বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ মতামত

প্রথমেই বুঝুন - "পুরুষত্ব" মানে কী?


প্রকাশ :

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পুরুষত্ব মানে শুধু যৌন সক্ষমতা নয়।পুরুষত্ব মানে- টেস্টোস্টেরন হরমোনের সঠিক মাত্রা, শুক্রাণুর গুণগত মান, যৌন আকাঙ্ক্ষা, ইরেকশন ক্ষমতা এবং সন্তান জন্মদানের সামর্থ্য - এই পাঁচটির সমষ্টি।

এর যেকোনো একটি বিঘ্নিত হলেই পুরুষ অনুভব করেন — "কিছু একটা ঠিক নেই।"এবং দুঃখজনক সত্য হলো — বিশ্বজুড়ে গত ৫০ বছরে পুরুষের গড় টেস্টোস্টেরন মাত্রা প্রায় ৩০% কমে গেছে।

কারণ ১ — দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ (Chronic Stress)এটি একক সবচেয়ে বড় কারণ — যেটা নিয়ে মানুষ সবচেয়ে কম কথা বলেন।যখন মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে থাকেন, তখন শরীর কর্টিসল নামক হরমোন উৎপন্ন করে।কর্টিসল এবং টেস্টোস্টেরন — এই দুটো হরমোন একে অপরের শত্রু।কর্টিসল বাড়লে টেস্টোস্টেরন কমে — এটা শরীরের নিয়ম।

চাকরির চাপ, পারিবারিক সমস্যা, অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন — এগুলো ধীরে ধীরে পুরুষের হরমোনকে ধ্বংস করছে। অথচ মানুষ ভাবছেন, এটা "স্বাভাবিক জীবনযাপন।"

কারণ ২ — ঘুমের ঘাটতি (Sleep Deprivation)

রাতে ঠিকমতো না ঘুমানো মানে শুধু ক্লান্তি নয় — রাতের ঘুমের সময়, বিশেষত গভীর ঘুমের (Deep Sleep) পর্যায়ে শরীর সবচেয়ে বেশি টেস্টোস্টেরন তৈরি করে।

গবেষণা বলছে, মাত্র এক সপ্তাহ ৫ ঘণ্টা করে ঘুমালে একজন তরুণ পুরুষের টেস্টোস্টেরন ১০–১৫ বছর বয়স্ক পুরুষের সমান নেমে আসে।

রাত জেগে মোবাইল, সিরিজ, ইউটিউব — এই অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে পুরুষকে ভেতর থেকে দুর্বল করছে।

কারণ ৩ — স্থূলতা ও পেটের চর্বি (Obesity & Visceral Fat) পেটের ভেতরের চর্বি (Visceral Fat) কেবল ওজন বাড়ায় না —এই চর্বি অ্যারোমাটেজ নামক এনজাইম তৈরি করে, যা টেস্টোস্টেরনকে ইস্ট্রোজেনে (মেয়েদের হরমোন) রূপান্তরিত করে। অর্থাৎ, পুরুষের পেট যত বড় হয়,তার পুরুষ হরমোন তত কমে,মেয়েলি হরমোন তত বাড়ে। এটাই কারণ — মোটা পুরুষদের অনেকের বুকে চর্বি জমে, যৌন আগ্রহ কমে, এবং পুরুষত্ব হ্রাস পায়।

কারণ ৪ — পর্নোগ্রাফি ও অতিরিক্ত হস্তমৈথুন এটি বর্তমান প্রজন্মের একটি নীরব মহামারি। মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক রাসায়নিক আনন্দের অনুভূতি দেয়।পর্নোগ্রাফি মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমকে এতটাই অতিউদ্দীপিত করে যে — বাস্তব সম্পর্কে মস্তিষ্ক আর সাড়া দিতে পারে না।

ফলে সৃষ্টি হয় Porn-Induced Erectile Dysfunction (PIED) — যেখানে শরীরে টেস্টোস্টেরন থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে ইরেকশন হয় না।এটা হরমোনের সমস্যা নয়, এটা মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমের সমস্যা।

কারণ ৫ — পরিবেশগত বিষ (Endocrine Disruptors),এটি সবচেয়ে আলোচিত না হওয়া কারণগুলোর একটি।আমাদের চারপাশে এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ আছে যা সরাসরি হরমোন সিস্টেমকে বিঘ্নিত করে —প্লাস্টিকের বোতল ও পাত্রে থাকা BPA (Bisphenol-A)কীটনাশকযুক্ত শাকসবজি ও ফলপ্রসাধনী পণ্যে থাকাপ্যারাবেনও ফথালেট

