বাংলাদেশের কৃষি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, খরা, লবণাক্ততা ও পানিসংকট; অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্যের অভাব, কৃষিজমি হ্রাস এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সংকোচন—সব মিলিয়ে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি গভীর চাপে রয়েছে। উত্তরের তিস্তা অববাহিকা থেকে দক্ষিণের পদ্মা তীর, হাওর থেকে চলন বিল কিংবা ভবদহ—সব অঞ্চলেই কৃষকের সংকটের ধরন ভিন্ন হলেও মূল সমস্যা একই: কৃষি ও পানিসম্পদের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং কৃষক উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও মূল্যশৃঙ্খলের সবচেয়ে দুর্বল অংশে অবস্থান করছেন।
এই বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি নয়া কৃষি আন্দোলন—যে আন্দোলন শুধু ফসল উৎপাদনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পানি, নদী, জমি, সমবায়, প্রযুক্তি, বাজার ও গ্রামীণ শিল্পায়নকে একসূত্রে গেঁথে কৃষিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে। এটি হবে কৃষিকে ভর্তুকিনির্ভর খাত থেকে উৎপাদনশীল, লাভজনক ও টেকসই অর্থনীতিতে রূপান্তরের আন্দোলন।
উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি জীবন, জীবিকা এবং কৃষি অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ। শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি না আসায় তিস্তার বিস্তীর্ণ এলাকা আজ কার্যত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। কৃষকরা সেচের অভাবে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন করতে পারছেন না, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, নদীর নাব্যতা কমছে এবং চরাঞ্চলের দারিদ্র্য আরও গভীর হচ্ছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নদী পুনঃখনন, আধুনিক সেচব্যবস্থা, নদীতীর সংরক্ষণ এবং আন্তঃনদী সংযোগের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের কৃষিকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, নদীকে যদি কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং অর্থনৈতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তাহলে কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও আঞ্চলিক উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
একসময় হোয়াংহো বা পীত নদীকে বলা হতো "চীনের দুঃখ"। ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনের জন্য কুখ্যাত সেই নদীকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পানি নিয়ন্ত্রণ, নদী পুনর্বিন্যাস এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন আজ উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত করেছে। একইভাবে ইয়াংসি নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষি, শিল্প ও নৌপরিবহন করিডোর। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, নদীকে বাঁচানো মানেই কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়; বরং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও একই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পদ্মা ও তার শাখানদীগুলোর প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা বেড়েছে। ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা হাজারো কৃষক পরিবারের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা, নদী পুনঃখনন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি, মৎস্য, ফল, সবজি ও জলজ সম্পদভিত্তিক নতুন অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।
হাওর অঞ্চল ও চলন বিল বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু আগাম বন্যা, অপরিকল্পিত বাঁধ, নদী ভরাট ও যোগাযোগ সংকটের কারণে এখানকার কৃষকরা প্রতিবছর ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই এসব অঞ্চলে মৌসুমি ধানচাষের পাশাপাশি সমবায়ভিত্তিক মৎস্যচাষ, হাঁস পালন, ভাসমান কৃষি, জলজ সম্পদ উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, একই সঙ্গে সারা বছর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কৃষির সবচেয়ে বড় সংস্কার হতে পারে সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা। বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকের জমি ছোট ও খণ্ডিত। ফলে আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার, উন্নত বীজ সংগ্রহ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা বাজারজাতকরণ—সব ক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে থাকেন। বিচ্ছিন্ন কৃষককে সংগঠিত অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার কার্যকর পথ হলো আধুনিক সমবায়।
