রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ সারাদেশ

অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে ব্রহ্মপুত্র-নীলসাগর নৌ-যান


প্রকাশ :

অযত্ন-অবহেলায় নদীতে ভাসমান কিংবা নিমজ্জিত অবস্থায় পড়ে আছে কয়েক হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ উদ্ধারকারী নৌ-যান (রেসকিউ বোট)। বন্যা দুর্গত এলাকায়, নৌ-ডাকাতি, ঘূর্ণিঝড়সহ নদীপথের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় এই নৌযানগুলো ব্যবহার হতো। এসব নৌ-যানের চমৎকার নামকরণও হয়েছে জেলার আঞ্চলিক নদী বা হাওড়ের নামানুসারে। এর মধ্যে শুধু জামালপুর জেলার জন্য বরাদ্দকৃত ব্রহ্মপুত্র নামে ৪টি, নীলফামারী জেলার নদীর নামানুসারে নীলসাগর নামীয় ২টি নৌ-যানসহ অন্যান্য আরও অর্ধশতাধিক নৌ-যানগুলোও অবহেলা-অযত্নে অলস পড়ে আছে। অনুসন্ধানী রিপোর্টে বেরিয়ে এসেছে প্রকৃত চিত্র।

বন্যা, নৌ-ডাকাতি বা প্রাকৃতিক যেকোনো দুর্যোগের সময় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় দ্রুতগতির এই বোটগুলো ব্যবহার করা হয়। দুর্যোগের সময় বিশেষ করে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগাগ্রস্ত মানুষ ও গবাদি পশুকে রক্ষায় নৌ-যান একান্ত প্রয়োজন।

২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় মাল্টিপারপাস এক্সেসেবল রেসকিউ বোট (বহুমুখী উদ্ধার ও অনুসন্ধান কাজের লক্ষ্যে নৌ-যান সংগ্রহ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ) প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে মোট ৬৮টি নৌ-যান (রেসকিউ বোট) বরাদ্দ দেয়। তারও আগে ২০২১ সালের দিকে সারাদেশে বেশ কিছু নৌ-যান বা রেসকিউ বোট সরবরাহ করা হয়েছে। রেসকিউ বোটের রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামত খাতের অর্থ লোপাট এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের অজুহাতে এই সচল যানগুলো অচল দেখিয়ে মেরামত এবং লোকবল নিয়োগের নামেও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পায়তারা শুরু হয়েছে। আগে থেকেই অচল এবং সচল নৌ-যান শনাক্তের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ৭১-এর গেরিলা, লালমনিরহাট জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক ও লালমনিরহাট বার্তা পত্রিকার সম্পাদক এস এম শফিকুল ইসলাম কানু। এতে সরকারি সম্পদ ও অর্থ দুটোই রক্ষা হবে।

তুলনামূলক বন্যা ও দুর্যোগ কবলিত নদী-হাওড় বেষ্টিত অঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জামালপুর, শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মাদারিপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, পিরোজপুর, রাজবাড়ি, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নেত্রকোনা জেলায় প্রকল্পটি চালু করা হয়।

এর মধ্যে শুধু জামালপুর জেলা সদরে ব্রহ্মপুত্র-১, ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র-২, সরিষাবাড়িতে ব্রহ্মপুত্র-৩ এবং দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র-৪ নামে মোট ৪টি নৌযান বরাদ্দ দেওয়া হয়। বহুমুখী উদ্ধার ও অনুসন্ধান কাজের লক্ষ্যে নৌ-যান সংগ্রহ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মালামালসহ প্রতিটি নৌ-যানে দুইজন করে দক্ষ গ্রিজার (ড্রাইভার) ও লস্কর (সহকারী ড্রাইভার) পদে মোট ৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্যান্য জেলাতেও প্রতিটি নৌ-যানের জন্য ২ জন করে কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়।

এক বছর চলার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আ’লীগ সরকারের পট পরিবর্তনের সময় নৌ-যানগুলোর মূল্যবান মালামালও চুরি হয়। ইতোমধ্যেই কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অযত্ন-অবহেলায় নৌ-যানগুলো অলস অবস্থায় পড়ে আছে। কোনোটি আছে পানিতে, কোনোটি মাটিতে আছে। এসব সরকারি সম্পদ রক্ষায় নেই কোনো উদ্যোগ।

জামালপুরের বিশিষ্ট নাগরিক সাংবাদিক-মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম জানান, অযত্নে পড়ে থাকা নৌ-যানের দুরবস্থা সংস্কারপূর্বক সচল করতে ডিসির বরাবর আবেদনসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরেছি। দ্রুত মেরামত না করায় এগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। আর্থিক অনটন থাকলেও, নৌ-যানগুলো হাওড় বা বন্যাকবলিত শিশু-কিশোরদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতসহ শিক্ষার কাজেও ব্যবহার উপযোগী করা যেতে পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জামালপুরের ইসলামপুর-দেওয়ানগঞ্জ এবং গাইবান্ধা-বালাসীঘাট, সাঘাটার সীমান্তবর্তী এলাকায় যমুনা নদীর মোরাদাবাদ ঘাটে অযত্ন-অবহেলায় ব্রহ্মপুত্র-২ ও ব্রহ্মপুত্র-৪ নামে দুটি নৌ-যান অলস অবস্থায় পড়ে আছে। এর দেখভালের দায়িত্বে থাকা জামালপুর জেলা প্রশাসকের নির্দেশিকা সম্বলিত একটি নোটিশ সাঁটানো আছে।

