রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের হত্যার বিচারের দাবিতে স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ ও শোক মিছিল কর্মসূচী পালন করেছে। এসময় রংপুরে পুলিশ প্রশাসনকে হুশিয়ারী দিয়ে ৩ দিনের আলটিমেটাম বেঁধে দেয় তারা। তবে পুলিশের এ বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, এত দ্রুত তদন্তের একটি পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি তাঁদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। তাঁরা ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান।
জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী নূর বলেন, হত্যাকান্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুজনকে জড়িত হিসেবে পুলিশের বক্তব্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তত করা প্রয়োজন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে নগরীর কাচারীবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে এ কর্মসূচী পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধন করে। পরে সেখান থেকে একটি শোক মিছিল বের করে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শোক মিছিল শেষে পূণরায় কাচারীবাজার জিলা স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে। সড়ক অবরোধকালীন সময়ে বক্তব্য রাখেন জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক সাফিয়ার রহমান, সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলারসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। অবরোধ ও শোক মিছিলে জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং অবসর প্রাপ্ত শিক্ষকগণ অংশ নেন।
জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাফিয়ার রহমান বলেন, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের হত্যার ঘটনায় নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। এই নাটক থেকে বেরিয়ে এসে সত্য উদঘাটন করতে হবে। আমরা সত্যকে জানতে চাই। খুনিকে আড়াল করার চেষ্টা করলে ফল ভালো হবে না। এসময় তিনি পুলিশ প্রশাসনকে খুনিকে আড়াল না করে সত্য উদঘাটন করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহবান জানান।
জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলার বলেন, এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় মানুষের মনে সন্দেহ তৈরী হয়েছে। ওই বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কে কাটলো। চারজনকে হত্যা করা হলো আশে-পাশের কেউ টের পেলো না। এরকম অনেক বিষয় আছে, সেগুলো ভালো করে তদন্ত না করেই, দুজনকে ধরে বলে দিলো এরা খুনের সাথে জড়িত। আমরা এসব বুঝি না। আমরা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সত্য জানতে চাই।
এদিকে বিকেলে নগরীর রংপুর প্রেসক্লাব চত্বরে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে মহানগর নাগরিক কমিটি। মানববন্ধন থেকে এই হত্যাকান্ডের সুষঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবী জানানো হয়। এসময় বক্তব্য রাখেন মহানগর নাগরিক কমিটির আহবায়ক এডভোকটে পলাশ কান্তি নাগ, সদস্য বিজয় প্রসাদ তপু, রংপুর মহানগর দোকান ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তানবির হোসেন আশরাফীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে ওই দুই যুবক জানিয়েছেন, ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে তাঁরা গণপতির বাড়ির ছাদে উঠেছিলেন। শব্দ শুনে গণপতি সেখানে গেলে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের অন্য তিন সদস্যকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিস মোহাম্মদ বলে, চারজনকে হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়িতে গোসল ও খাওয়াদাওয়া করেছে-পুলিশের এমন বক্তব্য তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছেন না। সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।মঙ্গলবার বিদ্যালয়ে নিহতদের স্মরণে প্রার্থনা শেষে সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি জানানো হবে।
হত্যাকান্ডের ঘটনাটি পরিদর্শনে এসে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর মহানগর আমির মাহবুবুর রহমান বেলাল দাবি করেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণপতি আগে রংপুর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। ২০১০ সালে নগরীর কামালকাছনার মাছুয়াপাড়ায় ৬ শতাংশ জমি কেনেন। তিন বছর আগে তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন সেখানে।সোমবার বিকেলে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির পাশে লোকজনের আনাগোনা। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি তিনতলা ভবনেরও নির্মাণকাজ চলছে। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন হিমাংশু রায় নামের অবসরপ্রাপ্ত এক কলেজশিক্ষক। হত্যাকান্ড নিয়ে তিনি কিছুই বুঝতে পারেননি।বোন, জামাতা ও বোনের ছেলে মেয়ের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না পূজা চক্রবর্তী। বাড়িতেও একজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেন নেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে। তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাদের তো শক্রতা নেই। এটা কোন দেশ।আমরা কোথায় বাস করছি।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ভাস্যঃ-
