মানুষের চিন্তা-চেতনার অন্তঃস্থলে মাতৃভাষার উপস্থিতি, অবচেতন মন থেকে শুরু করে আত্মিক অনুভূতি পর্যন্ত মাতৃভাষাই মানুষের ভাব প্রকাশের মূল ভরসা। কেননা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও সৃজনশীলতার প্রধান প্রকাশ মাধ্যম মাতৃভাষা। শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার ব্যবহার কেবল ভাষাগত স্বাচ্ছন্দ্যই নিশ্চিত করে না, বরং জ্ঞানার্জনের গভীরতা ও কার্যকারিতাও বহুলাংশে বৃদ্ধি করে। বিশেষত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষা শিক্ষার্থীর শেখার প্রক্রিয়াকে সহজতর করে তোলে এবং তাদের চিন্তাশক্তি ও গবেষণার দক্ষতাকে আরও বিকশিত করে। তবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় মাতৃভাষার ব্যবহার অনেক সময় নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। কেননা অধিকাংশ পাঠ্যবই ও রেফারেন্স উপকরণ ইংরেজিতে হওয়ায় বাংলায় মানসম্পন্ন শিক্ষা উপকরণের অভাব এখনো প্রকট। বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত পরিভাষার standardization বা মান্যকরণ বাংলা ভাষায় এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রণীত হয়নি, ফলে প্রায়ই অনুবাদ বিভ্রান্তি দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা জগৎ মূলত ইংরেজি ভাষা কেন্দ্রিক হওয়ায় বাংলা ভাষায় গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা দূরহ। এছাড়াও বৈশ্বিক চাকরির বাজারে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতায় অগ্রসর রাখে, যা মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা। এতদ্সত্বেও মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। প্রান্তিক ও গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য এবং তাদেরকে মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে এর বিকল্প নেই। পাশাপাশি স্থানীয় প্রেক্ষাপটে গবেষণার বিস্তার, জাতীয় সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত এবং জাতিকে আত্মনির্ভর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষার প্রচলন অতীব জরুরী।
জাপান মাতৃভাষাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি সফল উদাহরণ। জাপান ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে, একটি জাতি চাইলে নিজস্ব ভাষাকে ব্যবহার করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মেইজি পুনর্গঠন (Meiji Restoration) পরবর্তী সময়ে জাপান দ্রুত আধুনিকায়নের পথে অগ্রসর হতে থাকে। সে সময় পশ্চিমা বিশ্বের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও দর্শন শিখতে হলে ইউরোপীয় ভাষা আয়ত্ত করা জরুরি ছিল। কিন্তু জাপান শুরু থেকেই একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা বিদেশি জ্ঞান আহরণ করবে, তবে তা মাতৃভাষা জাপানিতে রূপান্তর করে উচ্চশিক্ষায় প্রয়োগ করবে। এ লক্ষ্যে তারা ব্যাপক অনুবাদ কর্মযজ্ঞ হাতে নেয়। ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি ভাষার অসংখ্য পাঠ্যবই, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ এবং প্রযুক্তিগত উপকরণ জাপানিতে অনুবাদ করা হয়। শুধু অনুবাদই নয়, তারা নতুন বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত পরিভাষার জন্য নিজেদের ভাষায় মানসম্পন্ন শব্দভাণ্ডার গড়ে তোলে।
জাপানের ন্যায় চীনেও মাতৃভাষা মান্দারিন বা পুতংহুয়া শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কমিউনিস্ট বিপ্লব তথা গণপ্রজাতন্ত্রী চীন গঠনের পর থেকেই সরকার উচ্চশিক্ষাকে সর্বসাধারণের নাগালের মধ্যে আনতে মাতৃভাষার ব্যবহারকে অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করে। চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বিশেষ করে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়, সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ফুদান বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ভাষায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম তৈরি করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে। বিদেশি জ্ঞান আহরণে চীনের কৌশল ছিল অনুবাদ ও স্থানীয়করণ। ১৯৫০ থেকে ১৯৮০ দশক পর্যন্ত বিভিন্ন ভাষা থেকে হাজার হাজার বৈজ্ঞানিক বই, গবেষণা প্রবন্ধ ও প্রযুক্তিগত নথি চীনা ভাষায় অনূদিত হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষাতেই দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও মহাকাশ গবেষণার মতো জটিল ক্ষেত্রেও চীন মাতৃভাষাকে জ্ঞানের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। একইসঙ্গে, চীনা গবেষকরা ইংরেজি ভাষায় বৈশ্বিক পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করে দ্বিমুখী জ্ঞান প্রবাহ নিশ্চিত করছেন।
একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতাও জাপানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ১৯৫০ দশকের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি থেকে আজকের প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার প্রেক্ষাপটে কোরিয়ায় মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা অনস্বীকার্য। কোরিয়ান সরকার ১৯৭০-এর দশক থেকেই “National Terminology Standardization Project” ” চালু করে, যার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের পরিভাষাগুলোকে কোরিয়ান ভাষায় রূপান্তর করা হয়। এ উদ্যোগের ফলে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষায় ভাষাগত বাধা দূর হয় এবং শিক্ষার্থীরা সহজেই দুর্বোধ্য বিষয়বস্তু আত্মস্থ করতে শুরু করে। আজ স্যামসাং, হুন্দাই, এলজি, এসকে গ্রুপ এর মতো বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মূল ভাষা কোরিয়ান, যা প্রমাণ করে যে মাতৃভাষা দিয়েই বিশ্বমানের উদ্ভাবন সম্ভব।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষা মূলত নিজস্ব ভাষায় পরিচালিত হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা নিবন্ধ ও জার্নালের বিশাল ভাণ্ডার এ ভাষাগুলোতেই গড়ে উঠেছে। জার্মানির প্রকৌশল শিক্ষা, ফ্রান্সের চিকিৎসা শিক্ষা বা ইতালির কলা ও নকশাবিষয়ক শিক্ষা মাতৃভাষার উপর নির্ভরশীল। এভাবে তারা প্রমাণ করেছে যে মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা সম্ভব এবং তাতে জ্ঞানের গভীরতা অর্জন সহজ হয়।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ মাতৃভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা নিবন্ধ ও জার্নালের বিশাল ভাণ্ডার গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মাস্টার্স ও এমফিল ডিগ্রির ক্ষেত্রে একটি মানসম্মত বিদেশি বই মাতৃভাষায় অনুবাদ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গবেষণাকর্ম মূল্যায়নের নজির রয়েছে। এটি ভাষাভিত্তিক গবেষণা, অনুবাদবিদ্যা, সাহিত্য, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং এমনকি বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রেও দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে একটি সফল অনুবাদকে একটি প্রকাশনার সমমর্যাদা দেয়ার নজির অহরহ রয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় মেইজি আমলে জাপানি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাস্টার্স পর্যায়ে শিক্ষার্থীদেরকে ইউরোপীয় ও ভিনদেশী পাঠ্যবই অনুবাদের কাজ দেওয়া হতো, যা পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এর মাধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যক বৈজ্ঞানিক বই জাপানি ভাষায় সফলভাবে রূপান্তরিত হয়।
বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মাস্টার্স বা এমফিল পর্যায়ে গবেষণার অংশ হিসেবে মানসম্পন্ন বিদেশি বই বাংলায় অনুবাদের প্রচলন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের গবেষণা, থিসিস ও প্রবন্ধ বাংলায় প্রকাশে উৎসাহিত করা এবং ইংরেজি সারসংক্ষেপ সংযোজনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরের স্বীকৃতি আনায়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়াও, বাংলা ভাষায় মানসম্মত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাঠ্যবই প্রণয়ন ও নিয়মিত হালনাগাদ, বৈজ্ঞানিক পরিভাষার অভিধান তৈরি ও মান্যকরণ "standardization" করা, গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাভিত্তিক জার্নাল প্রকাশ এবং ডিজিটাল শিক্ষা কনটেন্টে বাংলার ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে এগিয়ে এসে সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহন করা জরুরী।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মাতৃ ভাষাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার নীতি প্রণয়নে গবেষণালব্ধ তথ্য ও দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে। বৃহৎ পরিসরে বিদেশি গ্রন্থের অনুবাদে প্রকল্প পরিচালনা, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে মান্য পরিভাষার অভিধান প্রণয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য অনুবাদবিদ্যা ও একাডেমিক বাংলা লেখালেখি প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনার জন্য নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহন করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পঠন, পাঠন ও গবেষণার বিষয়বস্তু নির্ধারণে সমন্বিত কারিকুলাম প্রণয়ন এবং অনুবাদের ক্ষেত্র নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, বাংলা একাডেমি এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সমন্বিত প্রচেষ্টা বাংলায় উচ্চশিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষার্থীর জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।
বিশ্বায়নের এ যুগে প্রযুক্তি-নির্ভর যোগাযোগ ও বিদেশি ভাষার প্রভাবে অনেক মাতৃভাষা বিলুপ্তির হুমকির মুখে পড়েছে। সে প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মাতৃভাষার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল যুগে বই, পত্রিকা ও গবেষণাপত্র ই-বুক ও অনলাইন আর্কাইভে সংরক্ষিত হচ্ছে। মাতৃভাষাভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি হলে তা কেবল শিক্ষা নয়, সংস্কৃতির বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলা উইকিপিডিয়া জ্ঞানভাণ্ডারকে গণমানুষের কাছে সহজলভ্য করেছে। এছাড়াও ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল অ্যাপস ও ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে মাতৃভাষার ব্যবহার শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞান অর্জনকে সহজ করে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষামূলক প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের বোধগম্যতা বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষার জন্য শক্তিশালী ভিত্তি বিনির্মাণ করে।