চীনের কৃষি উন্নয়নের একটি বড় ভিত্তি হলো কৃষকদের সংগঠিত উৎপাদন ও সেবাভিত্তিক সমবায়। ক্ষুদ্র কৃষক যৌথভাবে কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করেন, মানসম্মত বীজ ও প্রযুক্তি গ্রহণ করেন, এমনকি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বাজারেও প্রবেশ করেন। ফলে উৎপাদন খরচ কমে এবং কৃষকের আয় বাড়ে।
ভিয়েতনাম কৃষি সংস্কারের পর সমবায় ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজায়। আজ সেখানে সমবায় শুধু উৎপাদনের সংগঠন নয়; এটি কৃষকের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, রপ্তানি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার ব্যবস্থারও প্রধান অংশীদার। একসময় খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চাল, কফি ও জলজ পণ্য রপ্তানিকারক—যার পেছনে সংগঠিত কৃষি ব্যবস্থার বড় অবদান রয়েছে।
ভারতের দুগ্ধ খাতে আমুল সমবায় বিশ্বজুড়ে একটি সফল মডেল। কয়েকজন ক্ষুদ্র দুগ্ধ উৎপাদকের উদ্যোগ থেকে শুরু হয়ে আজ এটি লাখো কৃষকের মালিকানাধীন একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। একইভাবে কৃষক উৎপাদক সংগঠন (FPO) ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে নতুন শক্তি দিয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষক যখন সংগঠিত হন, তখন তাঁর দরকষাকষির ক্ষমতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
ইউরোপের নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কে সমবায়ভিত্তিক কৃষি শুধু উৎপাদন নয়; গবেষণা, প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষক সমবায় কৃষিঋণ, বীমা, বিপণন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও কৃষির স্থায়িত্ব বজায় রেখেছে। অর্থাৎ বিশ্বের অভিজ্ঞতা একটাই—ক্ষুদ্র কৃষক একা দুর্বল, কিন্তু সংগঠিত কৃষকই জাতীয় অর্থনীতির শক্তি।
বাংলাদেশেরও ইতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে। "মিল্ক ভিটা" সমবায় দেখিয়েছে, ক্ষুদ্র উৎপাদকদের সংগঠিত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এখন সময় এসেছে সেই অভিজ্ঞতাকে দুগ্ধের বাইরে ধান, সবজি, ফল, মৎস্য, পোলট্রি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিস্তৃত করার।
কৃষি শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে কৃষকের আয় বাড়বে না। কৃষির সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংযোগ ঘটাতে হবে। আলু থেকে চিপস, টমেটো থেকে সস, দুধ থেকে দুগ্ধজাত পণ্য, ভুট্টা থেকে পশুখাদ্য, মাছ থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য—এভাবে মূল্য সংযোজনভিত্তিক গ্রামীণ শিল্প গড়ে উঠলে কৃষক কাঁচামালের উৎপাদক নয়, মূল্য সৃষ্টির অংশীদার হবেন।
তিস্তা থেকে পদ্মা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে যদি কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে ওঠে, তবে নদী, কৃষি, শিল্প, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি হবে। এতে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য কমবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং গ্রাম থেকে শহরে অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের চাপও হ্রাস পাবে।
এই নয়া কৃষি আন্দোলন কেবল সরকারের প্রকল্প দিয়ে সফল হবে না; এতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, কৃষি বিভাগ, কৃষক সমিতি, সমবায় সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিটি অঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি, কৃষি সমবায় এবং কৃষিপণ্য বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি গড়ে তোলা গেলে কৃষক নিজেই উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশীদার হবেন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের প্রশ্নে কৃষিকে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। নদী ও জলাভূমিকে ধ্বংস করে নয়, বরং সেগুলোকে কেন্দ্র করে কৃষি ও অর্থনীতির পুনর্গঠন করতে হবে। তিস্তা থেকে পদ্মা—এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে যদি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সমবায়ভিত্তিক কৃষি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়, তবে একটি শক্তিশালী নয়া কৃষি আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে উঠবে। সেই আন্দোলন শুধু কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে না; বরং বাংলাদেশকে খাদ্য, পানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নতুন যুগে প্রবেশ করাবে।
আজ প্রয়োজন কৃষিকে কেবল একটি উৎপাদন খাত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন, আঞ্চলিক ভারসাম্য, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে দেখা। তিস্তা থেকে পদ্মার এই নতুন কৃষি দর্শন বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন শক্তি পাবে, আর কৃষক হবেন উন্নয়নের প্রকৃত অংশীদার। (লেখক : নজরুল ইসলাম হক্কানী)