কৃষক পরিবারে জন্ম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দশম শ্রেণি পর্যন্ত। জীবনের শুরুতে চাকরি, পরে স্বল্প পুঁজির ব্যবসা। সেখান থেকেই হয়ে উঠলেন সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু নিজের অর্জন নিজের মধ্যে আটকে রাখলেন না। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হলেন, স্থানীয় সরকারের নেতৃত্ব দিলেন, ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেন, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্য হলেন। আবার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও অসংখ্য প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রাখলেন ভূমিকা। সাহিত্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতাও করলেন। একটি জীবন যেন রাজনীতি, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, ব্যবসা, সংস্কৃতি আর মানবিকতার বহু অধ্যায়ের সমাহার। তিনি আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমেদ।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যাঁদের বাদ দিয়ে এ জনপদের সামাজিক ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ করা কঠিন। আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমেদ তেমনই একজন।
১৯২৩ সালের ১৯ মার্চ কালীগঞ্জের কাশীরাম গ্রামে এক সাধারণ কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা মৌলভী আছিম উদ্দিন আহমেদ, মা নেছাবি বেওয়া। গ্রামের সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি একদিন জাতীয় সংসদে এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করবেন এবং এতগুলো শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজের জীবন জড়িয়ে দেবেন-শৈশবে হয়তো তা অনুমান করা কঠিন ছিল।
পাঠশালা থেকে জীবনের বিদ্যালয়ে
করিম উদ্দিন আহমেদের শিক্ষাজীবনও ছিল বৈচিত্র্যময়। মদনপুর বৈরাতীর নীলাম্বর পণ্ডিতের পাঠশালায় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। পরে গঙ্গাচড়ার চিলাখাল পাইকান মাদ্রাসায় পড়েন এবং এরপর পাকুরিয়া শরীফ মাদ্রাসায় ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে তুষভান্ডার উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রি তাঁর ছিল না। অথচ পরবর্তী জীবন তিনি ব্যয় করেছেন অন্য মানুষের জন্য শিক্ষার দরজা তৈরিতে। এখানেই তাঁর জীবনের এক অসাধারণ বৈপরীত্য-নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ দীর্ঘ না হলেও অন্যদের শিক্ষার পথ দীর্ঘ ও প্রশস্ত করতে তিনি জীবনভর কাজ করেছেন।
ব্যবসায়ী করিম উদ্দিন: নিজের পায়ে দাঁড়ানোর গল্প
১৯৪৫ সালে ব্যবসার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। প্রথম দিকে একটি মাড়োয়ারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পরে অল্প পুঁজি নিয়ে নিজেই ব্যবসা শুরু করেন। ক্রমে পাট ও তামাকের ব্যবসা বিস্তৃত হয়। কলকাতা, ভৈরব, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ঝালকাঠি ও সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক যোগাযোগ গড়ে ওঠার কথা জীবনীমূলক সূত্রে পাওয়া যায়। সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে তিনি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং আর্থিকভাবেও সচ্ছল হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁর জীবনের বিশেষত্ব সম্পদ অর্জনে নয় অর্জিত সামর্থ্য তিনি কী কাজে ব্যবহার করেছিলেন, সেখানেই। তিনি বিদ্যালয় গড়েছেন, কলেজ গড়েছেন, মাদ্রাসা-এতিমখানা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেছেন এবং সাহিত্য সংস্কৃতিকেও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।
রাজনীতির হাতেখড়ি ক্ষমতায় নয়, প্রতিবাদে
করিম উদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারি তুষভান্ডার ইউনিয়নের ইতিহাসেও উল্লেখ আছে, তরুণ বয়সে তিনি ব্রিটিশবিরোধী 'ভারত ছাড়' আন্দোলনে যুক্ত হন। তুষভান্ডার বাজারে খাজনা আদায় বন্ধের আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। অর্থাৎ তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ কোনো নির্বাচনী পদ দিয়ে হয়নি; শুরু হয়েছিল প্রতিবাদী রাজনীতির মধ্য দিয়ে। ১৯৫৪ সালে তিনি ইউনিয়ন বোর্ডে নির্বাচিত হন। এরপর টানা প্রায় ১৬ বছর স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের তথ্য পাওয়া যায়। পাকিস্তান আমলে কালীগঞ্জে গঠিত উন্নয়ন পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য 'গভর্নর পুরস্কার' পাওয়ার উল্লেখ স্থানীয় জীবনীমূলক সূত্রে রয়েছে। তৃণমূলের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই সম্ভবত তাঁকে মানুষের প্রয়োজন বোঝার বাস্তব শিক্ষা দিয়েছিল।
