রংপুরের জিআই পণ্য হাঁড়িভাঙা আমের সুনাম এখন দেশ-বিদেশে। আঁশহীন, ছোট আঁটি, ছাল পাতলা আর সুস্বাদু হওয়ায় দেশের গন্ডি পেড়িয়ে বিদেশেও চাহিদা বেড়েছে।নিজস্ব স্বকীয়তায় ইতোমধ্যে রংপুরের ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।প্রতি বছর হাঁড়িভাঙা আম জুনের ২০ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত শুরু হলেও এবার জুনের মাঝামাঝি বাজারে পাওয়া যাবে। কৃষি বিভাগ বলছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ১২ থেকে ১৫ জুনের মধ্যে বাজারে পাওয়া যাবে এ আম। এবার ৩শ’ কোটি টাকার আম বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।
রংপুরের কৃষি অফিস ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাঁড়িভাঙা আমের মুকুল সাধারণত জানুযারি মাসে আসে। এবার একটু দেরিতে এসেছে। পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে চাষিরা আম ঘরে তুলতে পারেন। এবার কিছুটা ব্যতিক্রম হয়েছে। দেরিতে মুকুল আসায় ফলও দেরিতে আসবে।আমচাষিরা বলছেন, জুনের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে বাজারে মিলবে পরিপক্ব হাঁড়িভাঙা আম।বর্তমানে আম বাগান গুলোতে পরিচর্যা চলছে। হাটে আম বিক্রির শেড নির্মাণ, ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানো, পাবলিক টয়লেট স্থাপন ও বৃষ্টির সময় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে।
রংপুর সদর, মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার বিস্তৃত এলাকার ফসলি জমি, বাগানসহ উঁচু-নিচু ও পরিত্যক্ত জমিতে চাষ হচ্ছে এই আম।জেলায় আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন হাজার ৩৫৯ হেক্টর। এর মধ্যে হাঁড়িভাঙা আম এক হাজার ৯১০ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ হয়েছে। হেক্টর প্রতি হাঁড়িভাঙা আম ১০ থেকে ১২ মেট্রিক টন ফলন হয়। সব কিছু ঠিক থাকলে অন্তত তিন‘শ কোটি টাকার ওপরে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি হবে বলে জানিয়েছে চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
রংপুরের মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, শেষ সময়ে ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে আম রক্ষা করতে পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন আম চাষিরা।এবার তিন দফায় ঝড় হওয়ায় ফলনে কিছুটা ব্যঘাতের শঙ্কা করছেন চাষীরা।আবহাওয়া প্রতিকুলতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে আমচাষিদের ।
মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের আমচাষি বেলাল হোসেন বলেন, এবার গাছে আমের মুকুল এক মাস দেরিতে এসেছে। মুকুল আসার পর থেকে তিন বার ঝড় হয়েছে।আমের ফলন গতবারের তুলনায় কম হয়েছে। আম পাড়ার আর দেড় মাস সময় বাকি।আবার ঝড়-বৃষ্টি হলে আমরা ক্ষতির স্বিকার হব।
রংপুরে হাঁড়ি ভাঙা আমের গোড়া পত্তন করেছিলেন মিঠাপুকুরে খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের নফল উদ্দিন পাইকার।তিনি ১৯৭০ সালে ১২০ বছর বয়সে মারা যান। এখন তার লাগানো হাঁড়িভাঙা গাছটির বয়স বর্তমানে ৭৬ বছর।
নফল উদ্দিন পাইকারের ছেলে আমজাদ হোসেন জানান, সম্ভবত ১৯৪৯ সাল, তখন তার বাবা নফল উদ্দিন এই গাছটি রোপণ করেছিলেন। উপজেলার বালুয়া মাসুমপুর গ্রামটি ছিল ঝোপ জঙ্গলে ভরপুর। একটি জমি থেকে দুটি আমের চারা নিয়ে এসে কলম করেন তার বাবা। তবে একটি গাছ চুরি হয়ে যায়। বাকি গাছটিতে মাটির হাঁড়ি বেঁধে পানি (ফিল্টার সিস্টেমে) দেওয়া হতো। একদিন রাতে কে বা কারা মাটির হাঁড়িটি ভেঙে ফেলে।গাছটিতে এক সময় বিপুল পরিমাণ আম ধরে। খেতে খুবই সুস্বাদু। বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে গেলে লোকজন এই আম সম্পর্কে জানতে চায়। তখন থেকেই গাছটি হাঁড়িভাঙা নামে পরিচিতি পায়। এখন হাঁড়িভাঙা আমের সুনাম মানুষের মুখে মুখে।দুই উপজেলায় গড়ে উঠেছে হাজার হাজার আম বাগান।
আম ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম সরকার বলেন, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে হাঁড়িভাঙা আমের চাষ করছি। টেকসই অর্থনীতির জন্য হাড়িভাঙা আমের সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন, আধুনিক আমচাষ পদ্ধতি বাস্তবায়ন ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন আমাদের দাবি।সরকার একটু দৃষ্টি দিলেই হাঁড়ি ভাঙা আমকে ঘিরে এই রংপুরের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।হাঁড়িভাঙা আমের বৈশিষ্ট্য হলো এটি আঁশবিহীন, মিষ্টি ও সুস্বাদু। এই আমের আঁটিও খুব ছোট। ছাল পাতলা। প্রতিটি আমের ওজন হয় ২‘শ থেকে ৩‘শ গ্রাম। হাঁড়িভাঙা আকার ভেদে ৬০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।
আম চাষিরা বলছেন, হাঁড়িভাঙা আম পাকলে এটি তিন-চার দিনের বেশি রাখা যায় না। সংরক্ষণের কোনো কার্যকর পদ্ধতি নেই। যদি এই আম সংরক্ষণের সঠিক প্রক্রিয়া থাকত, তাহলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (উদ্যান) হাবিবুর রহমান জানান,চলতি মৌসুমে জেলায় তিন হাজার ৩৫৯ হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হচ্ছে। এর মধ্যে এক হাজার ৯১০ হেক্টরে চাষ করা হচ্ছে হাঁড়িভাঙা। আম উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩০ হাজার মেট্রিক টন। হাঁড়িভাঙা আমের ফলন সবচেয়ে বেশি হলেও ফজলি, সাদা ল্যাংড়া, কালা ল্যাংড়া, মিশ্রি ভোগ, গোপাল ভোগ, আম্রপালিসহ অনেক জাতের আমের চাষ হয়।এসব আমের মধ্যে হাঁড়িভাঙার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এবার ৩শ’ কোটি টাকার আম বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল বলেন, জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া হাঁড়িভাঙা আম বাজারজাত করতে এবার যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সে বিষয়ে মনিটরিং করা হবে।