যুদ্ধ কিংবা বিপ্লবে সেনাবাহিনী হউক, পুলিশ হউক, ছাত্র হউক, শিশু হউক, জনতা হউক যাহারাই মরিয়া যায়, তাহারা কেহই ব্যক্তিগত স্বার্থ লাভের আশায় মারা যায় না। কেহ চাকরি বা পেশাগত দায়িত্ব পালন করিতে আবার কেহ দেশের মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে লড়াই করিতে গিয়া আহত কিংবা নিহত হইয়া থাকে। ইতিহাসে আহত নিহতদের তেমন কোন নাম লেখা হয় না কিন্তু যাহার বাঁ যাহাদের হুকুমে তাহারা আহত বা নিহত হইয়া থাকে তাহাকেই বা তাহাদের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। তাই ইতিহাসে পরাজিত শক্তি অপরাধী হিসাবে এবং বিজিত শক্তি হিরো হিসাবে গন্য হইয়া থাকে। যুদ্ধে যাহারা আহত বা নিহত হন তাহারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে ইতিহাসের বিবেচনায় হুকুম দাতাদের বিচার কিংবা অনুশোচনা কেন করা উচিৎ সেই বিষয়ে আলোচনাই এখানে তুলিয়া ধরা হইল।
সাধারণত যুদ্ধে যাহারা জয়ী হন তাহাদের পক্ষেই ইতিহাস লিখিত হয়ে থাকে অপরদিকে পরাজিতদের পক্ষে ইতিহাসে ভাল কোন লিখা হয় না। যুদ্ধে কিংবা বিদ্রোহে কেহ রাজার হুকুম মান্য করিয়া ঘৃনিত হন আর কেহ রাজার হুকুম অমান্য করিয়া হিরো হিসাবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হইয়া থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা হইল উভয়ই দেশ প্রেমিক। অপরাধী শুধু হুকুম দাতা। হুকুম দাতা তাহার নীজ স্বার্থ রক্ষায় অপরাধের হুকুম দিয়া থাকে। ইতিহাসে একই ব্যক্তি বা গ্রুপ কখনো দেশদ্রোহী কখনো বা দেশপ্রেমিক হইয়া থাকে। যুদ্ধে পরাজিত হইলে দেশদ্রোহী আর যুদ্ধে বিজয়ী হইলে দেশ প্রেমিক হইয়া ইতিহাসের পাতায় লিখিত হইয়া থাকে। কিন্তু স্থান কাল পাত্রভেদে একই ব্যক্তি বিভিন্ন রূপে ইতিহাসের পাতায় চিত্রিত হইতে পারে। মন ১৯৭১ সালে তৎকালীন বিদ্যমান পাকিস্তান সরকারের পক্ষ লইয়া যাহারা যুদ্ধ করিয়াছেন অথবা যাহারা তাহাদিগকে সহযোগিতা করিয়াছেন তাহারা পরাজিত বরনের কারনে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর হইতে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হইয়া আসিতেছে।
যে অপরপক্ষে তৎকালীন সময়ে পাকিস্তান সরকারের বিপক্ষে মুক্তিযুদ্ধে। অংশগ্রহণ করিয়া যাহারা যুদ্ধ করিয়াছেন তাহারা বিজিত হইবার কারনে ঐ তারিখের পর হইতে দেশপ্রেমিক হিসেবে গণ্য হইয়া আসিতেছে। ঐ দিগে বিদ্যমান সরকারের পক্ষে এবং বিপক্ষে যুদ্ধ করিতে গিয়া বহু জনগণ, সেনা, পুলিশ, সরকারের বহু স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শিশু মহিলা আহত নিহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিলেন যাহারা কেহই ব্যক্তিগত স্বার্থে মৃত্যুবরণ করেন নাই। রাজা বা হুকুম দাতাদের স্বার্থেই ক্ষতিগ্রস্থ হইয়াছিলেন। অর্থাৎ বিদ্যমান সরকার বা বিরোধী দলীয় নেতাদের নির্দেশ পালন করিতে গিয়া তাহারা নিহত হইয়াছেন অথবা আহত হইয়াছেন।
১৯৭১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের গোটা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতা প্রাপ্তির দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা কায়দায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু করিয়াছিল। সেই যুদ্ধে যদি আওয়ামী লীগ পরাজিত হইত তাহা হইলে তৎকালীন বিদ্যমান পাকিস্তান সরকারের ইতিহাসের খাতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশদ্রোহী হিসাবে লিপিবদ্ধ থাকিত। সৌভাগ্য ক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সেই সময় ভারতের সহযোগিতায় বিজিত হইবার কারণে পাকিস্তানের সরকার এবং তাহাদের সহযোগিতা কারীদেরকে পাকিস্তানপন্থী কিংবা পাকিস্তানের পক্ষের শক্তিকে দেশদ্রোহী হিসাবে আখ্যায়িত করিয়া চলিয়াছে। পরাজিত শক্তির পক্ষের সরকার প্রধান ও তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ পাকিস্থানে পালিয়ে গিয়াছে আর কেহ কেহ স্বাধীন বাংলাদেশে থাকিয়া দেশদ্রোহীর দায়ভার বহন করিয়া চলিতেছে। যেখানে সেখানে তাহারা এই দায়ভারের অপমান সহ্য করিয়া বাঁচিয়ে থাকিতেছে। বিজয়ীদের ইতিহাস তাহাদেরকে দেশদ্রোহী হিসাবে চিহ্নিত করিয়া রাখিয়াছে। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ইতিহাসে পাকিস্তানের তৎকালীন সরকারের পক্ষের শক্তি ১৯৭১সালের ১৬ই ডিসেম্বর তারিখের পর হইতে দেশদ্রোহী হিসাবে গন্য এবং তৎকালীন সরকারের বিরোধী শক্তি যাহারা ভারতীয় শক্তির সহোযোগী ছিল তাহারা (আওয়ামী লীগ) দেশপ্রেমিক হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রহিয়াছে।
