রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

আরিফ: প্রতিবাদী এক বিনয়ী মানুষের অসমাপ্ত গল্প


প্রকাশ : (১১ ঘন্টা আগে)
আরিফ: প্রতিবাদী এক বিনয়ী মানুষের অসমাপ্ত গল্প

কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন খুব নীরবে, কিন্তু চলে যাওয়ার পর চারপাশে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা কোনো শব্দ দিয়ে পূরণ করা যায় না। মোঃ আরিফুল ইসলাম ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র, লালমনিরহাট সরকারি কারিগরি ইনস্টিটিউটের ইনস্ট্রাক্টর এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লালমনিরহাট জেলা সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু পরিচয়ের এই তালিকা দিয়ে আরিফকে বোঝা সম্ভব নয়। তাকে চিনতে হলে জানতে হবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তার অসাধারণ মানসিকতা, বিনয়ী আচরণ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসের কথা।

আরিফের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একজন মানুষ। এমন পরোপকারী ও বিনয়ী মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। কারও বিপদে তিনি পাশে দাঁড়াতেন, কারও প্রয়োজন হলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন, আর নিজের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা নিয়েও অন্যের জন্য কিছু করার চেষ্টা করতেন। মানুষের প্রতি তার এই ভালোবাসা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কোনো প্রচারের জন্য নয়, কোনো প্রতিদানের আশায় নয়।

আজ সেই আরিফ আমাদের মাঝে নেই।

তার চলে যাওয়ার খবর শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ নয়; এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি গভীর প্রশ্ন। কেন একজন ভালো মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে জীবন দিতে হবে? কেন সমাজের ক্ষতিকর প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে? কেন অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন নাগরিককে তার জীবন পর্যন্ত দিতে হবে?

আমাদের সমাজে বর্তমানে অনলাইন জুয়া ও মাদকের বিস্তার ভয়াবহ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তরুণদের একটি অংশকে সহজে অর্থ উপার্জনের মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছে। অন্যদিকে মাদক ধীরে ধীরে ধ্বংস করছে পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবন এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। একটি পরিবারে একজন তরুণ মাদকাসক্ত হলে শুধু একজন মানুষ নয়, তার সঙ্গে একটি পুরো পরিবারও ভেঙে পড়ে।

এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে কথা বলা প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন যারা কথা বলেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

আরিফ সেই প্রয়োজনীয় কাজটিই করতে চেয়েছিলেন এমনটাই তার স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতজনদের বক্তব্যে উঠে আসে। সমাজের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি কথা বলতেন। ভালো কথা বলতেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন। আর সেই প্রতিবাদই শেষ পর্যন্ত তাকে নির্মম পরিণতির দিকে নিয়ে গেল -এমন অভিযোগ ও বেদনা আজ তার কাছের মানুষদের কণ্ঠে।

একজন আরিফকে হারানো মানে শুধু একটি পরিবারের একজন সদস্যকে হারানো নয়। একটি সমাজ তার একজন সাহসী কণ্ঠকে হারায়। একটি প্রতিষ্ঠান হারায় একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীকে। বন্ধুরা হারায় একজন আপন মানুষকে। আর সবচেয়ে বড় কথা দুই সন্তান হারায় তাদের বাবাকে।

আরিফের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তার স্ত্রী শম্পা সন্তানসম্ভবা ছিলেন। আর মাত্র কয়েক দিন আগে তাদের ঘরে এসেছে আরেকটি সন্তান। যে শিশুটি পৃথিবীতে আসার পর বাবার মুখ দেখার কথা ছিল, বাবার কোলে ওঠার কথা ছিল, বাবার আঙুল ধরে হাঁটার কথা ছিল সে শিশুটি আজ বাবাকে হারিয়ে পৃথিবীতে বড় হবে। এই বাস্তবতা ভাবলেই বুক ভার হয়ে আসে।

আরিফ ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র হাল ধরা মানুষ। তার বাবা-মা অনেক স্বপ্ন নিয়ে তাকে মানুষ করেছিলেন। একটি সন্তানকে মানুষ করতে বাবা-মায়ের যে কত ত্যাগ, কত রাতের নির্ঘুম অপেক্ষা, কত কষ্ট—তা কেবল তারাই জানেন। সেই স্বপ্নের সন্তান যখন সমাজের জন্য কিছু করতে গিয়ে অকালে চলে যায়, তখন তার বাবা-মায়ের বুকের ভেতরের শূন্যতা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

আরিফের জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে যায় ভালো মানুষ হওয়া সহজ নয়, আর ভালো থাকার মূল্য কখনো কখনো অনেক বড়।

কিন্তু তাই বলে কি আমরা চুপ করে থাকব?

যদি একজন মানুষ অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাকে একা করে দেওয়া হবে? যদি কেউ মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তাকে ভয় দেখানো হবে? যদি কেউ সমাজের তরুণদের বিপথগামিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাকে থামিয়ে দেওয়া হবে?

না। আরিফের মৃত্যু যদি আমাদের কিছু শেখায়, তবে সেটি হলো—অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

এখানে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়। পরিবারকে সচেতন হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে দায়িত্ব নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আইনের প্রয়োগ হতে হবে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ। অনলাইন জুয়া, মাদক ব্যবসা এবং এর সঙ্গে যুক্ত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শুধু আরিফ নয়, আরও অনেক পরিবারকে এমন ট্রাজেডির মুখোমুখি হতে হবে।

আরিফের মতো মানুষদের প্রয়োজন ছিল আমাদের সমাজে। তার প্রয়োজন ছিল তার পরিবারে, তার কর্মস্থলে, তার বন্ধুদের মাঝে, তার এলাকায়। কিন্তু তিনি আজ নেই।

তবুও আরিফ পুরোপুরি হারিয়ে যাবেন না। তিনি বেঁচে থাকবেন তার বন্ধুদের স্মৃতিতে, সহকর্মীদের শ্রদ্ধায়, তার বাবা-মায়ের চোখের জলে, স্ত্রীর হৃদয়ের গভীরে এবং তার দুই সন্তানের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে।

তার নবজাতক সন্তান হয়তো একদিন বড় হবে। হয়তো একদিন তাকে বলা হবে “তোমার বাবা খুব ভালো একজন মানুষ ছিলেন। তিনি অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতেন। সমাজকে ভালো করার স্বপ্ন দেখতেন।”

সেদিন আরিফের সন্তান যেন বাবাকে নিয়ে গর্ব করতে পারে এটাই আমাদের দায়িত্ব।

আরিফের জীবন তাই শুধু শোকের গল্প নয়; এটি আমাদের বিবেকের কাছে একটি প্রশ্ন। আমরা কেমন সমাজ রেখে যেতে চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে অন্যায়কারীরা শক্তিশালী আর প্রতিবাদীরা অসহায়? নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে সত্য কথা বলার মানুষ নিরাপদ থাকবে?

আরিফের অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো আমাদের সামনে রেখে তিনি চলে গেছেন।

আমাদের উচিত তার স্মৃতিকে শুধু ফেসবুকের একটি শোকবার্তায় সীমাবদ্ধ না রাখা। অনলাইন জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা, তরুণদের রক্ষা করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানো—এগুলোই হতে পারে আরিফের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।

আরিফ ছিলেন বিনয়ী, পরোপকারী ও প্রাণবন্ত একজন মানুষ। তিনি মানুষের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। তার জীবন থেমে গেছে, কিন্তু তার স্বপ্ন যেন থেমে না যায়।

মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয় আরিফুল ইসলামকে ক্ষমা করুন, তার কবরকে নূরে ভরে দিন এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য দিন এবং তার দুই সন্তানকে নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ দান করুন।

আরিফ চলে গেছেন। কিন্তু আরিফের মতো ভালো মানুষের স্বপ্ন যেন আমাদের সমাজে বেঁচে থাকে এটাই হোক তার প্রতি আমাদের শেষ শ্রদ্ধা।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

লেখক : সিনিয়র সহকারী পরিচালক,  বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

বিজ্ঞাপন