এক সময় বাড়ির বাইরের দেয়াল, রাস্তা কিংবা বাজার—যেদিকেই চোখ যেত, প্রার্থীদের নাম, দল ও প্রতীকসংবলিত পোস্টারে ছেয়ে থাকত চারপাশ। এসব দেখেই বোঝা যেত দেশে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ভোটারের কাছে প্রার্থীর পরিচয় ও যোগ্যতা তুলে ধরার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পোস্টার ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী আচরণবিধিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
এর ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণায় কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না প্রার্থীরা। পাশাপাশি লিফলেট ও ব্যানারে প্রার্থী ও দলীয় প্রধান ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারণায় হেলিকপ্টার ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হলে শুধুমাত্র তারাই হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারবেন।
এবার প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে একাধিক ধারা যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো একটি টেলিভিশন সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এসব পরিবর্তন আগেই চূড়ান্ত করা হলেও তফসিল ঘোষণার পর আচরণবিধি মানতে এবার বেশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে কমিশন। এরই মধ্যে বিধি ভেঙে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচারণায় অংশ নেওয়ায় একাধিক ব্যক্তিকে জরিমানাও করেছে ইসি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসরণ করে গত বছরের নভেম্বর মাসে ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালা’ চূড়ান্ত করে নির্বাচন কমিশন।
পোস্টার নিষিদ্ধের কারণ
রাস্তার মোড়ে মোড়ে, গলির মুখে কিংবা গাছে গাছে পোস্টার টানানো দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনের একটি পরিচিত চিত্র ছিল। বিভিন্ন সময়ে পোস্টার ব্যবহারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও কখনোই তা পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল না।
গত ১০ নভেম্বর রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধিতে সংশোধন এনে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচন থেকে ভোটের প্রচারণায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। ফলে এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টার ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, আচরণবিধি চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়েছিল। একটি রাজনৈতিক দল ছাড়া বাকি কেউ এ বিষয়ে আপত্তি জানায়নি।
তিনি আরও জানান, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন আগেই পোস্টার নিষিদ্ধের সুপারিশ করেছিল।
পোস্টার নিষিদ্ধের ব্যাখ্যায় ইসি সচিব বলেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকেও এ বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল। পোস্টার লেমিনেটিং করার ফলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয় এবং পোস্টারের কালি ফসলের জমির ক্ষতি করে। সবদিক বিবেচনায় নিয়ে পোস্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তবে পোস্টার বন্ধ থাকলেও প্রার্থীরা লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ব্যবহার করতে পারবেন।
সংশোধিত আচরণবিধি অনুযায়ী, এসব প্রচারণা সামগ্রী কোনো দালান, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের খুঁটি, সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্থাপনা কিংবা কোনো যানবাহনে লাগানো যাবে না।
নির্বাচনী প্রচারণা পত্র, বিলবোর্ড বা ফেস্টুনে রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না।
ইসি সচিব বলেন, এক প্রার্থীর পোস্টারের ওপর অন্য প্রার্থীর পোস্টার লাগানো নিয়ে অতীতে নানা সংকট তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
প্রচারণায় যানবাহনের ব্যবহার
গত ১১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। তফসিল ঘোষণার পর প্রতীক বরাদ্দের আগ পর্যন্ত কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সুযোগ নেই।
তবে আচরণবিধি ভেঙে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন তফসিল ঘোষণার পর মোটরসাইকেল ও গাড়িবহর নিয়ে শোডাউন করেন। এ ঘটনায় ১৩ ডিসেম্বর তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে নির্বাচন কমিশন।
এ বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ওই প্রার্থীকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। একই অপরাধ একাধিকবার করায় কমিশন আইনের প্রয়োগ করেছে।
সংশোধিত আচরণবিধিমালায় বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো বাস, ট্রাক, নৌযান, মোটরসাইকেল বা অন্য কোনো যান্ত্রিক বাহনসহ মিছিল, জনসভা কিংবা শোডাউন করা যাবে না।
যানবাহনসহ বা যানবাহন ছাড়া কোনো ধরনের মশাল মিছিলও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়ও কোনো মিছিল বা শোডাউন করা যাবে না।
ভোটগ্রহণের দিন যান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করতে পারবে না।
আচরণবিধি ভাঙলে প্রার্থীদের আর্থিক দণ্ড দেওয়া হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগও রয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধ
নির্বাচনী প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একাধিক বিধান যুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন।
সংশোধিত আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, প্রার্থী, তার নির্বাচনী এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ সব সনাক্তকরণ তথ্য প্রচারণা শুরুর আগে রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে।
প্রার্থী বা তার পক্ষে কেউ নির্বাচনী প্রচারণায় অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করতে পারবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা, বিদ্বেষ, ভুল তথ্য, কারও চেহারা বিকৃত করা বা নির্বাচন সংক্রান্ত বানোয়াট তথ্য প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা কোনো জনগোষ্ঠীকে নিয়ে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উস্কানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহারও নিষিদ্ধ।
সত্যতা যাচাই ছাড়া নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ বা শেয়ার করা যাবে না।
সংশোধিত বিধিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন কিংবা সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি বা প্রচার করা যাবে না—তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হোক বা সম্পাদনার মাধ্যমে হোক।
এ বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, আচরণবিধি বাস্তবায়নে কমিশন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যে কেউ বিধি ভাঙলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। (সূত্র: বিবিসি বাংলা)