সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ মতামত

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : উত্তরের হৃদয়ে জাগ্রত স্বপ্ন তিস্তা মহাপরিকল্পনা


প্রকাশ :

একসময় হোয়াংহো বা পীত নদীকে বলা হতো “চীনের দুঃখ”। প্রায় প্রতি বছর ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন ও গতিপথ পরিবর্তনের কারণে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হতো। অন্যদিকে এশিয়ার দীর্ঘতম নদী ইয়াংসি ছিল বিপুল সম্ভাবনার আধার, কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত বন্যা ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে সেই সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটছিল না।

আজ সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। হোয়াংহো এখন কৃষি, শিল্প ও আঞ্চলিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি, আর ইয়াংসি পরিণত হয়েছে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে। এই রূপান্তর কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ফল।

বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিস্তা অববাহিকাও বছরের একটি সময়ে পানির সংকট এবং অন্য সময়ে বন্যা ও নদীভাঙনের দ্বৈত সংকটে আক্রান্ত। উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের কৃষি, অর্থনীতি ও জীবন-জীবিকা দীর্ঘদিন ধরে এই অনিশ্চয়তার মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। ফলে তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

চীনের উন্নয়ন মডেলের মূল শক্তি ছিল নদীকে শুধু পানি প্রবাহ হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে বিবেচনা করা। নদীকেন্দ্রিক পরিকল্পনার সঙ্গে কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ, নৌপরিবহন, পর্যটন, নগরায়ণ ও পরিবেশ সংরক্ষণকে এক সুতোয় গেঁথে তারা নদীকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

বিশেষ করে ইয়াংসি নদীর ওপর নির্মিত থ্রি গর্জেস প্রকল্প শুধু একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়; এটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নৌপরিবহন, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির সমন্বিত উন্নয়নের একটি সফল উদাহরণ। একইভাবে হোয়াংহো অববাহিকায় ড্রেজিং, নদীশাসন, জলাধার নির্মাণ এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শতাব্দীপ্রাচীন সংকট অনেকাংশে কাটিয়ে উঠেছে চীন।

তিস্তা নদীর ভৌগোলিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও এর উন্নয়ন দর্শন একই হতে পারে। তিস্তা এবং এর ২৫টি শাখা, উপনদী ও প্রশাখাকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, মৎস্য, পর্যটন, নৌপরিবহন, শিল্পায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার লক্ষ্যও কেবল নদী খনন বা বাঁধ নির্মাণ নয়; বরং পানি সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, নদীশাসন, শাখা নদীগুলোকে জলাধারে রূপান্তর, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, পুনর্বাসন, মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং নদীভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়ন।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার চায়নার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় পরিচালিত সমীক্ষার হালনাগাদ প্রতিবেদন ইতোমধ্যে সরকারের কাছে জমা হয়েছে। চীনও প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই উত্তরাঞ্চলের মানুষ আশা করেছিল, সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি বা বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা হবে।

যদিও দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে তিস্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তবুও বাস্তবায়নের জন্য এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি বা সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। এতে উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ না হলেও আশার দ্বার বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং কূটনৈতিক আলোচনাকে দ্রুত বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

অনেক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও নদী প্রকৌশলীর মতে, নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যে দেশই সহযোগিতা করুক না কেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজস্বভাবেই নিতে হবে।

তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। সংগঠনটির মতে, যদি কোনো ভূরাজনৈতিক জটিলতা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে পদ্মা সেতুর মতো জাতীয় অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিজস্ব অর্থায়ন কিংবা আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। কারণ পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্পেও বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তিগত ও নির্মাণ সহযোগিতা ছিল; তিস্তা মহাপরিকল্পনার ক্ষেত্রেও তেমন বহুপক্ষীয় সহযোগিতা সম্ভব।

চীনের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—নদীকে অবহেলা করলে তা দুর্যোগ সৃষ্টি করে, আর বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই নদীই জাতীয় সমৃদ্ধির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। হোয়াংহো ও ইয়াংসির ইতিহাস তাই শুধু চীনের সাফল্যের গল্প নয়; এটি তিস্তার ভবিষ্যতেরও সম্ভাবনার দিকনির্দেশনা।

এখন সময় এসেছে তিস্তাকে অবহেলার নদী থেকে সম্ভাবনার নদীতে রূপান্তর করার। কারণ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন মানে শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তি, উন্নয়ন বৈষম্য নিরসন, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন, কৃষির আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশের টেকসই অগ্রযাত্রার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। চীন সফর সেই প্রত্যাশাকে আরও উজ্জীবিত করেছে। এখন উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের একটাই প্রত্যাশা—আলোচনা নয়, তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের দৃশ্যমান সূচনা। সেই ঐতিহাসিক সূচনার কাজটি শুরু করতে হবে সরকারকে।সরকারকে এক্ষুনি যা করতে হবে তা হলো;একনেক সভায় প্রকল্প অনুমোদন এবং সময়বদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণা। সম্প্রতি তিন মন্ত্রী তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শনে এসে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

চীন সফরের মধ্যে দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বোঝা পড়ার যে মঞ্চ তৈরি হয়েছে তাকে নিপুণ কৌশলে কাজে লাগাতে হবে।এটিই উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের প্রত্যাশা। হৃদয় জুড়ে তাদের একটাই শ্লোগান " জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই "।

লেখক: নজরুল ইসলাম হক্কানী,  সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ। ইমেইল :nazrul.hakkani@gmail. com