মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য
/ মতামত

রতন সরকার: তিস্তার জনপদের এক চারণ সাংবাদিক


প্রকাশ :

আজ সাংবাদিক রতন সরকারের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। সময়ের হিসাবে তিন বছর কেটে গেছে, কিন্তু উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকতা, তিস্তা অববাহিকার মানুষের অধিকার আন্দোলন এবং নদীকেন্দ্রিক জনস্বার্থের প্রশ্নে তাঁর রেখে যাওয়া শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি। তিনি শুধু একজন টেলিভিশন সাংবাদিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের সাংবাদিক, মাঠের সাংবাদিক এবং তিস্তা অববাহিকার মানুষের সুখ-দুঃখের বিশ্বস্ত ভাষ্যকার। তাঁর ক্যামেরা যেমন সংবাদ ধারণ করত, তেমনি তাঁর বিবেক ধারণ করত অবহেলিত জনপদের দীর্ঘশ্বাস।

২০২৩ সালের ১৩ জুলাই গভীর রাতে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রতন সরকারের জীবনাবসান ঘটে। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তাঁর চলে যাওয়া ছিল রংপুরের সাংবাদিক সমাজের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, মৃত্যুর দিনও তিনি ব্যক্তিগত কোনো কাজে নয়, তিস্তা অববাহিকার মানুষের দাবি-দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সকালে তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিলেন। বিকেলে রংপুরে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাতেই তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। যেন মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পথেই তিনি বিদায় নিলেন।

রতন সরকারের সাংবাদিকতা শুরু হয় ১৯৯৪ সালে নীলফামারী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নীলসাগর পত্রিকায়। এরপর তিনি দৈনিক করতোয়া, পরিবেশ, বিজলী, দাবানল ও সংবাদে কাজ করেন। পরে এটিএন বাংলা, সিএসবি, এটিএন নিউজ হয়ে সময় টেলিভিশনের রংপুর ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রকৃত সাংবাদিকতার শক্তি বড় অফিসে নয়, মানুষের আস্থায়।

তিনি ছিলেন মাঠের মানুষ। কোনো ঘটনা ঘটার অপেক্ষায় বসে থাকতেন না; ঘটনাস্থলে ছুটে যেতেন। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো পরিবার, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ফসলহারা কৃষক, আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত চরাঞ্চলের মানুষ কিংবা প্রশাসনের অবহেলায় বঞ্চিত সাধারণ নাগরিক—এসব মানুষই ছিল তাঁর সংবাদজগতের মূল চরিত্র। তাই তাঁর প্রতিবেদনে কেবল তথ্য থাকত না, থাকত মানুষের জীবনসংগ্রামের বাস্তব ছবি।

প্রয়াত সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনকে আমরা চারণ সাংবাদিক বলি। কারণ তিনি বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে মানুষের কথা তুলে ধরেছিলেন। উত্তরাঞ্চলে রতন সরকারও একই ধারার একজন উত্তরসূরি ছিলেন। ক্যামেরা হাতে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন তিস্তার দুই তীর, চরাঞ্চল, ভাঙনকবলিত গ্রাম, সীমান্ত এলাকা এবং উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত জনপদ। সংবাদ সংগ্রহ ছিল তাঁর কাছে পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক অঙ্গীকার।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে রতন সরকারের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। অনেকেই এই প্রকল্পকে শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু রতন সরকার বুঝতেন, এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন। তাই তিনি ধারাবাহিকভাবে সময় টেলিভিশনে তিস্তার পানি সংকট, নদীভাঙন, খরা, আকস্মিক বন্যা, কৃষি উৎপাদনের ক্ষতি, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং উন্নয়ন বৈষম্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।

তাঁর প্রতিবেদনের বড় শক্তি ছিল—তিনি কখনো শুধু সমস্যার ছবি দেখিয়ে থেমে থাকতেন না; সমস্যার সমাধানের পথও আলোচনায় আনতেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা, নদী ব্যবস্থাপনার আধুনিক ধারণা, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়গুলো তিনি ধারাবাহিকভাবে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। তাঁর অনেক প্রতিবেদন নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

রতন সরকার বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা মানে অন্যায়ের প্রতি নীরব থাকা নয়। জনগণের ন্যায্য দাবিকে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তুলে ধরা সাংবাদিকতারই দায়িত্ব। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে নয়, জনস্বার্থে নদী রক্ষার আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিকল্পনা, গণসংযোগ এবং প্রচারে তিনি নিরলস কাজ করেছেন।

রংপুর বিভাগজুড়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে ১০ মিনিটের স্তব্ধ কর্মসূচির ধারণাটি ছিল তাঁর। অনেকেই শুরুতে এটিকে সাধারণ কর্মসূচি মনে করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেল, এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া সৃষ্টি করেছে। দোকানপাট, যানবাহন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন—সবখানে মানুষ প্রতীকীভাবে থেমে গিয়ে তিস্তার দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও যে শক্তিশালী জনমত গড়ে তুলতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে এই উদ্যোগ।

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে রতন সরকারের আরেকটি বড় গুণ ছিল তাঁর সততা ও সহমর্মিতা। পেশাগত প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সহকর্মীদের সহযোগিতা করতেন। নবীন সাংবাদিকদের উৎসাহ দিতেন, সংবাদ যাচাইয়ের গুরুত্ব শেখাতেন এবং মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার মূল্য বোঝাতেন। তাই তাঁর মৃত্যুর পর রংপুরের সাংবাদিক সমাজ যে শোকাহত হয়েছিল, সেটি ছিল আন্তরিক শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ পরিবেশনের গতি বেড়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মাঠভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কমে এসেছে। রতন সরকার ছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের কাছে না গেলে মানুষের সংবাদও পাওয়া যায় না। তাই তাঁর সংবাদে মাঠের গন্ধ ছিল, মানুষের কান্না ছিল, আবার স্বপ্নও ছিল।

আজও তিস্তা অববাহিকার মানুষ ন্যায্য পানিবণ্টন, নদীভাঙন প্রতিরোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। এই দাবিগুলো আজও অপূর্ণ। তাই রতন সরকারের স্বপ্নও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে, তিস্তাকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং নদীকেন্দ্রিক উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।

রতন সরকার আমাদের শিখিয়েছেন, সাংবাদিকতা কেবল খবর প্রচার নয়; এটি মানুষের কথা রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক মহান দায়িত্ব। তিনি শিখিয়েছেন, ক্যামেরা শুধু দৃশ্য ধারণ করে না, ইতিহাসও ধারণ করে। একজন সাংবাদিক যদি মানুষের পাশে দাঁড়ান, তবে তাঁর সংবাদ সময়ের সীমানা অতিক্রম করে সমাজের সম্পদে পরিণত হয়।

তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এক নির্ভীক সংবাদযোদ্ধাকে। তিনি হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তিস্তার ঢেউ, নদীভাঙনের আর্তনাদ, কৃষকের দীর্ঘশ্বাস এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকারের সংগ্রামে তাঁর কণ্ঠ আজও প্রতিধ্বনিত হয়। যতদিন তিস্তার জনপদ থাকবে, যতদিন উন্নয়নের ন্যায্য হিস্যার দাবি থাকবে, ততদিন রতন সরকারের নামও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।

রতন সরকার বেঁচে থাকবেন তাঁর সাহসী সাংবাদিকতায়, মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসায় এবং তিস্তার জনপদের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাসে।

লেখক: সভাপতি,তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ, ইমেইল : [email protected]