সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সফটওয়্যার সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন কাঠামোর সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে না পারায় নির্ধারিত সময়ে গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকেই গণনা করা হবে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরবর্তীতে বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন-ভাতার সুবিধা পাবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, প্রশাসনিক ও কারিগরি বিষয়গুলোর সমন্বয় করে চূড়ান্ত গেজেট প্রস্তুতের কাজ চলছে। সফটওয়্যার উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষ হলে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি কিংবা শেষ সপ্তাহে গেজেট জারি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এরপর থেকে এর খসড়া কাঠামো চূড়ান্ত করার পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর করার সময় অধিকাংশ হিসাব-নিকাশ হাতে সম্পন্ন করা হলেও বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও জিপিএফসহ প্রায় সব আর্থিক কার্যক্রম ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও আইবাস (iBAS++) সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে গেলে সফটওয়্যারে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে, যা বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, বর্তমানে আগের মতো হাতে পে-ফিক্সেশন করার সুযোগ নেই। ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর হলে একই কর্মচারীর জন্য একাধিকবার পে-ফিক্সেশন করতে হবে। এতে সফটওয়্যারে বারবার পরিবর্তন আনতে হবে, পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা ও ভুলের ঝুঁকিও বাড়বে। এর প্রভাব পদোন্নতি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড এবং অবসরকালীন সুবিধা নির্ধারণেও পড়তে পারে।
বিশেষ করে অবসরের কাছাকাছি থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ বেশি। কারণ পেনশন, গ্র্যাচুইটি, ছুটির নগদায়নসহ অধিকাংশ অবসর সুবিধা সর্বশেষ প্রাপ্ত মূল বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। বর্তমান ডিজিটাল ব্যবস্থায় একাধিক ধাপে এসব সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করা জটিল হওয়ায় অনেকেই ভবিষ্যৎ প্রাপ্যতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
এই পরিস্থিতিতে আব্দুল মালেক প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, শুরুতেই পূর্ণাঙ্গ পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করে পরে পর্যায়ক্রমে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা সমন্বয় করলে সফটওয়্যার পরিবর্তনের ঝামেলা কমবে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যে বৈষম্যের আশঙ্কাও থাকবে না।
এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব, সফটওয়্যারের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও জানিয়েছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় রেখে বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের মতে, বেতন বৃদ্ধি যেমন জরুরি, তেমনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাও সরকারের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।