ফাস্টফুডের প্যাকেজিংএগুলো শরীরে ঢুকে ইস্ট্রোজেনের মতো আচরণ করে এবং টেস্টোস্টেরন উৎপাদনে বাধা দেয়।গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে খাওয়া, বোতলের পানি — এই অভ্যাসগুলো চুপচাপ ক্ষতি করে যাচ্ছে।

কারণ ৬ — শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা (Physical Inactivity)মানবশরীর পরিশ্রমের জন্য তৈরি। নিয়মিত ব্যায়াম — বিশেষত ওজন তোলা (Resistance Training) — টেস্টোস্টেরন উৎপাদনের সবচেয়ে প্রাকৃতিক উপায়। কিন্তু আধুনিক জীবনে অফিসে বসে কাজ, বাড়িতে শুয়ে-বসে থাকা, হাঁটার পরিবর্তে রিকশা — এই জীবনযাপন পুরুষের হরমোনকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করছে।

কারণ ৭ — অপুষ্টি ও ভুল খাদ্যাভ্যাস টেস্টোস্টেরন তৈরির জন্য শরীরের দরকার — জিংক → সামুদ্রিক মাছ, কুমড়ার বিচি, ডাল ভিটামিন ডি → সূর্যের আলো, ডিম, কলিজা ম্যাগনেসিয়াম → বাদাম, শাকস্বাস্থ্যকর ফ্যাট → দেশি মাছ, অলিভ অয়েলকিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ পুরুষের খাদ্যতালিকা —

অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত শর্করা (সাদা ভাত-রুটি), প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড।এই খাদ্যাভ্যাসে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, যা সরাসরি টেস্টোস্টেরন কমায়।

কারণ ৮ — ধূমপান ও মদ্যপান ধূমপান শুক্রাণুর DNA ক্ষতি করে, শুক্রাণুর সংখ্যা ও গতিশীলতা কমায়।অ্যালকোহল সরাসরি Leydig Cell ধ্বংস করে — যে কোষগুলো অণ্ডকোষে টেস্টোস্টেরন তৈরি করে।এর মানে হলো — মদপানকারী পুরুষের শরীর নিজেই নিজের টেস্টোস্টেরন কারখানা ভেঙে ফেলছে।

কারণ ৯ — দীর্ঘমেয়াদী রোগ ও ওষুধ কিছু রোগ সরাসরি পুরুষত্ব নষ্ট করে — ডায়াবেটিস — রক্তনালী ও স্নায়ু উভয়কেই ক্ষতি করেউচ্চ রক্তচাপ — রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয় থাইরয়েড সমস্যা — হরমোন ব্যালেন্স বিঘ্নিত করে Varicocele — অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে শুক্রাণু ধ্বংস করে।এছাড়া কিছু ওষুধও পুরুষত্বে প্রভাব ফেলে —নির্দিষ্ট অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, স্টেরয়েড।

কারণ ১০ — বয়সের সাথে স্বাভাবিক হ্রাস (Age-Related Decline)৩০ বছর বয়সের পর থেকে প্রতি বছর প্রায় ১% হারে টেস্টোস্টেরন কমে — এটা স্বাভাবিক।কিন্তু আধুনিক জীবনযাপনের কারণে এই হ্রাস অনেক বেশি দ্রুত হচ্ছে এবং অনেক কম বয়সে শুরু হচ্ছে।২০-২৫ বছরের তরুণদের মধ্যেও এখন পুরুষত্বের সমস্যা দেখা যাচ্ছে — যা আগের প্রজন্মে ছিল অকল্পনীয়।

 সর্বশেষে বলতে চাই, পুরুষত্বের সমস্যা লজ্জার বিষয় নয়, চিকিৎসার বিষয়।কিন্তু বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান ওষুধে নয় —জীবনযাত্রার পরিবর্তনে।

নিয়মিত আল্লাহর সান্নিধ্যে থাকার চেষ্টা করা। ঘুম ঠিক করুন।খাবার ঠিক করুন।মানসিক চাপ কমান।শরীর নাড়ান। এই ৫ টি কাজ যদি একজন পুরুষ ৯০ দিন ধারাবাহিকভাবে করেন —ফলাফল নিজেই অনুভব করবেন।