রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ সারাদেশ

শিকলে বাঁধা ভাই-বোন, যেন নিজ বাড়িতেই জেলবন্দী জীবন!


প্রকাশ :

একটা সময় ছিল, তারা স্বাভাবিক চলাফেরা করত, হাসত, স্বপ্ন দেখত। আজ সেই ভাই-বোন জালাল মোল্লা (৩৫) ও হাজেরা খাতুন (২৭) শিকলে বন্দি, মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত। টাকার অভাবে থেমে গেছে চিকিৎসা, আর ভালোবাসার দায়ে ক্লান্ত বৃদ্ধ বাবা-মা বুক ভরা কান্না নিয়ে সেবা করে যাচ্ছেন সন্তানদের। নিজের ঘরটাই এখন তাদের ছোট্ট এক জেলখানা, যেখানে প্রতিদিন হেরে যায় মানবতা।

মানসিক ভারসাম্যহীন দুই ভাই-বোন রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মেঘনা মোল্লা পাড়া গ্রামের  মো. ফজাই মোল্লার সন্তান। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তারা শিকলবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন নিজ বাড়িতেই।

জালাল মোল্লা ছিলেন একজন কৃষক। এক সময় মাঠে-ঘাটে কাজ করে সংসার চালাতেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে পুরো পরিবারকে বিপদের মুখে ফেলে দেন। শুরু হয় চরম বিপর্যয়, পরিবারের সদস্যদের মারধর, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ।

পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা করালেও আর্থিক সংকটের কারণে তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই জালালের পায়ে লোহার বেড়ি ও শিকল বেঁধে রাখতে শুরু করে পরিবার। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এই শিকলই হয়ে উঠেছে তার নিত্যদিনের সঙ্গী।

জালালের ছোট বোন হাজেরা খাতুনের জীবনের করুণ অধ্যায় শুরু হয় তার সন্তান হারানোর মধ্য দিয়ে। বিয়ের পর এক সন্তানের মা হন হাজেরা। সেই সন্তান নানাবাড়ি বেড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যায়। এই শোক সইতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে তার সংসার, ফিরে আসেন বাবার বাড়িতে।

সেখানে ভাই জালালের মতো তাকেও শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয় পরিবারের সদস্যদের, যেন নিজ ঘরই হয়ে উঠে এক প্রকার বন্দিশালা।

জালাল ও হাজেরার বাবা মো. ফজাই মোল্লা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, প্রায় ১০ বছর আগেও আমার ছেলে সুস্থ ছিল। মাঠে কঠোর পরিশ্রম করত। হঠাৎ করে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। পাবনায় চিকিৎসা করিয়েছিলাম, কিন্তু টাকার অভাবে চালাতে পারিনি। তাই বাধ্য হয়ে শিকল পরাতে হয়।

তিনি আরও বলেন, মেয়েটিও সন্তান হারিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারায়। তাকেও বেঁধে রাখতে হয়। পরিবারের অন্য সন্তানরা কোনো খোঁজখবর নেয় না। সবকিছু আমাদেরই করতে হয়।

জালাল ও হাজেরার মা বলেন, ছেলে-মেয়ে মাঝে মাঝে আমাকে মারধর করে। শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন। তবুও তো তারা আমার সন্তান! আমি রান্না করে খাবার রেখে দেই। কখন খাবে, কখন না খাবে তা তাদের ইচ্ছা। সন্তান তো আর না খেয়ে থাকবে, তা আমি সহ্য করতে পারি না।

স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক আব্দুল গণি বলেন, জালাল ও হাজেরা রাতে ঘুমায় না। চিৎকার করে। মাঝে মাঝে ঘুমের ইনজেকশন দিতে হয়। তারা একসময় স্বাভাবিক জীবনযাপন করত। এখনো চিকিৎসা ও যত্ন পেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সরকারের সহায়তা পেলে হয়ত তারা আবার ফিরে আসতে পারবে স্বাভাবিক জীবনে।

একজন স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শিকলবন্দী এই দুই ভাই-বোনের অন্য ভাই-বোনরা খোঁজও নেন না। বৃদ্ধ মা-বাবাকেই তাদের ভরণপোষণ করতে হচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক।

পাংশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম আবু দারদা বলেন, জালাল ও হাজেরা প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। তবে এর বাইরেও যদি সহায়তা প্রয়োজন হয়, পরিবার থেকে লিখিত আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়া গেলে আমরা যথাসাধ্য সহায়তা করব।