রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

রংপুরের চাঞ্চল্যকর ৪ হত্যা: ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন আসামিরা


প্রকাশ : (২ ঘন্টা আগে)
রংপুরের চাঞ্চল্যকর ৪ হত্যা: ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন আসামিরা

রংপুর নগরীতে বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাঁধা দেওয়ায়  জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষকসহ পরিবারের ৪ জনকে হত্যার অভিযোগে একই এলাকার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুই যুবকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করেছে। হত্যার পর খুনিরা গোসল করে এবং শরীরের উত্তেজনা কমাতে শষা ও খেজুর খায়। এরপর তাদের কাছে থাকা একটি ইয়াবা তারা সেখানেই সেবন করে। একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে মানববন্ধন-সমাবেশ করেছে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। এর আগে ভোরের দিকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। আটকদের বাড়ি নগরীর মাছুয়া পাড়ায়। হত্যাকারীরা দুজনে সম্পর্কে মামাতো ও খালাতো ভাই। সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানে কাজ করতেন এবং মুগ্ধ মাছের দোকানে কাজ করতেন ।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পার্শ্ববর্তী ভবন দেবু দাসের। সেই ভবন দিয়ে বৃহস্পতিবার ভোর রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ শিক্ষক গণপতির বাড়ির ছাদে উঠে আসে। সেখানে বসে ইয়াবা সেবনের এক পর্যায়ে শব্দ পেয়ে ছাদে আসেন শিক্ষক গণপতি। তিনি ঘাড়ে গামছা নিয়ে ছাদে আসেন। তাদের দেখে ইয়াবা সেবনের ব্যাপারে প্রশ্ন করায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তাৎক্ষনিক গণপতির ঘাড়ের গামছা গলায় পেঁচিয়ে তাকে নিমর্মভাবে হত্যা করে। হত্যার সময় গোঙানির শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদের উপর উঠার চেষ্টা করে। এমন সময় তারা সিড়িতেই প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গলায় রশি পেচিয়ে হত্যা করে। প্রীতিলতার চিৎকারে সিঁড়ির দিকে মাস্টার্স পড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এগিয়ে আসলে তাকেও গলায় গামছা পেঁছিয়ে হত্যার চেষ্টা করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। এতেও সে মারা না গেলে রশি এনে তার গলায় ও মুখে পেঁচিয়ে জোরে টান দেয় তারা। এতে আগামীর মুখের চোয়াল ভেঙ্গে যায়। এরপর শিশু প্রিয়মের ঘরে এসে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। চিনে ফেলতে পারে এমন শংঙ্কায় প্রিয়মকে ঘুমন্ত অস্থায় গলায় গামছা পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। একে একে চারজনকে হত্যার পর তারা দুইজনেই শরীরের উত্তেজনা কমাতে গোসল করে। পরে দুজনে ডাইনিং টেবিলে বসে শশা, খেজুর ও ইয়াবা সেবন করে। হত্যার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষে তারা বাড়ির আসবাবপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে এবং স্বর্ণের গহনাপত্র আগুন দিয়ে পরিক্ষা করেন, সেটি আসল না নকল। পরে বাকী রাতটুকু চেয়ারে বসে বিশ্রাম নেয় হত্যাকারীরা। বাড়িতে থেকে বের হওয়ার সময় যাতে কেউ দেখে না ফেলে এজন্য তারা অপেক্ষা করতে থাকে। এরই মধ্যে ওই বাড়িতে ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট পাউডারের পানিতে ভিজিয়ে রাখে যাতে মোবাইলে কোন আঙ্গুলের ছাপ না থাকে। শুক্রবার জুমার নামাজ শুরু হওয়ায় রাস্তা ফাঁকা দেখে তারা ওই বাড়ি থেকে সটকে পরে। এ ঘটনার পরপর পুলিশ তালাবদ্ধ ওই বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ রাতেই ইয়াবা সেবনের আলামত ও পারিপাশ্বিক বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে এলাকায় অভিযান শুরু করে। অভিযানের একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়। তারা দ্জুনেই একই এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হবে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য, আলামত, সাক্ষ্য ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে মানববন্ধন-সমাবেশ করেছে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন। রবিবার (২৩ আগস্ট) দুপুরে জিলা স্কুল প্রাঙ্গনে এতে বক্তব্য রাখেন, শিক্ষার্থী আবির হোসেন, অর্নব রায়, মাজেদুল ইসলামসহ অন্যরা। এ সময় আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীসহ নগরবাসীর নিরাপত্তা দিতে পুলিশকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা পুলিশ কমিশনার কার্যালয় ঘেরাও করে। হত্যাকান্ডের ঘটনায় কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী, বাসদসহ বিভিন্ন সংগঠন নগরীতে মানববন্ধন সমাবেশ করে দোষীদের বিচারের দাবী জানায়।
পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, বিভিন্নভাবে আপনারা শিক্ষকের স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে যা শুনেছেন তা সঠিক নয়। এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। যে বাসায় ঘটনাটি ঘটেছে আমরা সেখানে ইয়াবা সেবনের আলামত পেয়েছি। আমরা সন্দেহ করি ঘটনার ঘটানোর আগে পরে তারা ইয়াবা সেবন করেছে। তারা সেখানে খেজুরও খেয়েছে। আমরা খেজুরের বিচি আলামত হিসেবে ডিএনএ টেস্ট করেছি। ফ্রিজ থেকে শসা খেয়েছে, সেটার অর্ধেকে কামড় দেওয়া রয়েছে। আসামিদের শনাক্তে এসব আলামত আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখেছি। পুলিশ কমিশনার দাবি করেন, এ হত্যাকান্ডের ঘটনা শেষ হলে আসামিদের শরীর খুব উত্তেজিত ছিল। তখন তারা শসা খায়। এরপর তারা গোসল করে। আমরা সেখান থেকে একটা চুড়ি পেয়েছি, যেটাতে আগুনে পোড়ানোর দাগ রয়েছে।এসব তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে।প্রয়োজনে আগামী দুই-তিনের মধ্যে আবারও এই মামলার তদন্তের আগ্রগতি জানাতে এমন প্রেস ব্রিফিং করা হবে। 
ঘটনাস্থলের পাশের তিনতলা ভবনের ছাদ থেকে কীভাবে দোতলার ছাদে আসামিরা গিয়েছে- সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ। তার দাবি- মাদকসেবীরা লাফিয়ে উঠানামা করতে পারে।দুজন কীভাবে চারজন মানুষকে খুন করে, এটা সম্ভব কিনা- এর উত্তরে তিনি বলেন, আসামিরা একে একে চারজনকে খুন করেছে। প্রথমে বাসার ছাদে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে, এরপর সিঁড়ির কাছে প্রীতিলতা ও তার মেয়ে প্রার্থীকে। সবশেষে ঘুমন্ত প্রিয়মকে তারা কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ এ ধরনের চাঞ্চল্যকর অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে।
প্রসঙ্গত,শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে  তালাবদ্ধ নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গত তিনদিন ধরে বাড়িতে তালাবদ্ধ দেখতে পান এলাকাবাসী।কয়েকদিন ধরে কোন রকম যোগাযোগ করতে না পেরে ওই শিক্ষকের আত্মীয় স্বজন এলাকায় এসে বাড়িতে তালাবদ্ধ দেখে পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে। এসময় বাড়ির ছাদে গণপতি চক্রবর্তী, সিঁড়ির কাছে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তি ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর লাশ পাওয়া যায় এবং একটি কক্ষের ভেতরে খাটের নিচ থেকে তাদের ছোট ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়। এসময় বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন এবং বাড়ির জিনিস পত্র তছনছ ও ছড়ানো ছিটানো ছিলো।রংপুর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষকতা পেশা থেকে চলতি বছরের ২ জানুয়ারী অবসরে যান গণপতি চক্রবর্তী। তিনি নগরীর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। হত্যার শিকার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স পাশ করেছেন এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এমন মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় রংপুরসহ দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন