ডিজিটাল যুগে মানুষ যেন মোবাইলের দাসে পরিণত হচ্ছে, বিশেষজ্ঞরা দিলেন জীবন ফিরিয়ে আনার ৫টি উপায় । একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির কল্যাণে যেমন জীবন অনেক সহজ হয়েছে, তেমনি বেড়েছে মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত নির্ভরতা। বিশেষ করে স্মার্টফোন, যেটি এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং অনেকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপ নিয়েছে। ঘুম থেকে উঠেই চোখ যায় স্ক্রিনে, আবার রাত ঘুমোতে যাওয়ার আগমুহূর্তেও সেই স্ক্রিনেই আটকে থাকি আমরা। এই মোবাইল নির্ভরতা এক পর্যায়ে গিয়ে রূপ নিচ্ছে ‘স্মার্টফোন আসক্তিতে’, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে একজন মানুষ দিনে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, যা বছরে প্রায় দুই মাসের সমান সময়! এতে ব্যক্তি জীবনের মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন কাজের দক্ষতায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে করণীয় কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দিয়েছেন মার্কিন লেখিকা ও সাংবাদিক ক্যাথরিন প্রাইস। তার আলোচিত বই “How to Break Up with Your Phone”-এ তিনি প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার জন্য পাঁচটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন। চলুন সেগুলোর বিস্তারিত দেখি—
১. নিজের মোবাইল ব্যবহারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করুন
শুধু সময় কমানো নয়, বরং ‘কেন’ আপনি ফোনের ব্যবহার কমাতে চান—সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। পরিবার, সন্তান, নিজের মানসিক প্রশান্তি—আপনি কোনটিকে অগ্রাধিকার দিতে চান, তা লিখে ফেলুন। অনেকেই এই উপলক্ষে মোবাইল ফোনের প্রতি একটি ‘ব্রেকআপ চিঠি’ লেখেন, যা তাদের মনোসংযোগ দৃঢ় করতে সহায়তা করে। যেমন:
“প্রিয় ফোন, তুমি আমার অনেক সময় কেড়ে নিচ্ছো। আমি আমার সন্তান, পরিবার এবং নিজের ভাবনার সঙ্গে সময় কাটাতে চাই।”
২. বাস্তব জীবনের আনন্দ পুনরাবিষ্কার করুন
অনেকেই একাকিত্ব বা একঘেয়েমি কাটাতে ফোনে ডুবে যান। তবে তা সাময়িক বিনোদন দিলেও দীর্ঘমেয়াদে আরও একাকী করে তোলে। এর বদলে এমন কিছু করুন যা বাস্তব আনন্দ দেয়। যেমন—নতুন রান্না শেখা, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, হাঁটতে যাওয়া বা পছন্দের বই পড়া। ১০ মিনিট সময় নিয়ে একটি তালিকা করুন যে কাজগুলো আপনাকে সত্যিকারের খুশি দেয়।
৩. ফোনকে আকর্ষণহীন করে তুলুন
সব অ্যাপ আপনার দরকারি নয়। ফোনের অ্যাপগুলো দু’ভাগে ভাগ করুন—
পরবর্তী ধাপে সময় নষ্টকারী অ্যাপগুলো ডিলিট বা হোমস্ক্রিন থেকে সরিয়ে ফেলুন। চাইলে ফোনটি সাদা-কালো মুডে চালু করে দিন—এতে স্ক্রিনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ কমবে। স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে রাখতে অ্যাপ-ব্লকারও ব্যবহার করতে পারেন।
৪. নিয়ম তৈরি করুন, পরিবারকে প্রাধান্য দিন
ফোন ব্যবহারে কিছু নীতিমালা মানলে পারিবারিক সম্পর্ক মজবুত হয়। যেমন—খাবারের সময় কেউ ফোন ব্যবহার করবে না, রাত ৯টার পর সবাই ফোন এক পাশে রাখবে। ঘরে একটি ছোট্ট ‘আলাপের বাটি’ রাখুন, যেখানে প্রত্যেকে গল্প বা প্রশ্ন লিখে রাখবে। খাবারের সময় সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। এতে বাড়বে সংলাপ, সম্পর্ক হবে গভীর।
৫. দিন শুরু ও শেষ হোক ফোনহীন
ঘুম থেকে উঠেই স্ক্রিনে তাকানো এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে স্ক্রিনে চোখ রাখা—এ দুটি অভ্যাস মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বাড়ায়। চেষ্টা করুন মোবাইল ফোন বিছানার বাইরে রাখতে। দরকার হলে ঘড়ির অ্যালার্ম ব্যবহার করুন। ঘুমানোর আগে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে মন প্রশান্ত হবে এবং ঘুমও হবে গভীর।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
মনোরোগ চিকিৎসক ও প্রযুক্তি-আসক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল ফোনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো মানুষকে ধীরে ধীরে একঘেয়েমি, বিষণ্ণতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আত্মকেন্দ্রিকতায় ঠেলে দেয়। তাই এখনই সময় সচেতন হবার।
প্রযুক্তি আমাদের কাজের গতি বাড়ায়, কিন্তু সেটাই যখন জীবনের নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়ায়—তখন থেমে ভাবা দরকার। মোবাইল ফোন থেকে আলাদা হয়ে কিছুক্ষণ প্রকৃতির কাছে, পরিবারের কাছে বা নিজের মধ্যে থাকা জরুরি।
স্মার্টফোন আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সচেতনতা, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং বাস্তব জীবনের আনন্দে ফিরে যাওয়ার প্রচেষ্টা—এই তিন উপাদানই হতে পারে আপনার জীবনের ভারসাম্য ফেরানোর চাবিকাঠি।
সূত্র: দ্য নেক্সট বিগ আইডিয়া ক্লাব, ‘How to Break Up with Your Phone’ – ক্যাথরিন প্রাইস