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে ফরেনসিক বিভাগ। নিহতদের মুখমন্ডল বিকৃত হয়ে গেলেও সেখানে কোনো রাসায়নিক পদার্থ বা অ্যাসিড ব্যবহারের আলামত পাওয়া যায়নি। মুখের এই পরিবর্তন পচন ধরার কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। একই সঙ্গে নিহত প্রার্থী চক্রবর্তীর চোয়াল ভাঙার কোনো চিহ্নও ময়না তদন্তে পাওয়া যায়নি।
রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় ময়না তদন্ত শেষে সোমবার (২৪ আগস্ট) গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ বাবলু কিশোর বিশ্বাস।
ডাঃ বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, চারটি মরদেহেরই ময়না তদন্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, শ্বাসরোধ করে তাদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। মরদেহ থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। এসব নমুনা সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে। সেখান থেকে পাওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মতামত দেয়া হবে।
নিহতদের মুখে রাসায়নিক পদার্থ বা অ্যাসিড ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে ডাঃ বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, পচন ধরার কারণে মুখমন্ডল এমন দেখাচ্ছে। অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।প্রার্থী চক্রবর্তীর চোয়াল ভাঙার কোনো সাইনও ময়নাতদন্তে পাওয়া যায়নি।
গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরের কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় রোববার ভোরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামে দুজনকে আটক করা হয়। পরে ওই দিন বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন।
নিহত শিক্ষক পরিবারের পাশাপাশি চিতায় উঠল চার লাশঃ-রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিহত গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।নিহতের স্বজনরা জানান, রোববার রাত ৮টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে চারটি মরদেহ তাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে রাত সাড়ে ৮টার নগরীর দখীগঞ্জ মহাশ্মশানে চারটি মরদেহ নিয়ে আসা হয়।সেখানে চারজনকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। এরপর পর পর চারটি চিতায় চারজনের মরদেহ তোলা হয়। স্বজনরাই মুখাগ্নি করেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে দাহকার্য শেষ হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, চারজনকে চিতায় তোলার সময় সেখানে স্বজনদের কান্নায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এ সময় পরিবারের বাইরেও যারা এসেছিলেন তারা কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।চিতায় আগুন দেওয়ার সময় স্বজনরা নিহতদের নাম ধরে বিলাপ করছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর শ্মশানে এক অদ্ভূত নিরবতা নেমে আসে। চারদিক থেকে শুধু আগুনের কুন্ডুলি দাউ-দাউ করে জ্বলছিল।
দাহকাজ শেষে চিতায় জল দিয়ে চারজনের ‘অস্থি’ নিয়ে যান স্বজনরা। পরে আগুন ভালভাবে নেভানোর জন্য শ্মশানের দায়িত্বরত তদারকারীরা পাইপ দিয়ে পানি ঢালতে দেখা যায়।বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে শনিবার রাতে বাসার তালা ভেঙেঙ্গে চারটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
রংপুর রিপোটার্স ক্লাবের সভাপতি শাহ বায়েজিদ আহমেদ তার ফেইজবুক পোষ্টে লিখেছেন,রংপুর নগরীতে এক পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দাবি মাদক সেবনের দৃশ্য দেখে ফেলায় এই হত্যাকান্ড। গ্রেপ্তার দুই তরুণ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।কারণ, গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আগে চুরি, ছিনতাই কিংবা স্থানীয় কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। শুধু মাদক সেবনের ঘটনা দেখে ফেলায় একটি পরিবারের চারজনকে হত্যার বিষয়টি মানতে পারছেন না নিহতদের স্বজন থেকে শুরু করে স্থানীয়রাও। ছাদের কার্নিশে এখনও বসে আছে কবুতরগুলো।তারা জানে না যে মানুষগুলো প্রতিদিন তাদের খাবার দিতেন, সেই মানুষগুলো আর কোনোদিন দরজা খুলবেন না।রংপুর নগরীর এই বাড়িতেই নৃশংসভাবে প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের চার সদস্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো একটি বসতবাড়ির ভেতরে একের পর এক চারজন মানুষ খুন হলেন, অথচ আশপাশের কেউ কি কিছুই টের পেলেন না?
