শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ অন্যান্য

বড় ভাই? -মোহাম্মদ ইয়ার আলী


প্রকাশ :

হঠাৎ একদিন আতিকের বাবা মারা গেল। আতিকেরা তিন ভাই এক বোন। আতিক সবার বড় তাই বাবার মৃত্যুর পর পরেই সংসারের দায়িত্ব স্বাভাবিক ভাবেই আতিকের ঘাড়ে পরে যায়। আতিক সবে মাত্র লেখাপড়া শেষ করে ব্যাংকের চাকরিতে যোগদান করেছে। বিয়ের কথা চলছিল, এর মধ্যেই পিতার মৃত্যুতে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

তিন ভাই বোনের লেখাপড়ার খরচ আর সংসারের খরচ চালাতে হিমশিমে পরে যায়। বাবার বে-সরকারি চাকরির আয়ে সংসার চালত। কিন্তু বে- সরকারি চাকরি মানেই কাজ নেই বেতন নেই। তাই তার মারা যাওয়ার পর পরেই সে আয় বান্ধ হয়ে যায়। সংসারে অন্ধের যষ্ঠি মতো উপার্জন ক্ষত ব্যাকতি হয়ে ওঠে আতিক।

বিয়ে করার পরিকল্পনা বাতিল করে সংসারের হাল ধরতে তাকে। তার মায়ের আদেশ পথ চলার টর্চলাইটের মত কাজ করতে থাকে। ব্যাংকে চাকরির সামান্য বেতনে সংসার চালানোর প্রচেষ্টায় মাঝে মাঝেই ধার কর্জ করে সংসার চালাতে হয়। ছোট ভাইবোনদের লেখাপড়া, সংসারের খরচ সবকিছুই বেতন দিয়ে সামলানো কঠিন হয়ে পরলেও ভেঙ্গে পড়ে না সে। এভাবেই চলতে হবে- এটাই হয়তো নিয়তি।

ভবিষ্যতে বোনাস আর ইনক্রিমেন্টের আশায় অন্য লোকদের কাছে ধার কজ করে সমস্যার সমাধান করতে থাকে। এভাবেই একদিন দুইদিন করে নয়, কয়েক বছর পেরিয়ে যায়। এদিকে বিয়ের বয়স পার হয় হয় ভাব।

অপরদিকে তার মায়ের শরীর যখন আর চলেনা তখন বিয়ের কথা ভারে আতিক। তার পরেও শতবার ভাবে- বউয়ের সঙ্গে যদি মায়ের বনিবনা না হয়, ছোট ভাই বোনদের যদি অবহেলা করে তাহলে কি হবে? বয়সের কথা ভেবে একদিন গ্রামের এক গরীব কৃষকের মেয়েকে বিয়ে করে আতিক। চিন্তা, মেয়েটি যেন তার সংসারে মায়ের পরিবর্তে সব কাজ করে সংসারটাকে আগলে রাখে। ছোট ভাই বোনদের আদর করে।


‘‘ বউয়ের নাম আয়না বেগম। সেও আতিকের পরিকল্পনায় একমত হয়ে মায়ের হাল ধরে সংসারটাকে মাতৃেত্তের বন্ধনে আটাকে রাখার চোষ্টা করে। ”

‘‘সংসারে বড় ভাই হলে পিতার দায়িত্ব পালন করলেও সম্মান কিন্তু পিতার মত পাওয়া যায়না, বরংচ অপরাধির কাঠ গড়ায় সারাজীবন দাড় হতে হয়। এটাই হয়ত বিধির বিধান!”


