ, পীরগাছা।