শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৯ চৈত্র ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ সারাদেশ

সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অধিকাংশই বেনজীর হতে চায়!


প্রকাশ :

"বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে-তরুণরা পড়ে, তাদের বড়ো অংশ দরিদ্র পরিবার থেকে আসা। যে-শ্রেণীটি মধ্যবিত্ত পরিচয় দেয়, সেটিও নিম্নবিত্তেরই আলাদা সংস্করণ। দারিদ্র্য মানুষকে উচ্চাভিলাষী করে, এবং তার উচ্চাভিলাষ আর্থিক অভিলাষে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক উচ্চাভিলাষ— এ দুটিও প্রবল মাত্রায় ক্রিয়াশীল থাকে।

আমাদের যে-সিভিল সার্ভিস বা বিসিএস, সেখানে দরিদ্রদের অংশগ্রহণই বেশি। উচ্চবিত্তের অংশগ্রহণ নেই, বা সামান্য। এই মুহূর্তে কোনো তরুণ অফিসার পাওয়া যাবে না, যার পরিবার পাঁচশো বা এক হাজার কোটি টাকার মালিক। 

যদি সাংস্কৃতিক রুচিবোধ দ্বারা শ্রেণীকরণ করি, উচ্চবিত্তের, তাহলেও মনে হয় না অভিজাত বা সমঝদার পরিবারের কাউকে বিসিএসে পাবো। কালচারাল টেইস্ট উঁচু, এমন পরিবার বাংলাদেশে খুব একটা নেই। সততা, নৈতিকতা— এগুলো কালচারাল টেইস্টের ব্যাপার। উঁচু সাংস্কৃতিক চর্চা। গরিব, ইনস্টিঙ্কটিভ, প্রদর্শনকামী, ধর্মান্ধ, ও লোভী জনগোষ্ঠীর ভেতর এ চর্চা পাওয়া যায় না।

গত বিশ বছরে যারা পাবলিক সার্ভিসে ঢুকেছেন, তাদের সিংহভাগ, সম্ভবত শতোভাগ, ভীতু ও নিম্ন রুচির মানুষ। কালচারাল হাইটের সাথে মোরাল হাইটের সম্পর্ক আছে। সাংস্কৃতিক উচ্চতা ভালো না হলে নৈতিক উচ্চতা ভালো হয় না। যেকোনো অবৈধ ও নিষ্ঠুর কাজ ভীতু মানুষ দিয়ে করানো সম্ভব। আমাদের অফিসারগণ ভীতু জন্তু। মেন্টালি করাপ্ট। টিমিড। চাকরি হারানোর ভয়, প্রমোশন না পাওয়ার ভয়, ভালো পদায়ন না হওয়ার ভয়, আরও অসংখ্য ভয়ে সর্বদা আড়ষ্ট থাকেন। 

এ সুযোগটি রাজনীতিকরা নেন। এবং অনিবার্যভাবে, অফিসারদের বড়ো অংশই শক্তিকেন্দ্রের ছায়ায় বেনজীর হয়ে ওঠেন। এটিই নিয়তি। আপনি চাইলেও বেনজীর হওয়া ঠেকাতে পারবেন না, যদি না ভয় বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকেন।

লোভের জন্মও ভয় থেকে। ডিসপ্যাশোনেট ও নির্মোহ চাকরিজীবনের জন্য যে-স্বাভাবিক সাহস দরকার, তা দরিদ্র মানুষের থাকে না। শৈশব, কৈশোর, ও যৌবন, এ তিন কালের অর্থনৈতিক সংগ্রাম ভেতরে ভেতরে তাদেরকে মেরে ফেলে। মোরাল ইনস্টিঙ্কট পরিণত হয় সার্ভাইভাল ইনস্টিঙ্কট-এ। অর্থনৈতিক বৈষম্য এখানে এতো বেশি যে, ইচ্ছা থাকার পরও কোনো স্নাতকের পক্ষে সৎ জীবন-যাপন অসম্ভব।

প্রাণীজগতে ক্লিপ্টোপ্যারাসাইটিজম নামে একটি ব্যাপার আছে। ক্লিপ্টোপ্যারাসাইট কী করে? অন্য শিকারি প্রাণীর মুখ থেকে খাবার ছিনিয়ে এনে খায়। যেমন হায়েনা। এরা নিজেরা শিকার করতে চায় না। সবসময় ভরসায় থাকে অন্যের শিকারের। হায়েনা সিংহের মুখ থেকেও খাবার ছিনিয়ে আনে। সরকারি চাকরিজীবীদের বড়ো অংশই ক্লিপ্টোপ্যারাসাইট। চৌর্যপরজীবী। এরা নিজেরা সম্পদ সৃষ্টি করে না। কিন্তু অন্যের সৃষ্ট সম্পদ কৌশলে নিজ দখলে নিয়ে থাকে।

পীড়িত মানুষের ভেতর প্রতিশোধবাদী ক্ষমতালিপ্সা কাজ করে। এটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিছুটা শারীরিকও। এ রিয়েকশন থেকেই ছেলেমেয়েরা অ্যাডমিন, পুলিশ, এসব ক্যাডারকে পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রাখে। গরিব সমাজে এ ক্যাডারগুলো প্রজাকে রাজা হওয়ার সুযোগ দান করে। সবাই এ মানসিকতা লালন করে এমনটি বলছি না, কিন্তু বাংলাদেশের যে-জিঘাংসমূখর সাংস্কৃতিক অবস্থা, তাতে সিংহভাগ তরুণের মনে এ বিষয়টিই কাজ করে।

ফলে বলতে পারি, বেনজীর হওয়াটা এখানে সিস্টেম্যাটিক নিয়তি। যে অর্থনীতিক ও রাজনীতিক কাঠামোর ভেতর বাংলাদেশ বেড়ে উঠেছে, তাতে ছাত্ররা বেনজীর হওয়ার স্বপ্ন না দেখলে আশ্চর্য হবো!

জন্মের পর থেকেই ওরা দেখছে— ভালো বাড়ি বেনজীরদের, ভালো গাড়ি বেনজীরদের, ভালো পোশাক বেনজীরদের, ভালো খাবার বেনজীরদের, ভালো হাসপাতাল বেনজীরদের, ভালো বউ বেনজীরদের। যা কিছু ভালো, সুন্দর, স্বাস্থ্যবান, ও হৃষ্টপুষ্ট, তার সবই বেনজীরদের। শুধু কুৎসিত ও ভিখেরিসুলভ জিনিসগুলো গরিবদের। এক্সেস টু অ্যামেনিটি এতো লিমিটেড যে, কেউ একটি মামুলি গাড়ির মালিক, এটিও গরিবদের সহ্য করার উপায় নেই। ভেতরে হিংসার আগুন তুসের মতো জ্বলতে থাকে। প্রতিজ্ঞা করতে থাকে, সুযোগ আসুক, একদিন আমিও বেনজীর  হবো।"