শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

মতিঝিলের চায়ের দোকান থেকে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন: ৩২ বছরে সুন্দরম


প্রকাশ : (১ দিন আগে)
মতিঝিলের চায়ের দোকান থেকে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন: ৩২ বছরে সুন্দরম

লালমনিরহাটে এমন একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের নাম বলতে বললে সবাই এক নামে চিনবে, নামটি সুন্দরম। একটি সৃজনশীল শিল্প মাধ্যম। ৩২ বছর ধরে টিকে থাকা এই সংগঠনটি আজ আর শুধু লালমনিরহাটের নয়, এটি দুই বাংলার।

যাত্রা শুরু ১৯৯৪ সালে

১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর লালমনিরহাটে সুন্দরমের যাত্রা শুরু হয়। শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। কোনো অফিস ছিল না, কোনো ঘর ছিল না, কোনো সরকারি অনুদান ছিল না, কোনো বড় পৃষ্ঠপোষক ছিল না। ছিল শুধু একদল তরুণের বুক ভরা স্বপ্ন। তারা চেয়েছিল লালমনিরহাটে একটি সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে তরুণরা মাদক ও হতাশা থেকে বেরিয়ে এসে বই, গান, কবিতা, নাটক ও বিতর্ক নিয়ে থাকবে।

নামকরণের চমকপ্রদ গল্প

অনেকেই মনে করেন সুন্দরম নামটি লালমনিরহাটেই ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু এর পেছনের গল্পটি অন্যরকম। ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে ঢাকার মতিঝিলের একটি ছোট চায়ের দোকানে বসে কয়েকজন বন্ধু আড্ডা দিচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক পি.কে. বিক্রম। আড্ডার বিষয় ছিল লালমনিরহাটে কিছু একটা করা দরকার। ঢাকা কেন্দ্রিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে মফস্বলেও যে ভালো কাজ করা যায় সেটা প্রমাণ করতে হবে। অনেক নাম নিয়ে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় নাম হবে সুন্দরম। এটি একটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ হলো যা সুন্দর। সেই চায়ের দোকানের ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে জন্ম নেওয়া নামটি আজ ৩২ বছর পর দুই বাংলার মানুষের মুখে মুখে।

বাসন্তিকা: সুন্দরমের প্রাণ ও ইতিহাসের দলিল

সুন্দরম যাত্রার শুরুতেই একটি বিষয় উপলব্ধি করে, শুধু মঞ্চে অনুষ্ঠান করলে সংস্কৃতি টিকে থাকে না। তাকে লিখে রাখতে হয়, ছাপার অক্ষরে ধরে রাখতে হয়। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম হয় বাসন্তিকার। বাসন্তিকা হলো সুন্দরমের সাহিত্যের কাগজ ও মুখপত্র।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি বিরল ঘটনা। একটি জেলা শহর থেকে একটি সাহিত্য কাগজ ৩২ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বের করা প্রায় অসম্ভব। ঢাকার অনেক নামি-দামি সাহিত্য কাগজও দুই-তিন বছর পর বন্ধ হয়ে যায় অর্থের অভাবে বা ধারাবাহিকতার অভাবে। সেখানে বাসন্তিকা ৩২ বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি কাগজ নয়, এটি লালমনিরহাটের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের আর্কাইভ। এই জেলার কত কবি, কত গল্পকার, কত প্রাবন্ধিকের প্রথম লেখা ছাপা হয়েছে বাসন্তিকায় তার কোনো হিসাব নেই। আজ তারা অনেকেই দেশে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তাদের সবার শেকড় এই বাসন্তিকাতেই।

শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গেও সমান তালে কাজ করছে

সুন্দরমের সবচেয়ে বড় সাফল্য এবং সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি সীমান্তের কাঁটাতার মানে না। এটি বিশ্বাস করে ১৯৪৭ সালে রাজনৈতিকভাবে দেশ ভাগ হয়েছে, কিন্তু বাংলা ভাষা, বাংলা গান, বাংলা সংস্কৃতি ভাগ হয়নি। লালমনিরহাটের মানুষ যে ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, চটকা গান শোনে, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দিনহাটা, আলিপুরদুয়ারের মানুষও হুবহু একই গান শোনে। তাদের মুখের ভাষা এক, তাদের কষ্ট এক, তাদের আনন্দ এক।

এই চেতনা থেকেই সুন্দরম এখন আর শুধু বাংলাদেশের সংগঠন নয়। এটি এখন দুই বাংলার সংগঠন। সুন্দরম পশ্চিমবঙ্গেও সমান তালে কাজ করে যাচ্ছে। কলকাতা, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়িতে সুন্দরমের পাঠক, লেখক ও শুভাকাঙ্ক্ষী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। বাসন্তিকা এখন দুই বাংলার কাগজ। বাসন্তিকায় নিয়মিত লিখছেন পশ্চিমবঙ্গের কবি ও লেখকরা। আবার লালমনিরহাটের লেখকদের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। অনলাইনে দুই বাংলার যৌথ কবিতা পাঠ, গল্প পাঠ, লোকসংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা, ভাওয়াইয়া গান নিয়ে গবেষণা এখন নিয়মিত ঘটনা। এই সেতুবন্ধনের কাজটি নীরবে করে যাচ্ছে সুন্দরম।

মিলনমেলা: ফেসবুক গ্রুপ বাসন্তিকা-সুন্দরম

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রাণকেন্দ্র হলো ফেসবুক গ্রুপ 'বাসন্তিকা-সুন্দরম'। আগে সুন্দরমের সাথে যুক্ত হতে হলে লালমনিরহাটে আসতে হতো। এখন সময় বদলেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ঘরে বসেই যুক্ত হওয়া যায়।

যারা সুন্দরমের সাথে যুক্ত হতে চান, যারা বাসন্তিকায় লেখা পাঠাতে চান, যারা দুই বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির খবর জানতে চান, যারা ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালিকে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই গ্রুপটি একটি খোলা ঠিকানা। ফেসবুকে গিয়ে 'বাসন্তিকা-সুন্দরম' লিখে সার্চ করলেই গ্রুপটি পাওয়া যাবে। প্রতিদিন এই গ্রুপে নতুন লেখা, নতুন গান, নতুন ভাবনা পোস্ট হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বন্ধুরাও এখানে যুক্ত হয়ে তাদের লেখা ও মতামত শেয়ার করছেন।

৩২ বছরের শিক্ষা

৩২ বছর একটি সংগঠনের জন্য অনেক দীর্ঘ সময়। এই সময়ে লালমনিরহাটে অনেক সংগঠন এসেছে, আবার হারিয়েও গেছে। কিন্তু সুন্দরম টিকে আছে। টিকে আছে তার সততা দিয়ে, তার নিরলস পরিশ্রম দিয়ে। সুন্দরম প্রমাণ করেছে বড় কিছু করার জন্য ঢাকা বা কলকাতায় যাওয়ার দরকার নেই। নিজের শহরে থেকেও দুই বাংলাকে জোড়া লাগানো যায়।

মতিঝিলের চায়ের দোকানের একটি ছোট্ট নাম আজ ৩২ বছরের একটি বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। যে বৃক্ষের শিকড় লালমনিরহাটে, আর যে বৃক্ষের ছায়া পড়েছে দুই বাংলার মানুষের ওপর। (প্রস বিজ্ঞপ্তি)

বিজ্ঞাপন