জামালপুর যমুনা নদীর তীরের অধিবাসী ও মোরাদাবাদ ঘাটের শ্রমিক দিলু মন্ডল (৫০) জানান, আমার বাড়ির ঘাটেই দুটি সরকারি বোট পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় আমি ও আমার স্ত্রী স্বেচ্ছায় প্রতিদিনই বোটের পানি অপসারণ করছি। পানি অপসারণ না করলে নদীতে তলিয়ে যাবে। ৫ আগস্টের পর দুষ্কৃতিকারীরা এর কিছু মালামাল চুরি করেছে। এলাকাবাসীর সহায়তায় আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুষ্কৃতিকারীদের মোকাবিলা করেছি। স্বামী-স্ত্রী পালাক্রমে রাত জেগে পাহারাও দিচ্ছি। বর্তমানে নৌ-যান দুটি আটকানোর জন্য লোহার রশিও নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাজার থেকে মোটা রশি কিনে নৌ-যান দুটি ঘাটে বেঁধে রেখেছি। নদীর পানি বাড়লে কী হবে, বলা যায় না। নৌ-যান দুটি সরকারের হেফাজতে নেওয়া উচিত।

সরিষাবাড়ি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মি. শওকত জামিল জানিয়েছেন, এই অঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র নামে নৌ-যানটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণে নিলেও, তা অলস পড়ে আছে। এর কিছু মূল্যবান মালামাল যেমন ব্যাটারি, ইঞ্জিন বা বোটের বিভিন্ন টুলস চুরি হয়েছে। বাকি ৩টির কথা আমি জানি না। ওদিকে ব্রহ্মপুত্র-১ নৌ-যানটি জামালপুর শহরে ব্রহ্মপুত্র মরা নদের পাড়ে অবহেলায় পড়ে থাকায় মূল্যবান মালামাল চুরি হয়েছে। জামালপুর জেলা প্রশাসক ইউসুপ আলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি ডিআরআরও সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেন।

এ ব্যাপারে জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) আব্দুল্লাহ আল কাফি জানিয়েছেন, জেলার জন্য বরাদ্দকৃত চারটি সচল নৌযানই অলস পড়ে আছে। তিনি নৌ-যানের মালামালও খোয়া যাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, এসব সরকারি সম্পদ চুরিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এগুলো পরিচালনার জন্য কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। বরাদ্দের জন্য প্রতিনিয়তই অধিদপ্তরের কাছে লেখালেখি করা হচ্ছে। দেশের অন্যান্য জেলার নৌ-যানগুলোও একই অবস্থায় থাকার কথা জানা গেছে। সিরাজগঞ্জ জেলার নৌ-যানের সর্বশেষ অবস্থা জানতে জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনিও ডিআরআরও অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন।

সিরাজগঞ্জ দুর্যোগ (আশ্রয়কেন্দ্রের নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন) উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মোস্তফা মিয়া জানান, ৫ আগস্টের পর আমাদের ৩টি রেসকিউ বোট প্রশাসনের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বোটের চুরি হওয়া মালামাল ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সুনামগঞ্জ জেলার ডিআরআরও হাসিবুর রহমান জানান, দেড় বছর আগে কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি বন্ধ হয়েছে। ৫ আগস্টের পর ৪টি নৌ-যানের ইঞ্জিনসহ অনেক মালামাল চুরি হয়েছে। বর্তমানে এগুলো অচল। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাবরে লেখা হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলার ডিআরআরও আব্দুল মতিন জানান, প্রকল্পটি বন্ধ আছে। সরকারি সম্পদ রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, কর্মচারীদের বেতন নেই। এগুলো কীভাবে চলবে? ৪টি নৌ-যান স্থানীয়ভাবে কিছুদিন চালিয়েছি।

নীলফামারী জেলার নীলসাগর বোটগুলোও অবহেলায় পড়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। সেখানকার স্থানীয় সংবাদকর্মী কামরুজ্জামান মৃধা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি সম্পদ রক্ষায় আমি নিজেও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কাছে ধর্না দিয়েছি। গত বছর এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট করেও কর্তৃপক্ষের সাড়া মেলেনি। নৌ-যান রক্ষায় রং লাগানো, পাটাতনের মতো কিছু ক্ষুদ্র মেরামত খাতের প্রায় ২ লাখ টাকার কোনো কাজ হয়নি। অথচ টাকারও হদিস নেই। লালমনিরহাট জেলার ডিআরআরও মীর ফসাল আলী জানান, রেসকিউ বোটের বর্তমান অবস্থা আমার জানা নেই। পরে ফোন দিন। খোঁজ নিয়ে জানাবো।

(লেখক- গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মী)