১৯৫৯: একটি বিদ্যালয়, একটি দর্শন
করিম উদ্দিন আহমেদের জীবনের সবচেয়ে স্থায়ী পরিচয়গুলোর একটি তৈরি হয় ১৯৫৯ সালে। ৪ জানুয়ারি ১৯৫৯ প্রতিষ্ঠিত হয় কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রায় সাত দশক আগে মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তাৎপর্য আজকের বাস্তবতা দিয়ে পুরোপুরি বোঝা কঠিন। তখন যোগাযোগ দুর্বল, মানুষের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, গ্রামে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগও ছিল অপ্রতুল। তিনি বুঝেছিলেন, সমাজ বদলাতে হলে মানুষের হাতে শুধু সাহায্য তুলে দিলে হবে না-তাদের সামনে শিক্ষার দরজা খুলতে হবে। তাঁর শিক্ষা-দর্শনের সঙ্গে যুক্ত একটি স্মরণীয় বক্তব্য বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে সংরক্ষিত রয়েছে। তার সারকথা- বক্তৃতার চেয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ মানুষের কাছে বক্তব্যকে বেশি স্পষ্ট করে। এই দর্শন পরবর্তী জীবনেও তাঁর কাজে ফিরে এসেছে।
শহীদ মিনার ও ভাষার চেতনা
তিনি শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী ছিলেন না; বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতিও অনুরাগী ছিলেন। বিভিন্ন স্থানীয় সূত্রে তাঁর প্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় কালীগঞ্জে তারই প্রতিষ্ঠিত স্কুল চত্ত্বরে প্রথম শহীদ মিনার 'চিরঞ্জীব কালীগঞ্জ' নির্মিত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। একটি শহীদ মিনার কেবল স্থাপনা নয়। পাকিস্তান আমলের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল বাংলা ভাষা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক।
১৯৭০: তৃণমূল থেকে প্রাদেশিক পরিষদে
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে করিম উদ্দিন আহমেদ রংপুর-৬ আসন থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচিত সদস্যদের তালিকাতেও Rangpur-6 আসনের পাশে তাঁর নাম পাওয়া যায়। এখানে একটি ঐতিহাসিক তথ্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন ১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নন; পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ১৯৭০-এর নির্বাচন ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ গণরায়। সেই নির্বাচনে তাঁর বিজয় স্থানীয় জনসমর্থনের পাশাপাশি বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গেও তাঁর অবস্থানকে যুক্ত করে।
১৯৭১: রাজনীতিক যখন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক
তারপর এলো ১৯৭১।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির জন্য তখন প্রশ্নটি আর পদ-পদবির ছিল না; প্রশ্ন ছিল দেশের।
করিম উদ্দিন আহমেদ কালীগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইপিআর, আনসার ও পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে স্থানীয় প্রতিরোধ সংগঠিত করার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। তাঁর নিজের বাসভবন সাংগঠনিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল বলে একাধিক সূত্রে উল্লেখ আছে। কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে এক জনসভায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী এলাকায় প্রবেশ করলে তিনি ভারতের কোচবিহারের দিকে চলে যান এবং সেখান থেকেও মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক কাজে যুক্ত থাকেন। এই অধ্যায় তাঁর জীবনের মূল্যায়নে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে বিদ্যালয় তিনি শিক্ষার জন্য তৈরি করেছিলেন, একদিন সেই বিদ্যালয়ের মাঠই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের মঞ্চ হয়ে উঠেছিল।
যুদ্ধশেষে মানুষের পাশে