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের বাড়িতে ঢুকে দুই তরুণ ইয়াবা সেবন করছিলেন। বিষয়টি দেখে ফেলায় বাধা দেন বাড়ির কর্তা গণপতি চক্রবর্তী। এরপরই ঘটে চার হত্যাকান্ড।পুলিশ আরও বলছে, হত্যার পরও দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করে অভিযুক্তরা। গোসল করেছে, খেজুর ও শসা খেয়েছে, আবার মাদক সেবন করেছে, স্বর্ণালংকার খুঁজেছে এবং মোবাইল ফোন পানিতে ডুবিয়ে রেখেছে।কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন।মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল এটি পরিকল্পিত ডাকাতি। বাড়ির আলমারি ভাঙা, আসবাবপত্র তছনছ, স্বর্ণালংকারের বাক্স ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাকে সামনে এনে ডাকাতির সময় হত্যাকান্ডের কথা বলা হয়।কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যায় সেই বক্তব্য। বলা হয়, ডাকাতির ঘটনা সাজানো হয়েছিল।অথচ পুলিশেরই দাবিবাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার নেওয়া হয়েছিল এবং গ্রেপ্তারদের দেখানো স্থান থেকে সেগুলো উদ্ধারও করা হয়েছে।তাহলে প্রশ্ন স্বর্ণালংকার যদি সত্যিই নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ডাকাতির বিষয়টি পুরোপুরি সাজানো বলা হচ্ছে কেন? আর ডাকাতিই যদি উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে, তাহলে হত্যার পর স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার কারণ কী?
পুলিশের প্রথম বক্তব্য কি ভুল ছিল? নাকি পরবর্তী তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেছে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।রোববার রাতে গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।সেই জবানবন্দির সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ফরেনসিক তথ্য, ময়না তদন্ত, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষ বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের মিল রয়েছে কি না সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি পরিবারের চারটি প্রাণহানির ঘটনায় দ্রুত আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু এমন নৃশংস হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে শুধু একটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সামনে এলেই তদন্ত শেষ হয়ে যায় না।
বরং পুলিশের বক্তব্য, আদালতের জবানবন্দি এবং ঘটনাস্থলের আলামত তিনটির মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।চারটি হত্যার পেছনে সত্যিই কি শুধু মাদক সেবনের ঘটনা দেখে ফেলার ভয়? নাকি এর আড়ালে রয়েছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনা?
রংপুরে শিক্ষকসহ চার হত্যার ঘটনায় আদালতে আসামীদের স্বীকারোক্তিঃ-
রংপুর মেট্রোপলিটন কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জি জানান, মাদক সেবনে বাঁধা দেয়ায় রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও স্ত্রী-সন্তানসহ চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার দুই যুবক আদালতে স্বীকরোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তবে জবানবন্দিতে তাঁরা কী বলেছেন, তা তদন্তের স্বার্থে তিনি বলতে চাননি। রবিবার (২৩ আগস্ট) রাতে রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-২ এর বিচারক এস এম রফিকুল ইসলাম অভিযুক্ত দুই আসামির জবানবন্দী গ্রহণ শেষে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ চার হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে রাতে আদালতে তোলা হলে তারা বিজ্ঞ বিচারকের নিকট ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দি শেষে আসামীদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়।
এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকরা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চান আসামিরা জবানবন্দিতে কী স্বীকার করেছেন। জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন,অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা। গণপতি চক্রবর্তী নিজের বাসার ছাদে ওই দুই তরুণকে ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলেছিলেন কি না এবং এ কারণেই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে কি না এসব বিষয়ে তাঁরা জবানবন্দিতে কী বলেছেন।
জানতে চাইলে কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জি বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে এখন কিছু বলা সম্ভব নয়।এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না এবং আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত চলছে। তারপর সব প্রশ্নের জবাব জানতে পারবেন। তবে যেহেতু তাঁরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তাই রিমান্ডের প্রয়োজন নেই।
গতকাল রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ দাবি করেন, ছাদে ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলায় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস এই হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।গতকাল রোববার বিকেলে রংপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করেননি।অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে করা এ মামলায় আসামির সংখ্যা উল্লেখ নেই।
উল্লেখ্য, রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে তার স্বজনরা সাড়াশব্দ না পাওয়ায় শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশে খবর দেয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে বাড়ির তালা ভেঙ্গে চিলেকোঠায় গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), সিঁড়িতে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫২) ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং দোতলায় শোবার ঘরে রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) লাশ দেখতে পায় পুলিশ। এমন মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় রংপুরসহ দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় রবিবার ভোরে পুলিশ মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে, সিটি বাজারে মাছের দোকান কর্মচারী মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে, স্বর্ণের দোকানে কারিগর সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা সম্পর্কে মামাতো ভাই।
এব্যাপারে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ কে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি তবে তিনি রোববারে সাংবাদিকদের জানান, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে মাদক সেবন করছিল দুই যুবক মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। এ ঘটনায় বাধা দেওয়ায় প্রথমে শিক্ষককে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। খুনিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, প্রার্থী চক্রবর্তীর মৃত্যু হতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। এ সময় তারা রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে। এতে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বের হয়ে আসে। পরে খুনিরা নিচতলায় যায়। সেখানে রংপুর জেলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আয়ুশকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।