আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত এক তদন্ত প্রতিবেদনে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা গণভবনে এসে শেখ হাসিনার পা ধরে দেশত্যাগের অনুরোধ জানান। এই আবেগঘন মুহূর্তে অবশেষে শেখ হাসিনা তার পদত্যাগে রাজি হন এবং গোপনে দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম লিখিতভাবে এই প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সামনে উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার পরও শেখ হাসিনা প্রথমে ক্ষমতা ছাড়তে প্রস্তুত ছিলেন না। বরং, তিনি আরও বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিলেন।
৪ আগস্ট সোমবার সকাল থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। সকাল ৯টার পর থেকেই আন্দোলনকারীরা কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নামেন। ঢাকার শাহবাগ, উত্তরা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে প্রধানমন্ত্রী গণভবনে সেনা, নৌ, বিমান ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠান। সেখানে শেখ হাসিনা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, কেন নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান নিচ্ছে না।
উপস্থিত কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, বলপ্রয়োগে এই আন্দোলন দমন সম্ভব নয় এবং এর ফলে রক্তপাত আরও বাড়বে। শেখ হাসিনা প্রথমে তাদের পরামর্শ মানতে চাননি। তখন কর্মকর্তারা শেখ রেহানার কাছে গিয়ে তাকে পুরো পরিস্থিতি জানান এবং তার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে বোঝানোর অনুরোধ জানান।
এরপর শেখ রেহানা বড় বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। প্রথমে শেখ হাসিনা অনড় থাকলেও, পরে বিদেশে থাকা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ফোনালাপের পর তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান। জয়ও তাকে পদত্যাগের পক্ষে বোঝান। এরপর শেখ হাসিনা পদত্যাগে সম্মত হন এবং একটি ভাষণ রেকর্ড করতে চান। কিন্তু তখনই গোয়েন্দা সূত্রে জানানো হয় যে, শাহবাগ ও উত্তরা থেকে বিশাল জনসমাগম গণভবনের দিকে রওনা হয়েছে, এবং তারা ৪৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারে।
এই বিবেচনায় তাকে ভাষণ রেকর্ডের অনুমতি না দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গণভবন ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে তিনি ছোট বোন রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে তেজগাঁও পুরোনো বিমানবন্দরের হেলিপ্যাডে যান। সেখানে অপেক্ষমাণ সামরিক হেলিকপ্টারে উঠার আগে কয়েকটি লাগেজ তোলা হয়। এরপর তারা বঙ্গভবনে যান এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
বেলা আড়াইটার দিকে সামরিক হেলিকপ্টার ভারতের দিকে যাত্রা করে। হেলিকপ্টারটি ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশ করে কিছুক্ষণ ওড়ে এবং পরে আগরতলায় বিএসএফের একটি হেলিপ্যাডে অবতরণ করে। সেখান থেকে শেখ হাসিনা দিল্লিতে পৌঁছান।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'ইন্ডিয়া টুডে'র তথ্য অনুযায়ী, তিনি গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিটে পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি লন্ডনে যেতে পারেন বলে জানা গেছে।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম আরও বলেন, শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। তার শাসনামলে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচন 'রাতের ভোট' নামে সমালোচিত হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। নির্বাচনে তার দলীয় প্রার্থীদেরই 'স্বতন্ত্র' প্রার্থী সাজিয়ে 'ডামি নির্বাচন' করা হয় বলে বিরোধীদের অভিযোগ। মাত্র সাত মাসের মাথায় দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা অবশেষে পদত্যাগে বাধ্য হন এবং দেশত্যাগ করেন।