স্বাধীনতার অর্থ তাঁর কাছে শুধু একটি পতাকা বা ভূখণ্ড ছিল না; যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের জীবন পুনর্গঠনও ছিল স্বাধীনতার দায়িত্ব। জীবনীমূলক সূত্রে পাওয়া যায়, যুদ্ধের পর সর্বস্বহারা কৃষকদের মধ্যে হালের গরু এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কালীগঞ্জ এলাকায় RDRS-এর কার্যক্রম চালুর ক্ষেত্রেও তাঁর প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধের সময় সংগঠক, আবার যুদ্ধশেষে পুনর্বাসনের কর্মী-দুই ভূমিকাতেই তাঁকে দেখা যায়।
১৯৭২: উচ্চশিক্ষার নতুন দরজা
স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মধ্যে ১৯৭২ সালে তিনি স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে করিম উদ্দিন পাবলিক কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন-যা বর্তমানে সরকারি করিম উদ্দিন পাবলিক কলেজ। কলেজের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসেও তাঁকে প্রতিষ্ঠাতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের পর কলেজ প্রতিষ্ঠা তাঁর শিক্ষা-ভাবনার ধারাবাহিকতার পরিচয় দেয়। তিনি যেন বলতে চেয়েছিলেন-গ্রামের সন্তান শুধু মাধ্যমিক পর্যন্ত নয়, উচ্চশিক্ষার পথেও এগিয়ে যাবে।
১৯৭৩: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে
১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি রংপুর-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ধারাবাহিকতা তাই লক্ষণীয়-ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ইউনিয়ন বোর্ড উন্নয়ন পরিষদ ১৯৭০ এর প্রাদেশিক পরিষদ মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ। এটি শুধু একজন রাজনীতিকের পদোন্নতির ইতিহাস নয়; বরং স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় প্রতিনিধিত্বে পৌঁছানোর একটি দীর্ঘ জনসম্পৃক্ত যাত্রা।
পাঁচটি নয়-শিক্ষা বিস্তারে আরও বড় কর্মযজ্ঞ
তাঁর শিক্ষা-অবদান নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, তিনি কয়েকটি মাত্র প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু অনুসন্ধানে আরও বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়। কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, করিম উদ্দিন পাবলিক কলেজ, করিম উদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং করিমপুর নেছারিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও এতিমখানার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বুড়িমারী, দক্ষিণ মুশরত মদাতী, হাড়িশ্বর, টেপারহাট, হরুরাম, তেঁতুলিয়া নীলকান্ত, মধ্য গোপালরায়, আছমত আলী মহিষামুড়ি, চর কাঞ্চনশ্বর, গাগলারপাড়, তালুক মদাতী, চর বৈরাতি, বারাজান, উত্তর বান্দেরকুড়া, সুন্দ্রাহবি, কাজীরহাট বানীনগর, মিয়াপাড়া, দক্ষিণ গোপালরায়, চামনা, বাবুরডাঙ্গা, দুহুলী বালিকা, তালুক বানীনগর, উপেন্দ্রনাথ, খান্ডেরচড়া, খালিশা মদাতী, বোতলা, বত্রিশ হাজারি ও মহিষামুড়ি সুখের চরসহ বহু প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রত্যক্ষ সহায়তার উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে এসবের অনেকগুলো জাতীয়করণের আওতায় আসে। এ তথ্য তাঁর শিক্ষা-দর্শনের ব্যাপ্তিকে নতুনভাবে সামনে আনে। তাঁর লক্ষ্য শুধু নিজের নামে প্রতিষ্ঠান গড়া ছিল-এমন সিদ্ধান্ত এই ইতিহাস সমর্থন করে না। বরং বিভিন্ন গ্রামের শিশুদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই তাঁর বৃহত্তর আগ্রহ ছিল বলে প্রতীয়মান হয়।
ডাকঘর: জনপদকে পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করা
১৯৬৩ সালে করিমপুর ডাকঘর প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার কথাও পাওয়া যায়। আজকের ইন্টারনেট যুগে ডাকঘরকে সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু ষাটের দশকের গ্রামে ডাকঘর ছিল রাষ্ট্র ও বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিদ্যালয় মানুষকে জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করে, ডাকঘর মানুষকে পৃথিবীর সঙ্গে-করিম উদ্দিন আহমেদের উন্নয়ন ভাবনায় দুটিরই জায়গা ছিল।
সংস্কৃতিমনা এক মানুষ
তাঁর আরেকটি কম আলোচিত পরিচয়-তিনি ছিলেন সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনুরাগী। লোকসাহিত্য ও আঞ্চলিক ভাষার গবেষক ধর্মনারায়ণ সরকার ভক্তিশাস্ত্রীর 'উত্তর বাংলার লোকসাহিত্য ও ভাষা' গ্রন্থ প্রকাশে তিনি মুদ্রণ ব্যয় বহন করে সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় কালীগঞ্জে 'অন্বেষা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী' প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়। তিনি বুঝেছিলেন, সমাজ কেবল রাস্তা, স্কুল আর অর্থনীতিতে বাঁচে না; সমাজের আত্মা বেঁচে থাকে তার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও স্মৃতির মধ্যে।
