বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামছে পুলিশ, ঘটনাস্থলেই জরিমানার ক্ষমতা


প্রকাশ :

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর করতে নতুন বিধিমালা জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। চলতি বছরের ২৩ নভেম্বর প্রকাশিত ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫’-এর মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের পাশাপাশি ট্রাফিক সার্জেন্ট ও তার ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সরাসরি জরিমানা আদায়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

আগের বিধিমালায় শুধু ম্যাজিস্ট্রেটদের এ ক্ষমতা থাকায় সীমিত জনবল দিয়ে মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগে জটিলতা দেখা দিচ্ছিল। নতুন বিধিমালায় সেই সীমাবদ্ধতা কাটবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন থেকে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলেই শব্দদূষণের জন্য ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

বিধিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত শব্দমাত্রা অতিক্রম করলে ট্রাফিক সার্জেন্ট বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবেন। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট মোটরযান তাৎক্ষণিকভাবে আটক করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে পুলিশকে।

বিধিমালার বিধি-২০-এর উপবিধি-১ অনুযায়ী, কোনো মোটরযান বা নৌযানে অনুমোদিত শব্দমাত্রা অতিক্রমকারী হর্ন স্থাপন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলেই জরিমানা আরোপ করা যাবে।

যানবাহনের জন্য নির্ধারিত শব্দমাত্রা

বিধিমালার তফসিল-৩-এ বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহনের জন্য শব্দের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই ও তিন চাকার হালকা যান এবং মোটরগাড়ি, মাইক্রোবাস, পিকআপ ভ্যানের জন্য অনুমোদিত শব্দমাত্রা ৮৫ ডেসিবেল। মিনিবাস ও মাঝারি ট্রাকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৯০ ডেসিবেল এবং বাস, ট্রাক, লরি ও নৌযানের মতো ভারী যানবাহনের জন্য সর্বোচ্চ ১০০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে।

এলাকাভেদে শব্দের সীমা

তফসিল-১ অনুযায়ী, নীরব এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবেল ও রাতে ৪০ ডেসিবেল শব্দের অনুমতি থাকবে। আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল। মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবেল। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবেলের মধ্যে শব্দমাত্রা সীমাবদ্ধ থাকবে।

সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কোনো এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা করতে পারবে। সকাল ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত সময়কে দিন এবং রাত নয়টা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত সময়কে রাত হিসেবে গণ্য করা হবে।

মাইক ও লাউডস্পিকার ব্যবহারে কড়াকড়ি

বিধিমালায় রাতের বেলায় জনসমাগমস্থলে মাইক, লাউডস্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম ও অ্যামপ্লিফায়ার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে লিখিত আবেদনের মাধ্যমে নীরব এলাকা ছাড়া অন্য এলাকায় সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টার জন্য অনুমতি নেওয়া যাবে। কোনো অবস্থাতেই রাত ১১টার পর এসব যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না এবং শব্দমাত্রা ৯০ ডেসিবেলের বেশি হতে পারবে না।

জাতীয় নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে নীরব এলাকায় মাইক ও লাউডস্পিকার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। অন্য এলাকাতেও নির্ধারিত শব্দমাত্রা অনুসরণ করতে হবে।

নির্মাণকাজ ও আতশবাজিতে নিষেধাজ্ঞা

আবাসিক এলাকায় এবং আবাসিক এলাকার ৫০০ মিটারের মধ্যে সন্ধ্যা সাতটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত ইট ও পাথর ভাঙার যন্ত্র, মিক্সচার মেশিন ও পাইলিং মেশিনের মতো উচ্চ শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাতের বেলায় পটকা ও আতশবাজি ফাটানোও নিষেধ।

অভিযোগ ও শাস্তির বিধান

শব্দদূষণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ফোন, লিখিত আবেদন বা ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে কর্তৃপক্ষ উচ্চ শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতি জব্দ করতে পারবে।

আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহার কিংবা আতশবাজি ফুটালে এক মাসের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। যানবাহনে নির্ধারিত শব্দমাত্রা অতিক্রম করলে তিন মাসের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার পাশাপাশি চালকের লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মত

পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক ফরিদ আহমেদ জানান, পুলিশকে এ ক্ষমতা দেওয়াই নতুন বিধিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইতোমধ্যে পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং সাউন্ড লেভেল ডিটেক্টর সরবরাহ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, আইন প্রয়োগ জোরদার হলে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বাস্তব পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি হাইড্রোলিক হর্নের আমদানি ও বাজারজাতকরণে কঠোর নজরদারিরও প্রয়োজন রয়েছে। সূত্র: প্রথম আলো