কালের পরিক্রমায় সময়ের বিবেচনায় ২০২৪ সালের তৎকালীন বিদ্যমান সরকার তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের হুকুম মান্য করিয়া যাহারা তাহাদের পক্ষ লইয়া বিপ্লবের বিপক্ষে লড়াই করিয়াছে এবং পরাজিত হইয়াছে, তাহারা পরাজিত শক্তি বা ভারতীয় পক্ষের শক্তি কিংবা ফ্যাসিস্ট শক্তি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় দেশদ্রোহী হিসাবে লিখিত হইয়াছে। অবশ্য তাহার প্রমান হিসেবে তাহারা সকলেই ভারতের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করিয়া নিশ্চিন্ত মনে নিরাপদে সেখানে বসবাস শুরু করিয়া নিজেরাই নিজেদের কে ভারতীয় পক্ষের শক্তি হিসেবে প্রমাণিত করিয়াছে।
অপরপক্ষে ২০২৪ সালে বিপ্লবের পক্ষের শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির নিষিদ্ধ থাকিবার কারনে গুপ্ত বিপ্লবী রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য ইসলামী সংগঠনের সহযোগিতা গ্রহণকারী হিসেবে কাজ করিয়াছে এবং বিজিত হইয়াছে সেহেতু তাহারা বিপ্লবের পক্ষের শক্তি হিসাবে ইতিহাসের পাতায় দেশপ্রেমিকের ঘরে নাম লিখিয়াছে। ফলে ১৯৭১ সালের বিজিত শক্তি ২০২৪ সালে বিপ্লবের বিপক্ষে শক্তি হিসাবে বা দেশদ্রোহী হিসাবে ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হইয়াছে।
মাঝখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যেমন ১৯৭১ সালের পাকিস্তান পন্থী ও বাংলাদেশ পন্থীর মিশ্রনে যেমন (পাকিস্তান পন্থী শাহ আজিজুর রহমান খান এ সবুর ও মশিউর রহমান যাদু মিয়া আর বাংলাদেশ পন্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, কর্নেল অলি ও মেজর হাফিজ) সাহেবদের মিশ্রনে গঠিত হয়েছিল তাই তাহাদের যেমন দলীয় পরিচয়ে ১৯৭১ সালের দোষ গুনের কোন দায় ভার ছিল না তেমনি ২০২৪ সালেও নাই। কারন ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট তাহাদের দলের সেক্রেটারি জেনারেল জনাব ফকরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব সাংবাদিকদের সামনে বিপ্লবের সাথে সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করিয়া দলকে ভারমুক্ত করিয়াছেন।
এবারেও তাহাদের দল বিপ্লবের পক্ষ বিপক্ষ শক্তির সমন্বয়ে পরিচালিত হইতেছে বিধায় এক্ষেত্রেও তাহাদের কোন দায় ভার নাই। তবে বিপ্লবের সকল সুযোগ সুবিধা এর পুর্বেও যেমন নিয়াছিলেন এখনো নিতেছেন। সেই কারনে তাহারা দলীয় ভাবে শুধু সুবিধা ভোগী হিসাবে ইতিহাসে জায়গা দখল করিয়া নিয়াছে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যাহারা ১৯৭১ সালে তৎকালীন বিদ্যমান পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতাকারী হিসেবে ৫৪ বছর ধরিয়া ইতিহাসের পাতায় দেশদ্রোহীর দায়ভার বহন করিয়া যখন আসিতেছিল ঠিক সেই মুহূর্তে ২০২৪ সালে কিন্তু তাহারাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তি হিসাবে সক্রীয় থাকায় ইতিহাসের পাতায় এখন দেশপ্রেমিক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত হইয়াছে অপরপক্ষের ভারতীয় মদদ পুষ্ট শক্তি হিসাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশদ্রোহী শক্তি হিসাবে বিবেচিত হইতেছে। অর্থাৎ সময়ই একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কিংবা দলকে বিভিন্নরুপে চিহ্নিত করিয়া ইতিহাসে নাম লিপিবদ্ধ করিয়া থাকে। এইভাবে পালাক্রমে ইতিহাসের দায়ভার বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হইতে থাকে।
অপরদিকে প্রতিটি বিপ্লব কিংবা যুদ্ধে বিজয়ী শক্তি ও পরাজিত শক্তি উভয় পক্ষের মধ্যে যাহারা আত্মত্যাগ করিয়া থাকে বা নিহিত হইয়া যায় কিংবা আহত হইয়া জীবন ভর কষ্ট করিতে থাকে, ইতিহাস তাহাদেরকে কখনোই মনে রাখেনা বা মনে করে না।ইতিহাস শুধু তাহাদের মনে রাখে যাহারা হুকুম প্রদান করিয়া থাকে অথবা বিপ্লব সংগঠিত করিয়া থাকে।
লালমনিরহাট: কোচবিহারের রাজ্য থেকে মুঘল সীমান্ত, অতঃপর ব্রিটিশ প্রশাসন -এক জনপদের দীর্ঘ ইতিহাস
২ সপ্তাহ আগে
রতন সরকার: তিস্তার জনপদের এক চারণ সাংবাদিক
৩ সপ্তাহ আগে
স্মরণে বাবলা: সংবাদপথের এক নির্ভীক পথিকের বিদায়
৩ সপ্তাহ আগে