যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতা থেকে মুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়তে অহিংসার চর্চা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ সেলিম রেজা। তাঁর মতে, মানবসভ্যতার টিকে থাকা এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় অহিংসা এখন শুধু নৈতিক আদর্শ নয়, বরং অপরিহার্য শর্ত।
১৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি বলেন, মানবসভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের পাশাপাশি যুদ্ধ, রক্তপাত ও সহিংসতার ঘটনাও রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে সংঘাত ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গড়তে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
অহিংসা শুধু যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নয়
নিবন্ধে অহিংসাকে একটি সক্রিয় ও রূপান্তরমূলক জীবনদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, অহিংসা মানে শুধু যুদ্ধের বিরোধিতা করা নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় শান্তিপূর্ণ পথ অনুসরণ করা।
এ প্রসঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এসব আন্দোলন দেখিয়েছে, অহিংস পদ্ধতিতেও সামাজিক পরিবর্তন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পরিচালনা করা সম্ভব।
মানুষের মূল্যই প্রধান
নিবন্ধে আর্জেন্টিনার মানবতাবাদী দার্শনিক মারিও লুইস রদ্রিগেজ কোবোস, যিনি সিলো নামে পরিচিত, তাঁর দর্শনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই দর্শনের মূল বক্তব্য হলো, মানুষের মূল্য সবার ওপরে।
লেখকের মতে, কোনো ধর্ম, রাষ্ট্র, অর্থনীতি কিংবা আদর্শ মানুষের জীবন ও অস্তিত্বের চেয়ে বড় হতে পারে না। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং নিজের জন্য যে আচরণ প্রত্যাশা করা হয়, অন্যের সঙ্গেও তেমন আচরণ করার নীতি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সিলোর দর্শনে অহিংসার দুটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। একটি হলো ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ শান্তি, যেখানে ক্ষোভ, ঘৃণা ও মানসিক দ্বন্দ্ব কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যটি হলো সামাজিক জীবনে অন্যের ক্ষতি না করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা।
বিশ্বজুড়ে শান্তির বার্তা ছড়ানোর উদ্যোগ
নিবন্ধে হিউম্যানিস্ট মুভমেন্টের সহযোগী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড মার্চ ফর পিস অ্যান্ড নন-ভায়োলেন্স’ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে শান্তি, সম্প্রীতি ও অহিংসার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশেও এ ধরনের কার্যক্রমে হিউম্যানিস্ট সোসাইটি ভূমিকা রাখছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেমিনার, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক প্রীতি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালে ‘ফোর্থ ওয়ার্ল্ড মার্চ ফর পিস অ্যান্ড নন-ভায়োলেন্স, ইন মাই সিটি’ কর্মসূচির আওতায় ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে শান্তি ও অহিংসার বার্তা ছড়িয়ে দিতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়েছে।
শক্তির ভারসাম্যের বদলে ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান
যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গড়তে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রচলিত শক্তির ভারসাম্যের ধারণার পরিবর্তে ন্যায়বিচারভিত্তিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন লেখক। তাঁর মতে, ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বিরোধ নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অহিংসা, শান্তি ও মানবাধিকার বিষয়ে সচেতন করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধের উপসংহারে বলা হয়েছে, মানুষের মর্যাদা ও মূল্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া গেলে অহিংস ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথ সুগ
মোহাম্মদ সেলিম রেজা একজন লেখক ও গবেষক। সভাপতি, হিউম্যানিস্ট সোসাইটি। প্রদায়ক, প্রেসেঞ্জা- ঢাকা ব্যুরো।