এভাবেই কয়েক বছর যাওয়ার পর ছোট ভাইদের মধ্যে অপেক্ষত বড়জনের লেখাপড়া শেষ চাকরি শুরু হয়। চাকরি শুরু করেই ছোটভাই নাহিদ তার বিয়ের আবদার শুরু করে। বৃদ্ধা মা আতিককে বলতে থাকে, ছোট ছেলেকে বিয়ে দাও, তার নাতিপুতির মুখ দেখে আমি মরতে চাই।

অপরদিকে ছোট বোন নাহিদাও বড় হয়ে যায়। তার বিয়ে আগে দেওয়ার ব্যবস্থা করা আতিকের জন্য জরুরী হয়ে পরে। আতিক তার বোনের বিয়ে দিয়ে ছোট ভাইকে বিয়ে দিবে বলে জানালে নাহিদ রেগে যায়। অবশেষে একদিন একাই বিয়ে করে বউ ঘরে নিয়ে আসে। আতিক নিজেকে অপমানিত মনে করে কিছু বলে না।

তার বোন নাহিদা কে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে থাকে। কিন্তু টাকার অভাবে তা করতে হিমশিম খেতে থাকে। অথচ ছোট ভাই নাহিদ সংসারের খরচের জন্য সামান্য কিছু অর্থ সহায়তা করে। মায়ের চিকিৎসা সহ অন্য কোন দাযিত্ত্ব নেয় না।

ছোট ভাই নাহিদের বউ সংসারের কোন কাজ করে না, শুধু চাকরি করে। তবে তার অর্থ কোথায় ব্যয় করে তাও বলে না। এমনকি সংসারে কোন আর্থিক সাহায্যও করে না।

নাহিদ এবং নাহিদের বউয়ের সংসারের প্রতি উদাসীনতা আতিকের বউয়ের মাথায় প্রশ্ন জাগায় যে তারা কেন সংসারে এককভাবে কাজ করবে, ছোট বোনের বিবাহ খরচ নির্বাহ কররে এবং ছোট ভাইয়ের লেখাপড়া খরচ মিটাবে? তাদের তো কোন সঞ্চয় নেই অথচ ছোট ভাই নাহিদ এবং তার স্ত্রীর আয়ের কোন হিসাব তারা জানে না। সংসারে তারা শুধু দান অনুদানের মত কিছু খরচ করে।

আতিকের মায়ের শারীরিক অসুস্থতা আর আতিকের বউয়ের ঘ্যনা ঘ্যানাতিতে তিক্ততা সৃষ্টি হয়। ওদিকে ছোট ভাই নাহিদ একত্রে খেলেও সংসারের প্রতি উদাসীনতা আতিককে ভাবিয়ে তোলে।

অবশেষে নাহিদের বউ একদিন মুখ ফুটে বলে ফেলে যে তারা সংসারে একত্রে থাকবে না, তারা পৃথক থাকতে চায়। চক্ষু লভজায় আতিক কিছুই বলতে পারেনা। তার মায়ের আগের মত সংসারে গুরুত্ত্ব নাই, তাই নাহিদের বউয়ের এ দাবিকে তিনিও কোন কিছু বলতে পারে না।

সত্যি সত্যিই নাহিদ একদিন অন্য্যত্র বাসা ভাড়া নিয়ে চলে যায়। সংসারে আতিকের দাযিত্ব থেকেই যায়। বৃদ্ধ মায়ের চিকিৎসা, ভরণপোষগের খরচ, ছোট ভাই ছোটনের লেখাপড়া খরচ আতিকের ঘাড়েই থেকে যায়।

একসময় আতিকের মা মারা যায়। ছোট ভাই ছোটন মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারের বাঁধন হারা সন্তানের মত লেখাপড়া শেষ করে চাকরি নিয়ে শহরের বাইরে চলে যায়।

পিতার সংসারের ঘানি টানতে টানতে নিজের সন্তানের লেখাপড়া আর সংসার চালানোর দায়ভার কখন যে তার কাঁধে পরেছে তা সে বুঝতে পারে না। বড় ভাই হিসেরে বাবার পরিবর্তে সংসার চালানো শুরু আর নিজের সংসার চালানোর মতো গাথার বোঝা টানতে টানতে একদিন আতিক ক্লান্ত হয়ে পরে।

ছোট গল্প-৩০ (১/৭/২৬)