বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

নির্ভীক সাংবাদিকতা ও কূটনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন আখতার-উল-আলম : স্মরণ সভায় মঈন খান


প্রকাশ :

দেশবরেণ্য সাংবাদিক, দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক দিনকালের সাবেক সম্পাদক মরহুম আখতার-উল-আলম নির্ভীক সাংবাদিকতা ও কূটনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। 

গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত মরহুম আখতার-উল-আলমের স্মরণ সভায় তিনি এ কথা বলেন।  

আখতারুল আলমের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে ড. মঈন খান বলেন, আমরা যখন স্কুল-কলেজে পড়তাম, তখন সাংবাদিকতার পরিবেশ আজকের মতো ছিল না। বর্তমানের সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর যুগে তথ্যের প্রবাহ বাড়লেও সেই সময়ের সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য প্রকাশ করতেন। বিশেষ করে যারা নির্ভীক এবং সত্যের পথে অবিচল ছিলেন, তাদের জন্য নিজ নামে লেখা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আর এই কারণেই আখতার-উল-আলম বেছে নিয়েছিলেন ছদ্মনাম ‘লুব্ধক’। মহাকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের নামে তিনি যে পরিচয় বেছে নিয়েছিলেন, তাঁর লেখনীও ছিল তেমনি দীপ্তিময় ও উজ্জ্বল। নির্ভীক সাংবাদিকতা ও কূটনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তিনি। 

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক ভিসি ও বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সমিতির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আবদুল লতিফ মাসুমের সভাপতিত্বে স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিএনপি’র সাবেক মন্ত্রী ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। প্রধান আলোচক হিসেবে ছিলেন সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিল সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। ভাইয়ের স্মৃতিচারণে ছিলেন ফখর-উজ্জামান জাহাঙ্গীর, পিতার স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য রাখেন প্রফেসর ড. রেদোয়ান-উল-আলম এবং মূল নিবন্ধক ছিলেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান। কবি, গীতিকার নাহিদ নজরুলের সঞ্চালনায় স্মরণ সভায় আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস (বিএজে)’র সভাপতি ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ, সংগঠনের মহাসচিব মো. শেখ সাদী, অধ্যাপক ড. সেরাজুল ইসলাম ভুঁইয়া, অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক, সাংবাদিক হাসনাত করিম পিন্টু ও প্রবীণ সাংবাদিক শাহ আব্দুল হালিম প্রমুখ। 

মুক্তিযুদ্ধে আখতার-উল-আলমের আপসহীন ভূমিকার কথা স্মরণ করে মঈন খান বলেন, পাক হানাদার বাহিনী যখন এদেশের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন তিনি সাহসিকতার সাথে প্রতিবাদ করেছিলেন। এই কারণে তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসে বন্দিও থাকতে হয়েছিল। তাঁর চরিত্র ছিল আপসহীন এবং তিনি সর্বদা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। শুধুমাত্র সাংবাদিকতা নয়, কূটনীতিতেও তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। 

প্রধান আলোচকের বক্তব্যে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, সাংবাদিকতা ও জীবন দর্শনের এক ধ্রুবতারা ছিলেন আখতার-উল-আলম। তাঁর ভাষা ছিল অত্যন্ত ঝরঝরে, সাবলীল এবং গতিশীল, যা পাঠককে সহজেই টেনে নিত। 

তিনি আরো বলেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়, ‘সময় যেন ইতর হয়ে উঠেছে’। আসলে সময় নিজে ইতর হয় না, বরং সময়ের মানুষগুলো যদি সভ্যতা, ন্যায়বোধ ও শিষ্টাচার হারিয়ে ফেলে, তবে সেই সময় কলুষিত হয়। আমাদের বর্তমান সমাজ আজ কেবল বন্ধ্যা নয়, বরং এটি অনেক ‘দুষ্টু লোক’ প্রসব করছে, যার ফলে আমাদের জীবন ও সংস্কৃতি বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। এই অন্ধকার অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আখতার-উল-আলমের মতো এমন একজন মানুষের প্রয়োজন ছিল, যিনি কলম ধরে সমাজকে আলোর পথ দেখাবেন। যে জাতি তার বীরদের ও পথপ্রদর্শকদের সম্মান দিতে জানে না, তারা আগামীর পথে সঠিকভাবে এগোতে পারে না । তাই আমার প্রস্তাব থাকবে, আখতার-উল-আলমের মতো বরেণ্য সন্তানদের সারা বছর স্মরণ করার জন্য একটি রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। তাঁর দেশপ্রেম এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শ আমাদের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে । 

সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, ২০১০ সালে আখতারুল আলম ভাইয়ের ইন্তেকালের পর আমরা যেন তাকে একপ্রকার ভুলতেই বসেছিলাম। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নিভৃতচারী ও সাধারণ মানুষ ছিলেন।  আখতার-উল-আলম ছিলেন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের অকৃত্রিম প্রতিনিধি। তিনি ইবনে খালদুনের দর্শনের মতো ভূ-রাজনীতি এবং একটি জাতির মানচিত্র ও ভবিষ্যতের গুরুত্ব বুঝতেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অন্যতম পুরোধা ও প্রবক্তা। ব্যক্তিগতভাবে আমি আজ যা কিছু লিখতে পারি, তার পেছনে আখতার ভাইয়ের ঋণ অপরিসীম।  তিনি বিন্দু বিন্দু করে আমাকে শিখিয়েছেন। তিনি শুধু নিজে লিখতেন না, বরং আমাদের মতো নবীনদের দিয়ে লেখাতেন। আমাদের শেখাতেন। আসুন, আমরা আখতার-উল-আলমের আদর্শ অনুসরণ করি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর কাজ পৌঁছে দেই। 

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস-এর সভাপতি ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশপন্থী বরেণ্য সাংবাদিক ও সম্পাদকদের ভুলে গেলে, তাদের অবদানের কথা ভুলে গেলে, তাদের দেখানো পথ অনুসরণ করা যাবে না। আর সে পথ অনুসরণ না করলে সাংবাদিকতার সর্বব্যাপী অবক্ষয় হবে। আমরা যদি আখতার-উল-আলম, আব্দুস সালাম বা গিয়াস চৌধুরীদের ভুলে যাই, এমনকি রিয়াজুদ্দিন আহমেদকেও স্মরণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করি, তবে এই পেশার আর কী অবশিষ্ট থাকবে? আজকে বাংলাদেশে ‘সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান’ বলতে কিছু নেই, সব ধ্বংস হয়ে গেছে। 

তিনি আরো বলেন,  আখতার ভাইয়ের মতো সম্পাদক-কলামিস্টরা সংকটে দেশকে পথ দেখিয়েছেন এবং দেশপন্থি সম্পাদক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ইত্তেফাক বা দিনকাল থেকে তার পাওনা নিয়ে যেতে পারেননি -একজন সংবাদকর্মী হিসেবে এর চেয়ে গ্লানির আর কিছু হতে পারে না।