বর্তমানে প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (ঘখচ), স্পিচ-টু-টেক্সট, টেক্সট-টু-স্পিচ প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ ব্যবস্থা মাতৃভাষাকে প্রযুক্তি জগতে বিকশিত করছে। বাংলা ভাষার জন্য বানান পরীক্ষক, মেশিন ট্রান্সলেশন ও ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ইতোমধ্যে বিকশিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে তরুণ প্রজন্মের ভাষা ব্যবহারে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে মাতৃভাষায় কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার শুধু ভাষার ব্যবহার বাড়াচ্ছে না, বরং নতুন শব্দ, রূপক ও ধ্বনিগত বৈচিত্র্য সৃষ্টি করছে। বাংলা ইউনিকোড, বাংলা কীবোর্ড, বিভিন্ন বাংলা ফন্ট ও মোবাইল অ্যাপস প্রযুক্তিতে মাতৃভাষার ব্যবহার সহজ করেছে। একইসাথে সরকারি সেবা ও ই-গভর্ন্যান্সে মাতৃভাষার প্রয়োগ নাগরিকদের প্রযুক্তি-ভিত্তিক সুবিধা গ্রহণে সহায়ক হয়েছে।
প্রযুক্তির এই আধিপত্যের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন ভাষার সীমা অতিক্রম করে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। শুরুতে এটি কেবল আন্তর্জাতিক ভাষাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এখন ধীরে ধীরে স্থানীয় ও আঞ্চলিক ভাষাও চিনতে, বুঝতে এবং ব্যবহার করতে পারছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও এর প্রভাব স্পষ্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর শিক্ষণ সরঞ্জামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এখন জটিল বিষয় যেমন বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তি সহজেই মাতৃভাষায় শিখতে পারছে। বহুভাষিক উপকরণ ও ইন্টার্যাকটিভ প্ল্যাটফর্ম শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলছে, ফলে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা আর শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। শুধু শিক্ষাই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভাষা সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ডিজিটাল আর্কাইভ, স্বয়ংক্রিয় অভিধান ও স্বর চিনতে সক্ষম সিস্টেমগুলো স্থানীয় ভাষাকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করছে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে একুশের চেতনায় আরও বেশী অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানসম্মত ও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষা প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি। এর জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি জাতীয় মাতৃভাষাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা নীতি প্রণয়ন। এ নীতিতে উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহার, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, অনুবাদ কার্যক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রযুক্তি-সমন্বিত শিক্ষার কাঠামো সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা উচিত। একইসাথে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ুমাতৃভাষায় শিক্ষা ও অনুবাদ সেল” প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যা বাংলা ভাষায় পাঠ্যবই উন্নয়ন, অনুবাদ, পরিভাষার মান্যকরণ ও গবেষণার সমন্বয় সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বাংলা একাডেমি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট-এর মধ্যে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নপূর্বক মাতৃভাষাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার প্রসার, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও নীতি বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। জাতীয়ভাবে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা, সমাজবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি বই ও গবেষণাগ্রন্থ বাংলায় অনুবাদের জন্য একটি জাতীয় অনুবাদ প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত পরিভাষার মান্যকরণ অভিধান প্রণয়ন এবং নিয়মিত হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে অনুবাদ, শিক্ষা ও গবেষণায় ভাষাগত সামঞ্জস্য ও মান বজায় থাকে। এছাড়াও ইন্ডাস্ট্রি অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতা জোরদার করে বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও গবেষণা উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা যেতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করতে হলে মাতৃভাষা বাংলা ও বাঙালির সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে অধিকতর জোর দিতে হবে, যা বিশ্বকে বাঙালি জাতিসত্তার প্রতি আকৃষ্ট করবে এবং বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয় ও বিশ্বজুড়ে একটি অনন্য অবস্থান তৈরি করবে। তাই মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি জাতির অস্তিত্ব ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য সময়ের অপরিহার্য দাবি।
লেখকঃ সিনিয়র সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।