১৯৮৫: জাতীয় সংসদ থেকে আবার তৃণমূলে
রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও তিনি স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। ১৯৮৫ সালে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বলে একাধিক জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনাটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি পূর্ণ বৃত্ত তৈরি করে। যে মানুষ ১৯৫৪ সালে স্থানীয় সরকার দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব শুরু করেছিলেন, প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় সংসদ ঘুরে জীবনের শেষ পর্যায়েও আবার স্থানীয় সরকারের নেতৃত্বে ফিরে এলেন।
উত্তরাধিকার যখন পরবর্তী প্রজন্মে
পরবর্তী সময়ে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র নুরুজ্জামান আহমেদও রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও পরবর্তীকালে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে করিম উদ্দিন আহমেদের প্রকৃত উত্তরাধিকারকে শুধু পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর জীবনকে ছোট করে দেখা হবে। তাঁর বড় উত্তরাধিকার ছড়িয়ে আছে সেইসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে; কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া তরুণ-তরুণীর মধ্যে; এতিমখানায় আশ্রয় পাওয়া শিশুর মধ্যে; সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহ পাওয়া মানুষের মধ্যে; মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে এবং একটি অঞ্চলের শিক্ষিত সমাজ তৈরির দীর্ঘ ইতিহাসে।
শেষযাত্রা
১৯৯১ সালের ২৮ আগস্ট রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। একটি জীবনের সমাপ্তি ঘটেছিল; কিন্তু তাঁর তৈরি প্রতিষ্ঠানগুলোর জীবন থেমে যায়নি।
আজও সেখানে ঘণ্টা বাজে।
শিক্ষার্থী আসে।
শ্রেণিকক্ষে পাঠ হয়।
নতুন প্রজন্ম স্বপ্ন দেখে।
সম্ভবত একজন প্রতিষ্ঠান নির্মাতার জন্য এর চেয়ে বড় স্মৃতিসৌধ আর হতে পারে না।
মানুষটি কেন আজও প্রাসঙ্গিক
আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমেদের জীবনকে শুধু প্রশংসার ভাষায় দেখলে তাঁর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। তাঁর জীবনের বিশেষত্ব ছিল সমন্বয়ে। তিনি ব্যবসা করেছেন, কিন্তু সম্পদকে শুধু ব্যক্তিগত ভোগে আটকে রাখেননি। রাজনীতি করেছেন, কিন্তু রাজনীতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকা নিয়েছেন, আবার স্বাধীনতার পরে পুনর্গঠনের কাজে নেমেছেন। বিদ্যালয় করেছেন, আবার সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন। জাতীয় সংসদে গেছেন, আবার জীবনের শেষ রাজনৈতিক অধ্যায়ে স্থানীয় সরকারের নেতৃত্বেও ফিরে এসেছেন। তাঁর জীবন তাই আমাদের একটি সহজ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়-একজন জনপ্রতিনিধি চলে যাওয়ার পর তাঁর এলাকার মানুষ কী পায়? করিম উদ্দিন আহমেদের ক্ষেত্রে উত্তর খুঁজতে শুধু স্মৃতিচারণের প্রয়োজন পড়ে না। তাঁর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালেই উত্তরটির একটি বড় অংশ দৃশ্যমান হয়। রাজনৈতিক পদ একদিন শেষ হয়। ব্যবসার হিসাবও একসময় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে যখন নতুন একটি শিশু প্রথম অক্ষর শেখে, তখন বহু বছর আগে একজন মানুষের নেওয়া সিদ্ধান্ত আবার নতুন করে ফল দিতে শুরু করে। সেখানেই আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমেদের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তিনি শুধু নিজের সময়ের মানুষ ছিলেন না; প্রতিষ্ঠান নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের মানুষের জন্যও কাজ করে গেছেন। আর সম্ভবত এ কারণেই কালীগঞ্জের ইতিহাসে তাঁর পরিচয় শুধু একজন সাবেক সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কিংবা সমাজসেবক নয়- তিনি ছিলেন মানুষ ও জনপদ গড়ার এক স্বপ্নদ্রষ্টা।
লেখক: খুরশীদুজ্জামান আহমেদ, কালিগঞ্জ কে ইউ পি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
ইতিহাসের দায় শোধ - মোহাম্মদ ইয়ার আলী
২ সপ্তাহ আগে