বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

মার্কিন ভিসা নীতির কড়াকড়িতে বাড়ছে বাংলাদেশের


প্রকাশ :

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে একের পর এক কড়াকড়ি সিদ্ধান্তে নতুন করে চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বলা হয়েছিল, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। তবে বাস্তবে মার্কিন ভিসা নীতিতে সেই ইতিবাচক প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। বরং সর্বশেষ সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ৭৫টি দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। এর আগে বি-১ ও বি-২ (ব্যবসা ও ভ্রমণ) ভিসার ক্ষেত্রে ৩৮টি দেশের নাগরিকদের জন্য ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত ব্যবস্থা চালু করে ওয়াশিংটন। সেই তালিকাতেও অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বাংলাদেশের জন্য সংকট ক্রমেই বাড়ছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, সরকার ক্ষমতায় আসার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলা হয়েছিল। সে অনুযায়ী কিছু সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সফর ও বৈঠকগুলোর পরও পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে এসব সফর কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে।

৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভুটানসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে। ২১ জানুয়ারি থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তালিকায় রাশিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, কুয়েত, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, ইয়েমেন ও ইরাকও রয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যেসব দেশের অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অগ্রহণযোগ্য হারে সরকারি কল্যাণভাতা গ্রহণ করছে, সেসব দেশের ক্ষেত্রেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন অভিবাসীরা যেন মার্কিন জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করে—এটি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।

পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন—এমন আবেদনকারীদের ভিসা অযোগ্য ঘোষণার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে।

এনআরবি ওয়ার্ল্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও মার্কিন নাগরিক এনামুল হক এনাম বলেন, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সমস্যার কারণ হতে পারে। কারণ দেশটিতে ইতিমধ্যেই তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। তাঁর মতে, অভিবাসন বন্ধ হলে এই সংকট আরও বাড়বে এবং সিদ্ধান্তটি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

৩৮ দেশের জন্য ‘ভিসা বন্ড’ বাধ্যতামূলক

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ভিসা বন্ড’ ব্যবস্থার আওতায় দেশের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৮-এ উন্নীত করেছে। নতুন তালিকায় বাংলাদেশসহ আরও ২৫টি দেশের নাম যুক্ত হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ বন্ডের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ টাকার বেশি।

২১ জানুয়ারি থেকে অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হবে। ফলে অনেকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনকারীদের সশরীরে সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিহাস জমা দেওয়া এবং আগের ভ্রমণ ও বসবাসের বিস্তারিত তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

তবে বন্ড জমা দিলেই যে ভিসা পাওয়া নিশ্চিত হবে, তা নয়। ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে বা ভিসার শর্ত যথাযথভাবে পালন করলে ওই অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।

ব্যবসা ও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা

সিনহুয়া এনুমিলিয়াম ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম আফজাল উল মনির বলেন, ভ্রমণের ক্ষেত্রে জামানত ব্যবস্থা অপমানজনক এবং জাতি হিসেবে এটি লজ্জাজনক। তাঁর মতে, পর্যটক ও সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে ক্ষতিকর।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বড় বাজার। ব্যবসায়িক যোগাযোগ রক্ষায় দুই দেশের নিয়মিত যাতায়াত জরুরি। ভিসা বন্ড চালু হলে সেই যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যবসায় পড়বে।

নিরাপত্তা উপদেষ্টার সফর ও প্রশ্ন

ভিসা বন্ড ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফর করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। তিনি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে বৈঠক করে ব্যবসায়ীদের ভ্রমণ সহজ করার অনুরোধ জানান। তবে ওই সফরের এক সপ্তাহ না যেতেই অভিবাসী ভিসা স্থগিতের খবর আসে।

এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও নিরাপত্তা উপদেষ্টার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য ভালো নয়, তবে এটি সাময়িক হওয়ায় দ্রুত প্রত্যাহারের আশা করা যায়। অন্যদিকে অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ মনে করেন, কড়াকড়ির ফলে কেবল বৈধ ব্যবসায়ীরাই যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচকও হতে পারে।

ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের জন্য প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন সমীর কুমার দে।